অ্যানিমিয়া- কিছু সতর্কতা
মনে রাখা দরকার অ্যানিমিয়া ট্রিটমেন্টে হিমোগ্লোবিন প্রথমে নরমাল হয়ে গেলেও, আয়রনের ওষুধ সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ না করাই ভালো। কিন্তু কেন? এরকম অনেক কিছু দৈনন্দিন কাজে আসার মতো তথ্য
মেয়েদের জীবনে লোহা যেন সোনার থেকেও দামি।
একজন মহিলার প্রায় বছর 40 কেটে যায় প্রতিমাসে পিরিয়ড হয়ে, অথবা সে সময় তিনি হয়তো প্রেগনেন্ট বা ব্রেস্ট ফিড করছেন। এই তিন রকম পরিস্থিতিতেই শরীর থেকে গন্ডায় গন্ডায় লোহা বেরিয়ে যায়।
এ সময় খাবার-দাবারে যথেষ্ট আয়রনের সরবরাহ না থাকলে হয় রক্তাল্পতা বা অ্যানিমিয়া।
কীভাবে বুঝবেন অ্যানিমিয়া?
ব্লাড টেস্টে দেখা গেল হিমোগ্লোবিন কমে গেছে। আসলে শরীরের আয়রন থেকে তৈরি হয় হিমোগ্লোবিন। এই হিমোগ্লোবিনের কাজ ফুসফুস থেকে মহিলাটির শরীরে প্রতিটি অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়া। হিমোগ্লোবিনের অভাব হলে দুর্বলতা হয় সাথের সাথী, মেজাজ হয়ে যায় খিটখিটে, দুচোখ বেয়ে ক্লান্তি নামে।
আর খুব বাড়াবাড়ি হলে হার্টের উপর পড়ে চাপ। তবে অ্যানিমিয়া কিন্তু শুধু শরীরে আয়রনের অভাবে হয় না। ভিটামিন B12 এবং ফলিক এসিডের অভাবেও হয় অ্যানিমিয়া। কারণ এই তিনটি কাঁচামাল দিয়ে তৈরি হয় হিমোগ্লোবিন।
একটু ঘুরিয়ে বললে - শরীরে এই উপাদানগুলির যোগানের থেকে যদি শরীর থেকে এই উপাদান গুলি আরো বেশি খরচ হয়ে যায়, তাহলেও তৈরি হতে পারে অ্যানিমিয়া।
শরীরে কোন কারণে বেশি ব্লিডিং হলে বা যদি শরীরে এমন কোন অসুখ চলতে থাকে যেখানে রক্ত ঠিক তৈরি হচ্ছে না। বা রক্ত খুব তাড়াতাড়ি ভেঙে যাচ্ছে, সেখানেও তৈরি হতে পারে অ্যানিমিয়া। অ্যানিমিয়ার আরো হাজারো কারণ রয়েছে। সেটা লিখলে একটা বই হয়ে যাবে হয়তো, কিন্তু আজকে আমরা আয়রন ঘটিত অ্যানিমিয়ার ব্যাপারে দুটো কথা বলছি।
শরীরে আয়রন কম কিনা কিভাবে জানা যাবে?
