ফাইব্রয়েড- সর্তকতা
বেশিরভাগ ফাইব্রয়েড নন-ক্যান্সার, বন্ধু ফাইব্রয়েড হলেও ফাইব্রয়েড নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকে মেডিকেল সাইন্স এর জটিলতা। ডক্টরস চেম্বারের ভেতরের কিছু কথা
মহিলাদের জীবনে যে টিউমার সবথেকে বেশি দেখা যায় তার নাম বোধহয় ফাইব্রয়েড। কিন্তু টিউমার মানেই ক্যান্সার নয় এবং বেশিরভাগ ফাইব্রয়েডই বন্ধু ফাইব্রয়েড।
ল্যাপারোস্কোপি বা রোবটিক সার্জারিতে পেট না ওপেন করেই বড় ফাইব্রয়েড কে বের করে ফেলা যাবে শুনে অনেক পেশেন্ট স্বস্তির নিশ্বাস ফেলেন।
এক কালে ডাক্তাররাও খুশি হতেন। কিন্তু, আমেরিকার বোস্টন শহরের ডাক্তার রিড, নিজেই পেশেন্ট হিসেবে এই ফাঁদে প্রাণ হারান।
ওনার স্বামী অভিযোগ করেন, ডাক্তাররা নাকি পেশেন্টদের অর্ধ-সত্য তথ্য দিয়ে ‘কিছু হবে না’ বলে সার্জারি করে দেন। বড় ফাইব্রয়েডকে ছোট ছোট টুকরো করে বের করে দেন, পেশেন্টদের পুরো রিস্ক-বেনিফিট না বলেই। উনি বললেন, ডাক্তারদেরই নাকি এ ব্যাপারে সচেতনতা নেই। ব্যাপারটা কী?
ডাক্তার রিড-এর অঘটনের পর টনক নড়ল ডাক্তার আর পেশেন্ট দুজনেরই।
অনেক ফাইব্রয়েড আকারে বাড়ে না এবং কোন উপসর্গই আসে না। কিছু ক্ষেত্রে তার চিকিৎসারও দরকার হয় না।
আপনি দেখবেন আপনার আশেপাশে মহিলাদের মধ্যে অনেকেরই ফাইব্রয়েডের কোন চিকিৎসার দরকার হয়নি।
তারা সারা জীবন ফাইব্রয়েড নিয়ে থেকে গেছেন।
আবার কিছু কিছু মহিলার ওষুধপত্র, এমনকি ধুন্ধুমার সার্জারিও দরকার হয়েছে ফাইব্রয়েড এর জন্য। ঠিক তাই, কার, কোন ফাইব্রয়েড আছে এবং সে ফাইব্রয়েডের কি চিকিৎসা হবে সেটা পেশেন্ট এবং ডাক্তার বাবু যৌথভাবে সামনা সামনি ব্যক্তিগত স্তরে আলোচনা করেন।
আর ঠিক এখানেই দরকার সতর্কতা। বেশিরভাগ ফাইব্রয়েড নন-ক্যান্সার বন্ধু ফাইব্রয়েড হলেও ফাইব্রয়েড নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আনাচে-কানাচে লুকিয়ে থাকে মেডিকেল সাইন্স এর জটিলতা।
ফাইব্রয়েড নিয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে কিছু ব্যাপারে বিশেষ সতর্কতা প্রয়োজন। তারই কয়েকটা নিয়ে আলোচনা করেছি এখানে।
‼️ এই জটিলতার গভীরে ঢুকতে হলে প্রথমেই যে ধাপটা আপনাকে জেনে নিতে হবে তা হল ফাইব্রয়েডকে ফাইব্রয়েড হিসেবে কিভাবে চেনা যায়?
