ক্যান্সার পেশেন্টের মেনোপজ
প্রাকৃতিক মেনোপজের থেকে ক্যান্সার ঘটিত বা ক্যান্সার ট্রিটমেন্ট ঘটিত মেনোপজে কতখানি পার্থক্য হয় বা তার ট্রিটমেন্টটি বা কি কতখানি আলাদা রাস্তায় চলে তার জন্য আজকে কিছু কথা।
মেনোপজ কোনো অসুখ নয়। প্রতিটি মহিলার জীবনে স্বাভাবিক নিয়মে একসময় মেনোপজ আসে।
তবুও কিছু কিছু ক্যান্সার বা ক্যান্সারের ট্রিটমেন্টে মেনোপজ চলে আসতে পারে একটু আগে।
প্রাকৃতিক মেনোপজের থেকে ক্যান্সার ঘটিত বা ক্যান্সার ট্রিটমেন্ট ঘটিত মেনোপজে, কতখানি পার্থক্য হয় বা তার ট্রিটমেন্টট-ই বা কী? সাধারণ মেনোপজ ট্রিটমেন্ট থেকে তা কতখানি আলাদা রাস্তায় চলে? তার জন্য আজকে কিছু কথা।
যাদের চিকিৎসার আগেই মেনোপজ হয়ে গেছে তাদের সাধারণ মেনোপজের মতোই চিকিৎসা চলে। তবে কিছু ক্ষেত্রে আগাম মেনোপজ হয় ক্যান্সার বা তার চিকিৎসার কারণে ক্যান্সার সংক্রান্ত কারণে যে মেনোপজ হয়, তার প্রধানত তিনটি কারণ থাকতে পারে, ১) যখন চিকিৎসার প্রয়োজনে মহিলাদের দু’টো ওভারী বা ডিম্বাশয় বাদ দিয়ে দেওয়ার দরকার হয়। ২) কিছু কেমোথেরাপি। ৩) তলপেটের রেডিওথেরাপির প্রয়োজন হয়। এইসব কারণেই আগাম মেনোপজের সম্ভাবনা দেখা দেয়।
কিন্তু কেন?
সার্জারিতে যদি ওভারি বাদ দেওয়া হয়, তাতে মেনোপজ হয়। সেটা বোঝা সহজ, কিন্তু বাকিগুলো?
কেমোথেরাপি বা তলপেটের রেডিওথেরাপিতে সার্জারির মতো ওভারি বাদ দেওয়ার দরকার না পড়লেও, এই পদ্ধতিগুলো প্রত্যক্ষভাবে ওভারিয়ান টিস্যুর কার্যক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। তার জন্য ওভারি থেকে ডিম তৈরি হওয়া এবং ওভারি থেকে ফিমেল হরমোন তৈরি হওয়া, সাময়িক বা বরাবরের মতো বন্ধ হয়ে যায়।
কেমোথেরাপি এক ধরনের ওষুধ যা প্রয়োগ করলে, সারা শরীরেই এটা ঘুরতে থাকে। যে কোনো বিভাজিত হতে থাকা কোষকেই প্রভাবিত করার ক্ষমতা রাখে। ক্যান্সারের টিউমারের অনবরত বিভাজিত (cell division) হওয়া কোষকে মেরে ফেলাই কেমোর কাজ।
সেটা তার আকাঙ্ক্ষিত অ্যাফেক্ট। কিন্তু সেই একই ধর্ম বিভাজিত হতে থাকা ওভারিয়ান টিস্যুকে-ও ক্ষতিগ্রস্ত করে। কেমোর চোখ নেই - তাই সে নরমাল টিস্যু এবং ক্যান্সার টিস্যু কে আলাদা করে চিনতে পারে না। এটা কেমোর সাইড এফেক্ট। এক্ষেত্রে বলা উচিত যে, সব কেমোতে-ই যে ওভারির কাজ ব্যহত হবে এমন কোনো নিয়ম নেই। কিন্তু কিছু কিছু কেমোথেরাপিতে তা হওয়াটাই স্বাভাবিক।
রেডিওথেরাপিতে যে রে দেওয়া হয়, সেই রে কেবলমাত্র সরলরেখায় চলে। সুতরাং, তলপেটে যদি রেডিওথেরাপি দেওয়া হয় এবং তার গতিপথে যদি ওভারিয়ান টিস্যু থাকে, তাহলে তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তার ফলস্বরূপ সাময়িক বা বরাবরের মতো আসে মেনোপজ। কিছু আধুনিক সার্জারিতে ওভারিকে সরিয়ে রেডিওথেরাপির রে থেকে নিরাপদ দূরত্বে রেখে দিয়ে আসা যায়। তাকে বলে ওভারিয়ান ট্রান্সপজিশন। অনেক ক্যান্সারে কাজে এলেও, অল্পবয়সীদের সার্ভাইকাল ক্যান্সারে এই কৌশল, অবাক করার মতো।
এই তিনটে বড় বিষয় ছাড়াও চতুর্থ একটি কারণ রয়েছে, যেখানে কৃত্রিম মেনোপজ তৈরি করে দেওয়াটা কিছু ক্যান্সারের ট্রিটমেন্টের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ। কিন্তু কেন?