সাধারণত হিমোগ্লোবিন মেপে দেখা হয় শরীরে আয়রন কম কিনা।
তার কারণ হিমোগ্লোবিন টেস্ট অপেক্ষাকৃত সস্তা।
কিন্তু আসল আয়রন দেখা যায় সেরাম আয়রন বলে রক্তরসের আয়রন পরীক্ষায়।
এছাড়াও ফেরিটিন বলে এক ধরনের ব্লাড টেস্ট আছে। কিন্তু এই ফেরিটিন এর লেভেল আবার শরীরের প্রদাহের ওপরে বাড়া কমা করে। সুতরাং ফেরিটিন ততটা নির্ভরযোগ্য নয়।
যদি দেখা যায় অ্যানিমিয়া আছে কিন্তু রক্তে আয়রনের অভাব নেই তাহলে ভিটামিন B12 এবং ফলিক এসিড (হিমোগ্লোবিনের বাকি দুখানা কাঁচামালের) টেস্ট করতে হয়।
এই তো গেল প্রথাগত কিছু টেস্ট।
কারও কারও এদিকে বারবার অ্যানিমিয়া হয়। আসল কারণ কি? সেটা খুঁজতে হয়।
যদি হাতে গরম কিছু প্রমাণ থাকে, তাহলে তো সাধারণত ধরে নেওয়া হয় সেই কারণেই অ্যানিমিয়া হচ্ছে। তা না হলে বাকি কারণ খুঁজতে হয়।
কিন্তু সে যেন খড়ের গাদায় সূঁচ খোঁজা।
কখনো কখনো পটি দিয়েও শরীর থেকে রক্ত বেরোতে পারে। সেটা হাতেনাতে ধরা চাট্টিখানি কথা নয়।
সেই রক্ত বেরোনো যদি খুব অল্প পরিমাণে হয় তাহলে তাতে পটির রং কিছুই চেঞ্জ হয় না। একে বলা হয় লুকিয়ে থাকা রক্ত বা অকাল্ট ব্লাড। আয়রন ট্যাবলেট খেতে খেতে বা আয়রন ভর্তি কোন খাবার খেয়ে এই অকাল্ট ব্লাড টেস্ট করলে ভুল রিপোর্ট আসে।
এছাড়াও পটির একটি বিশেষ সমস্যা সিলিয়াক ডিজিজ। তার প্রমাণ পাওয়া যেতে পারে, রক্তে কিছু বিশেষ টেস্ট করে। এতেও অনেক সময় চোখের আড়ালে রক্ত কমতে থাকে।
শুনতে আশ্চর্য লাগলেও কিছু সমস্যায় ইউরিন দিয়ে কখনো কখনো গোপনে বহুদিন ধরে রক্তক্ষরণ হতে থাকে। যাতে ইউরিনের রং লাল হয় না। এগুলো ইউরিন রুটিন টেস্ট করলে ধরা পড়ে। পটির রাস্তায় কখনো কখনো কৃমি থাকে। সেই কৃমিও অনেক সময় রক্ত চুষে নেয়।
পটিতে যদি লুকিয়ে থাকা রক্ত থাকে তাহলে শরীরের যে দুটো জায়গায় এর কারণ খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি তা হল - কোলন আর স্টমাক।
স্টমাক পরীক্ষা করা হয় এন্ডোস্কোপি করে ।
আর কোলন পরীক্ষার নাম কোলনোস্কোপি।
এছাড়াও এক বিশেষ ধরনের সিটি স্ক্যান যাকে বলা হয় সিটি কোলনোগ্রাফি - তাও কখনও কখনও কাজে আসে কোলন পরীক্ষার জন্য।
মনে রাখা দরকার স্টমাক এবং কোলন পরীক্ষা হলেও মাঝখানে কয়েক মিটার লম্বা পটির রাস্তার সহজে কোনো পরীক্ষা করা যায় না। এই অংশ কে বলা হয় স্মল বাওয়েল।
এই জায়গাগুলো পরীক্ষা করতে হলে ছোট্ট ক্যামেরা ভর্তি একটা ক্যাপসুল খেয়ে ফেলতে হয়। পটির রাস্তায় ক্যাপসুল ক্যামেরা নামতে নামতে ছবি তোলে। এর নাম ক্যাপসুল এন্ডোস্কোপি। যদিও সৌভাগ্যবশত এই মাঝখানে পটির রাস্তার অংশটার মধ্যে বড়সড়ো সমস্যা, সংখ্যাতত্ত্বের হিসেবে খুব অল্পই হয়।
কিন্তু স্টমাকে বা কোলনে কারণ খুঁজে না পাওয়া গেলে মাঝখানের স্মল বাওয়েল়ে পরীক্ষা করা বাঞ্ছনীয়।
কাদের ক্ষেত্রে খুব বেশি নজর দেওয়া প্রয়োজন?