কখনো কখনো ফাইব্রয়েডের আড়ালে লুকিয়ে থাকে ফাইব্রয়েডের মতো দেখতে অন্য কোন টিউমার বা অসুখ।
🛑 সাধারণত ফাইব্রয়েড এর ডায়াগনোসিস হয় আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যানের মাধ্যমে। সেটা আমি- আপনি পাড়ার সবাইকেই দেখি যে ফাইব্রয়েড হলেই মানুষজন আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান করাচ্ছেন।
কিন্তু আসলে ফাইব্রয়েড এর সঠিক ডায়াগনোসিস হয় সেই ফাইব্রয়েডটি শরীর থেকে বার করে নিয়ে এসে, মাইক্রোস্কোপের তলায় রাখলে তখনই। কিন্তু সে তো মুখের কথা নয়। তার জন্য দরকার একটা সার্জারি!!
আর ঠিক এইখানেই লুকিয়ে আছে প্রথম সর্তকতা।
‼️তার কারণ আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যানে যে সমস্ত টিউমারকে ফাইব্রয়েড বলে মনে হয়, মাইক্রোস্কোপের তলায় রাখলে সবগুলো টিউমারই কিন্তু ফাইব্রয়েড হয় না। দেখা যায়, অন্যান্য অনেক টিউমার ফাইব্রয়েডের ছদ্মবেশে আল্ট্রাসাউন্ডে ধরা দিয়েছে।
এর মধ্যে যেমন রয়েছে শান্তশিষ্ট পলিপ, একটু দুষ্টু এডিনোমায়োসিস এবং এন্ডোমেট্রিওসিস বলে এক ধরনের ইউটেরাসের সমস্যা। এমনকি কিছু বিরল ধরনের নজর এড়িয়ে থাকা প্রেগনেন্সিও ফাইব্রয়ডের ছদ্মবেশে আসে। আরও কিছু কিছু কন্ডিশন যেগুলো ফাইব্রয়েডের ছদ্মবেশে আসে সেগুলোর মধ্যে রয়েছে সারকোমা, কার্সিনোসারকোমা বলে বিভিন্ন ক্যান্সারের মতো সমস্যাও। তাহলে উপায়?
ভালো থাকার উপায়টা সত্যি একটু কঠিন, তবে জেনে নিলেই সহজ।
আল্ট্রাসাউন্ড বা এম আর আই স্ক্যান যাই করা হোক, সবেতেই ফাইব্রয়েডকে, ছায়া দেখে ডায়াগনোসিস হয়। এই ডায়াগনসিস আসলে অনুমান। এর মধ্যে নানা রকম অংকের হিসেব লুকিয়ে থাকলেও শেষ পর্যন্ত কোন স্ক্যানই 100 শতাংশ ডায়াগনোসিস দিতে অক্ষম।
তাই, পুরোপুরি সমাধান সূত্র না থাকলেও, যে ফাইব্রয়েড বড় হয়ে যাচ্ছে বা যে ফাইব্রয়েডের উপসর্গ দিনকে-দিন খারাপ হচ্ছে সেই ফাইব্রয়েড গুলোর উপরে বাড়তি নজর রাখা প্রয়োজন।
🛑 মনে রাখা দরকার মহিলাদের পিরিয়ড তাদের জীবনে যে বয়সে হয়, সেই বয়সগুলোতেই ফাইব্রয়েডের সমস্যা হয়।
মেনোপজের পরে যদি কখনো ব্লিডিং হয় বা নতুন ফাইব্রয়েড আসে - তাহলে সেই ফাইব্রয়েড এর দিকে যথেষ্ট নজর রেখে ডাক্তারবাবুর কাছে জরুরি পরামর্শ করে নিন।
মনে রাখা দরকার আরো একটি বিষয়: মহিলাদের জীবনে নানা কারণে অনেক সময় আল্ট্রাসাউন্ড হয়।