কিছু কিছু ক্যান্সার আছে যেটা হরমোন সংবেদনশীল বা হরমোন সেনসিটিভ। এই ধরনের টিউমার বা ক্যান্সার হরমোন থেকে তাদের খাবার-দাবার যোগাড় করে।
সুতরাং, মেনোপজ না ঘটানো হলে তাদের ক্যান্সার ফিরে আসার সম্ভাবনা বেশ কয়েক গুণ বাড়তি। এনাদের ক্ষেত্রে কখনো ওভারি সার্জিক্যালি রিমুভ করে বা ওভারি শরীরে থেকে গেলেও, ইস্ট্রোজেন বিরোধী কিছু ওষুধপত্র দিয়ে মেনোপজ রীতিমত আবাহন করে নিয়ে আসা হয়। গাইনোকলোজিক্যাল কিছু ক্যান্সার যেমন- ব্রেস্ট, ওভারিয়ান এবং সংখ্যাগরিষ্ঠ জরায়ুর ক্যান্সার এই ধরনের ক্যান্সার গোষ্ঠীর মধ্যে পড়ে।
মোটের ওপর যেটা আগ্রহের বিষয় সেটা হল, ক্যান্সার পেশেন্টদের মেনোপজের যে ট্রিটমেন্ট, তা প্রাকৃতিক মেনোপজের ট্রিটমেন্টের থেকে আলাদা।
প্রাকৃতিক মেনোপজের ট্রিটমেন্টে খুব প্রায়শই HRT বা হরমোন রিপ্লেসমেন্ট থেরাপি ব্যবহার করা হয়। সেটা যে ক্যান্সারের ক্ষেত্রে বা ক্যান্সার পেশেন্টদের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা যায় না, তা নয়। কিন্তু ব্যবহার করার আগে, নানা ধরনের জটিল ভাবনা চিন্তা এবং পেশেন্টের সঙ্গে সঠিকভাবে কথা বলে নেওয়া প্রয়োজন।
প্রাকৃতিক মেনোপজের সিম্পটম বা তার সমস্যার অপেক্ষাকৃত সহজ একটি ট্রিটমেন্ট হল, HRT। মানে, যে হরমোনের অভাবে মেনোপজ হয়েছে, সেই ইস্ট্রোজেন হরমোন শরীরে দিয়ে দেওয়া। যদিও প্রাকৃতিক মেনোপজ হওয়া মহিলাদের কেবলমাত্র তিন থেকে চার শতাংশ মহিলারই কেবল HRT ব্যবহার করেন।
কিন্তু ক্যান্সার পেশেন্টদের যদি হরমোন সেনসিটিভ ক্যান্সার থেকে থাকে, তাহলে HRT অনেকাংশেই দেওয়া সম্ভব নয়।
তাহলে, তাদের কি কোনো ট্রিটমেন্ট হয় না? ভোগান্তি কি তাদের অবশ্যম্ভাবী? ব্যাপারটা একদমই তা নয়। তাদের ক্ষেত্রেও খুব সাফল্যের সঙ্গে ট্রিটমেন্ট করা সম্ভব। আজকে আমরা মেনোপজের ট্রিটমেন্টে নন-হরমোনাল যে ওষুধপত্র বা লাইফস্টাইল চেঞ্জ যেগুলো দরকার হয়, সেগুলো নিয়ে সংক্ষেপে আলোচনা করবো।
ক্যান্সারের ট্রিটমেন্টের পর যদি মেনোপজের সমস্যা আসে, তাহলে বিভ্রান্ত হবেন না। মনে রাখা প্রয়োজন, বাকি সবার মত নিয়মিত এক্সারসাইজ, সঠিক খাবার-দাবার, নিয়মিত নিজের শরীর এবং মানসিক স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল রাখা অতি অবশ্যই দরকার।
তার সঙ্গেও যেটা দরকার সেটা হলো, পারিবারিক বা বন্ধু-বান্ধব বা সামাজিক সাপোর্ট মেকানিজম এগুলোকে বলা হয় (নন ড্রাগ ট্রিটমেন্ট)।
এই নন ড্রাগ ট্রিটমেন্ট গুলো যদি ঠিকঠাকভাবে একজন মহিলার জীবনে না থাকে, তাহলে তার ক্ষেত্রে ওষুধপত্র কাজ করতে চায় না।
এই নন ড্রাগ ট্রিটমেন্টের সাথে অনেক সময় প্রয়োজন হয় কিছু ওষুধপত্র।
এই নন ড্রাগ ট্রিটমেন্টের সাথে অনেক সময় প্রয়োজন হয় কিছু ওষুধপত্র।