বছর পঞ্চাশের পরে অ্যানিমিয়া হলে, যে সমস্ত মহিলার মেনোপজ হয়ে গেছে তাদের যদি অ্যানিমিয়া হয়। যাদের বাড়িতে গ্যাস্ট্রো ম্যালিগনেন্সির ধাত রয়েছে এবং যাদের বারবার কারণ ছাড়াই অ্যানিমিয়া হয়ে যাচ্ছে, এদের ক্ষেত্রে অ্যানিমিয়া ডায়াগনোসিস কোমর বেঁধে লেগে করতে হয়। কখনো কখনো অ্যানিমিয়া আবার ক্রনিক কিডনির সমস্যা, হার্টফেলিওর, এবং ইনফ্লামেটরি বাওয়াল ডিজিজ এর বহিঃপ্রকাশ হতে পারে।
অ্যানিমিয়া ট্রিটমেন্ট কিভাবে করা হয়?
প্রথম ধাপ: কারণ খুঁজে পাওয়া গেলে তার ট্রিটমেন্ট।
আর তার সাথে সাথে আয়রন, ভিটামিন B12 এবং ফলিক অ্যাসিড- যেটার অভাব রয়েছে সেই ট্রিটমেন্ট শুরু করা হয়। সব অ্যানিমিয়াই প্রথমে ধরে নেওয়া হয় : আয়রন এর অভাবের জন্য। তাই সংখ্যাগরিষ্ঠ অ্যানিমিয়ার ট্রিটমেন্ট করা হয় আয়রন থেরাপি দিয়ে।
আয়রন ট্যাবলেটে আসে, ইনজেকশনেও দিয়ে দেওয়া যায়। খুব বেশি বাড়বারন্ত অ্যানিমিয়া না হলে শুধুমাত্র যে খাবার-দাবারে আয়রন বেশি আছে সে ধরনের খাবার-দাবার খেলেও অ্যানিমিয়া ঠিক হয়ে যেতে পারে। যদিও তাতে সময় লাগে।
কিছু ভেষজে আকর্ষণীয় পরিমান আয়রন থাকলেও, ততটা আয়রন শরীরে ঢুকতে চায় না। কারণ ভেষজে আয়রনের সাথে থাকে ফাইটিক অ্যাসিড (Phytic Acid)। ফাইটিক এসিড আয়রনের সাথে মিশে এক যৌগ তৈরি করে। এই যৌগ থেকে শরীর আয়রন নিষ্কাশন করতে পারে না। তাই খাবারে আয়রন থাকলেও শরীরের কাছে তা থাকে অধরা।
অপরদিকে অ্যানিমিয়া যদি খুব বেশি হয় তখন হার্টের ওপর বাড়তি চাপ পড়তে থাকে। যদি খুব চট করে রক্তে অক্সিজেন পরিবহন বাড়ানোর ক্ষমতা দরকার হয়, তাহলে আর ট্যাবলেট বা ইনজেকশন দিয়ে হিমোগ্লোবিন বাড়ানো সমীচীন নয়। কারণ তাতে বেশ কয়েকদিন থেকে কয়েক সপ্তাহ সময় লেগে যেতে পারে হিমোগ্লোবিন বাড়তে।
এই এমার্জেন্সিগুলোতে সাধারণত ব্লাড ট্রান্সফিউশন করে শরীরে অক্সিজেন পরিবহন করার ক্ষমতা কয়েক ঘন্টার মধ্যে বাড়িয়ে দেওয়ার দরকার হয়। হার্টের ওপর চাপ কমে।
রক্ত দিয়ে হিমোগ্লোবিন বেড়ে গেলেও কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহের মধ্যে সেই বাইরে থেকে দেওয়া রক্ত পুরোটাই ভেঙ্গে যায়। তাই রক্ত দিয়ে হিমোগ্লোবিন বাড়ানো হলেও তারপরে মুখের আয়রন থেরাপির দরকার হতে পারে।
আয়রন থেরাপির সাইড এফেক্ট নিয়ে কিছু কথা বলে রাখা ভালো। অনেকেই সাইড এফেক্টের ভয়ে আয়রন খেতে চান না।এ হয়তো সঠিক রাস্তা নয়। কারণ তাতে শরীরের অক্সিজেনের অভাব আরও দীর্ঘায়িত হতে থাকে। তাই উপসর্গ গুলো জানা থাকলে, ডাক্তারের সাথে পরামর্শ করে সমস্যার সমাধান সম্ভব।