পুরনো এই আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যানের প্রত্যেকটি রিপোর্ট ই সযত্নে রেখে দেওয়া দরকার। তার কারণ ভবিষ্যতে যদি কোন ফাইব্রয়েড পাওয়া যায়, সেই ফাইব্রয়েড এর সঙ্গে অতীতের স্ক্যানগুলো মিলিয়ে এবং তুলনা করে দেখলে ফাইব্রয়েড এর কোন চিকিৎসা সেই মহিলার জন্য সবচেয়ে উপযুক্ত হবে, তার চাবিকাঠি পাওয়া যায়। সুতরাং পুরনো আল্ট্রাসাউন্ড স্ক্যান ফেলে দেবেন না।
🔴এরপর চলে আসি অত্যন্ত বিতর্কিত বিষয়ে যার নাম মর্সেলেশন (Morcellation)
সহজ ভাবে বলতে গেলে যা দাঁড়ায় সেটা হল অনেক বড় আকারের ফাইব্রয়েড পেট কেটে অপারেশন না করে অনেক সময় laparoscopy পদ্ধতিতে ছোট ফুটোর মাধ্যমে অপারেশন করা হয়।
সেই ফাইব্রয়েডের অপারেশন তো ছোট ফুটো দিয়ে হয়ে গেল। ফাইব্রয়েড কে ইউটেরাস থেকে কেটে ফেলা হলো।
কিন্তু সেই বড় মাপের সেই টিউমার পেট থেকে বেরোবে কি করে?
এইখানেই ভূমিকা মর্সেলেটর বলে একটি যন্ত্রের।
এই যন্ত্র চোখের নিমেষে অপারেশন হয়ে যাওয়া বড় টিউমার, যখন পেটের ভিতরে রয়েছে, সেই অবস্থাতেই ছোট ছোট করে কেটে টুকরো করে দেয়। যাতে সেই টিউমার পেটের ছোট্ট সরু ফুটোর মধ্যে দিয়ে বেরিয়ে আসতে পারে।
এটি নিঃসন্দেহে বিজ্ঞানের একটা বড় পদক্ষেপ এবং মহিলা পেশেন্টদের জন্য এটা আকর্ষণীয় ব্যাপার। পেট না কেটেই যদি ছোট্ট সরু ফুটোর মধ্যে দিয়ে এত বড় একটা টিউমার বের করে দেওয়া যায় তার থেকে ভালো ব্যাপার বোধ হয় আর কিছু হয় না। পেশেন্ট এবং ডাক্তারদের জন্য ব্যাপারটা খুবই ভালো ছিল। কিন্তু গোল বাঁধল এক জায়গায়।
২০১৩ সালে ডাক্তার এমি রিড এর Hysterectomy হয় এই মর্সেলেশন যন্ত্র ব্যবহার করে। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমেরিকার বোস্টন শহরে হওয়া এই অপারেশনের পরে দেখা গেল সেই ফাইব্রয়েডের আড়ালে ছদ্মবেশে লুকিয়ে ছিল এক ধরনের ক্যান্সার।
ডাক্তার রিড-এর স্বামী ডাক্তার হুমান নূরচ্যাসম অভিযোগ করেন যে এই মর্সেলেশন যন্ত্র ব্যবহার করার ফলে সেই অনুমান করে নেওয়া ফাইব্রয়েড এর টিউমারের অংশ পেটের চারদিকে ছড়িয়ে ক্যান্সার কে আরো বাড়বাড়ন্ত করে তোলে। শেষ পর্যন্ত ডাক্তার রিড মারা যান কিছুদিনের মধ্যেই। ডাক্তার নূরচ্যাসম দাবি করেন যে এই মর্সেলেশন নিয়ে পেশেন্ট এবং ডাক্তার দের মধ্যে যথেষ্ট সচেতনতা নেই।
এই ঘটনার পরে সারা পৃথিবী জুড়ে ডাক্তারদের সংগঠন এবং নানা রিসার্চ পেপারে ডাক্তারদের বারংবার সতর্ক করা হয়েছে যে মর্সেলেশন ব্যবহারের আগে পেশেন্টকে এই সম্ভাবনার কথা গুছিয়ে বলতে।