আগেই বলেছি, ন্যাচারাল মেনোপজের ওষুধপত্র আর ক্যান্সারের মেনোপজের ওষুধপত্র খানিকটা আলাদা হতে পারে। ক্যান্সার পেশেন্টের মেনোপজে ওষুধপত্র এমন ভাবে নির্বাচন করা হয়, যাতে তার ক্যান্সার ফিরে আসার সম্ভাবনা না বেড়ে যায়। হট ফ্লাশ বা নাইট সোয়েটের জন্য ক্যান্সার পেশেন্টরা যে ধরনের ট্রিটমেন্ট ব্যবহার করতে পারেন, তার মধ্যে Gabapentin ছাড়াও, Venlafaxine এবং Clonidine-এর মত নন-হরমোন ওষুধপত্র অনেক সময় ভালো ফলাফল দেয়।
মেনোপজের পরে অনেক সময় মহিলাদের এক ধরনের উপসর্গ দেখা দেয়, সেটা হল ভ্যাজাইনাল ড্রাইনেস। যেটা তাদের সেক্সের সময় অসুবিধা তৈরি করতে পারে। প্রাকৃতিক ইস্ট্রোজেনের অভাবে ভ্যাজাইনার ত্বক পাতলা হয়ে যাওয়ার কারণে, এই ধরনের সমস্যা বাড়বাড়ন্ত হতে পারে।
বেশ কিছু নন-হরমোনাল লুব্রিকেন্ট রয়েছে, যেগুলো মহিলারা খুব সহজেই ব্যবহার করতে পারেন। নাম যেমন- KY Jelly, Lubik ইত্যাদি। প্রথম দু-একদিন ব্যবহার করার সময় অসুবিধাজনক বলে মনে হলেও, নিয়মিত ব্যবহারের ফলে ব্যাপারগুলো খুবই মহিলাদের কাছে সুবিধেজনক বলে মনে হয়। এক্ষেত্রে যে ক্রিম ব্যবহার করা হবে, সেইগুলো দিকে নজর রাখা প্রয়োজন। যাতে তা ‘ওয়াটার বেসড’ লুব্রিক্যান্ট হয়। এতেও যদি কাজ না হয়, তাহলে ডাক্তারের পরামর্শে অল্প পরিমাণে ইস্ট্রোজেন আছে এরকম কিছু ক্রিম খুব অল্প দিন ব্যবহার করলেও, উপকার পাওয়া যায়।
ভ্যাজাইনা থেকে খানিকটা তো ইস্ট্রোজেন ব্লাডে মিশবেই, কিন্তু খুব অল্পদিনের জন্য ব্যবহার করলে এতে ক্যান্সার তৈরি হওয়ার সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে।
মেনোপজের পরে খুব কমন সমস্যা ইউরিনের রাস্তায় জ্বালা যন্ত্রণা হওয়া। প্রথাগত ইস্ট্রোজেন-হরমোন-রিপ্লেসমেন্ট ছাড়াও নানা রকম ওষুধপত্র এখন বেরিয়েছে যে, ট্যাবলেট খেলে এই ধরনের সমস্যা থেকে মহিলারা মুক্তি পেতে পারেন। কারও কারও হয় ঘুমের সমস্যা। তবে এই ঘুমের সমস্যা শুধুমাত্র যে মেনোপজের কারণে, এরকম বলে ভেবে নেওয়াটা বোধহয় অনুচিত। কখনও কখনও আমাদের দৈনন্দিন জীবনের স্ট্রেস, ভয় বা অনিশ্চয়তার কারণেও, ঘুম আসতে অসুবিধা হতে পারে। ঘুমের ব্যাপারে সব থেকে ভালো কাজ করে কিছু লাইফ স্টাইল চেঞ্জ।
মেনোপজের পর মুড চেঞ্জ হলে অ্যাংজাইটি, মেমোরির সমস্যা বা কনফিডেন্সের সমস্যা হলে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা বলুন, সেখানেও ট্রিটমেন্ট রয়েছে।
এলোপ্যাথি ছাড়াও, কিছু কিছু কমপ্লিমেন্টারি থেরাপি রয়েছে। এতেও মেনোপজের সমস্যাগুলোর ট্রিটমেন্ট খুব ভালোভাবেই হয় বা বলে শুনতে পাই। কিছু ব্রিদিং এক্সারসাইজ রয়েছে, যেগুলো হট ফ্লাশের জন্য কাজ করে।