কিছু পেশেন্টের ক্ষেত্রে মুখে আয়রন খেলে তার নানা সাইডএফেক্ট হয়। কন্সটিপেশন, এসিডিটি, গ্যাস বা হালকা পেটে ব্যথা - এই ধরনের সমস্যা। অনেকসময়েই ওষুধ পাল্টে পাল্টে দেখা হয়, কোনও ওষুধ এমন আছে কিনা যাতে সমস্যা কম হয়। কিন্তু এরও সমস্যা আছে। যে আয়রনের ওষুধের সাইড এফেক্ট কম তার বোধ করি এফেক্টও কম।
যারা মুখের আয়রন একদমই সহ্য করতে পারে না, তাদের ক্ষেত্রে শিরার মাধ্যমে আয়রন দেওয়ার রাস্তা আছে। এ পদ্ধতিও একদম সাইড এফেক্ট ছাড়া নয়। এই ধরনের থেরাপি হাসপাতালে ভর্তি হয়ে নেওয়াটাই ভালো। বিরল হলেও এই থেরাপি দেবার সময় এলার্জি হতে পারে। সেসময় হাসপাতালে ভর্তি হয়ে থাকলে তার চিকিৎসা করার অপেক্ষাকৃত সহজ।
মনে রাখা দরকার অ্যানিমিয়া ট্রিটমেন্টে হিমোগ্লোবিন প্রথমে নরমাল হয়ে গেলেও, আয়রনের ওষুধ সঙ্গে সঙ্গে বন্ধ না করাই ভালো। বোঝার সুবিধার জন্য ধরে নিন, হিমোগ্লোবিন হল মানুষের শরীরের শোরুমের আয়রন। এর বাইরেও মানুষের শরীরে গোডাউনের আয়রন থাকে। যা থাকে অস্থি-মজ্জায়। শোরুমের আয়রন ভর্তি হয়ে যায় তাড়াতাড়ি। কিন্তু গোডাউনের আয়রন পরিপূর্ণ হয় হিমোগ্লোবিন বেড়ে যাওয়ার পরে, বেশ কয়েক সপ্তাহ ধরে। সুতরাং হিমোগ্লোবিন নরমাল হয়ে যাবার পরও আয়রন থেরাপি বেশ কয়েক সপ্তাহ বাড়তি চালু রাখা দরকার। নয়তো শিগগিরই আবার অ্যানিমিয়া ফিরে আসতে পারে। এই ব্যাপারে আপনার ডাক্তার বাবুর সাথে খোলাখুলি কথা বলে নিন।
পু: যদি অ্যানিমিয়া বারবার আসতে থাকে তাহলে হিমাটোলজিস্ট এর পরামর্শ নিন।
আরও পড়তে হলে দেখুন:
Snook J, Bhala N et al. British Society of Gastroenterology guidelines for the management of iron deficiency anaemia in adults. Gut 2021;70:2030-2051 [full text]
Goddard A F, James M W et al; British Society of Gastroenterology. Guidelines for the management of iron deficiency anaemia. Gut 2011;60:1309-1316 [full text]
Dignass A U, Gasche C et al; European Crohn's and Colitis Organisation [ECCO]. European consensus on the diagnosis and management of iron deficiency and anaemia in inflammatory bowel diseases. J Crohns Colitis 2015;9:211-222 [full text]
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Anemia Treatment Iron Hemoglobin Vitamin B12 Folic Acid Endoscopy