আর সব থেকে বেশি যেটা দরকার সেটা জানা যে, হট ফ্লাশ যদি একবার আসে তাহলে, সেটা কিন্তু কয়েক মিনিটের মধ্যেই আবার চলে যাবে। সুতরাং, বিভ্রান্ত না হয়ে ধৈর্য ধরে খানিকটা অপেক্ষা করলেই, বেশীরভাগ মহিলাই সেখান থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন। কিছু কিছু ক্ষেত্রে আকুপাংচার বা হোমিওপ্যাথি ট্রিটমেন্টগুলো কাজে আসে, তবে এগুলোর বিজ্ঞানভিত্তি যে কতগুলো সঠিক, সেটা আমার জানা নেই। তবে আপনি যদি আকুপাংচারে আগ্রহী হন, তাহলে অতি অবশ্যই চেক করে নেবেন যে আকুপাংচারের সূঁচগুলো আপনার কুচকি, পা, বগল বা হাতের দিকে যেন না দেওয়া হয়। মোটের উপরে যেসব জায়গায় আপনার লিম্ফনোডের সার্জারি হয়েছে, তার আশেপাশে আকুপাংচারের নিডিল না ফোটানোই ভালো।
কেউ কেউ নানা ধরনের প্রাকৃতিক সাপ্লিমেন্ট ব্যবহার করেন। এক্ষেত্রে সতর্ক থাকা প্রয়োজন যে, কিছু কিছু প্রাকৃতিক সাপ্লিমেন্টে গাছের ইস্ট্রোজেন হরমোন শরীরে ঢোকে, যার নাম ফাইটো-ইস্ট্রোজেন।
প্রাণিজ ইস্ট্রোজেনের মতোই ফাইটো-ইস্ট্রোজেন মানুষের শরীরের মেনোপজের সিম্পটমের মোকাবিলা করলেও, অনেক সময় বাড়তি ফাইটো-ইস্ট্রোজেনে ক্যান্সার ফিরে আসার সম্ভাবনা বাড়তে পারে। অতীতে Black Cohosh, Red Clover এবং Soybean জাতীয় কিছু ওষুধপত্রে এই ধরনের সমস্যা হয়েছে বলে আশঙ্কা করা হয়েছে। সুতরাং, কোনো পাউডার বা সাপ্লিমেন্ট খাবার আগে আপনার ডাক্তার বাবুর সঙ্গে পরামর্শ করে নিন।
মেডিকেল রিসার্চ প্রতিদিনই অগ্রসর হচ্ছে। নতুন নতুন ধ্যান ধারণা ও তথ্য আমাদের সামনে আসছে। এর মধ্যে বোধহয় সব থেকে বেশী উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন হয়েছে, অস্টিওপোরোসিস বা হাড়-হালকা হয়ে যাওয়ার ট্রিটমেন্টে।
আগেকার দিনে মহিলাদের অস্টিওপোরোসিস বেশীরভাগ সময়, হরমোনাল ট্রিটমেন্ট (ইস্ট্রোজেন) দিয়ে ট্রিটমেন্ট করা হতো। কিন্তু, ইদানিং অর্থোপেডিক্সের রিসার্চ থেকে নানা ধরনের যুগান্তকারী কিছু ওষুধ পত্র আবিষ্কার হয়েছে। এতে হাড় হয়ে ওঠে আরও শক্ত। এই ওষুধগুলো ক্যান্সারের সম্ভাবনা থেকে নিরাপদ।
সাথে ব্যায়াম এবং বৈজ্ঞানিক পদ্ধতিতে জীবনযাত্রা চালালে, সমস্যা হওয়ার প্রবণতা আরও যায় কমে। বুঝতেই পারছেন, আমরা লেখাটা ব্যায়াম দিয়ে শুরু করলাম, আর ব্যায়াম দিয়ে শেষ করলাম। সুতরাং, ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য চাই, ভালো জীবনযাত্রা, নিয়মিত এক্সারসাইজ, সঠিক খাবার-দাবার এবং আত্মবিশ্বাস। ক্যান্সারের কারণে মেনোপজ হলেও আপনার ভবিষ্যৎ এখন উজ্জ্বল।
নিজের আত্মবিশ্বাসের আলোয় ভালো থাকতে শিখুন।
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Menopause Ovarian Cancer Ovary Cervical Cancer Cervix Uterine Uterus Cancer Chemotherapy HRT Vaginal Dryness Lubricant