কারণ অনেক পেশেন্টই চাইতে পারেন যাতে পেট না কেটে, ল্যাপারোস্কপি অপারেশন হয়। তিনি আরও তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠেন। পেট কাটার দরকার-ই না হয়। আর পেটে অপারেশনের দাগ কেই বা চান।
আইনি লড়াই চলল বহুদিন ধরে।
শেষ পর্যন্ত আজকের দিনে যে যে কোম্পানি মর্সেলেটর তৈরি করে সেই প্রতিটি কোম্পানি মার্সেলেটরের প্রতিটি প্যাকেজের ওপরে সতর্কীকরণ বার্তা লিখতে বাধ্য হয়েছে, যাতে ডাক্তার বাবুদের মাধ্যমে পেশেন্ট অপারেশনের আগে সঠিক বার্তা পান।
আমেরিকার ফুড এন্ড ড্রাগ এডমিনিস্ট্রেশন , সংক্ষেপে যাকে বলা হয় FDA, নামক যে নিয়ামক সংস্থা রয়েছে যারা এই নিয়ে বিধিসম্মত সতর্কীকরণ জারি করেন , FDA Notice -এর ওয়েব পেজটির লিংক নিচে রইল। আপনারা পড়ে নিতে পারেন। তার কারণ এর মধ্যে যে ওয়ার্নিং রয়েছে সেটা অনেক সময়ই নানা রকম রিসার্চ এর ফলে খানিকটা হলেও কিছুদিন বাদে-বাদে পাল্টে যায়। আপনার অনুসন্ধিতসু মন যদি এ ব্যাপারে জানতে চায় তাহলে এই লিংক পড়ে নিন।
মর্সেলেশন যন্ত্র ব্যান করে দেয়া হয়নি এখনো পর্যন্ত। হয়তো কিছু পেশেন্ট ভালো-মন্দ বুঝে মর্সেলেশন চাইতেও পারেন। কিন্তু মার্সেলেশন ব্যবহার হলে সতর্কতা প্রয়োজন।
বহু পেশেন্ট এই সময় আমাকে জিজ্ঞাসা করেন, আচ্ছা ডাক্তার বাবু অপারেশনের আগে কি বোঝার কোন উপায় নেই যে এই ফাইব্রয়েড কি ক্যান্সার, না কি, ক্যান্সার না? এর উত্তর অনেক রকম হয়। কেউ বলেন “সম্ভাবনা বেশি”, কেউ বলেন “সম্ভাবনা কম”
আবার কোনো ডাক্তার বলেন “সম্ভাবনা প্রায় নেই বললেই চলে”
কিন্তু আসল উত্তর : যতক্ষণ না সেই টিউমার মাইক্রোস্কোপের নিচে নিয়ে রাখা হচ্ছে ততক্ষণ পর্যন্ত এটা যে 100%ক্ষেত্রেই যে সত্যি সত্যিই ফাইব্রয়েড সেটা পুরোপুরি বোঝার কোনই রাস্তা নেই।
তার মানে এই নয় যে ফাইব্রয়েড দেখলেই তার সার্জারি করে ফেলতে হবে।
কিন্তু এই আলোচনার উপসংহার একটি -ই।
সেটা হল, ভালো করে বুঝে শুনে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে কথা বলে নিজে পড়াশোনা করে সঠিক সিদ্ধান্ত নিন।
এবং সেই সঠিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে জানুন- মেডিকেল সাইন্স এর যে কোন সিদ্ধান্তের মতোই আপনার নেওয়া যে কোনও সিদ্ধান্তও 100% সঠিক হবে না। 100% বলে মেডিক্যাল সাইন্স এ কিছু হয় না। তাই আতঙ্কিত না হয়ে মনে সন্দেহ থাকলে সার্জারির আগে ডাক্তারবাবুকে মর্সেলেটর এর ব্যাপারে সব প্রশ্নের উত্তর জিজ্ঞাসা করে নিন।
শুধু লুকোনো ক্যান্সারেই এ সমস্যা হয় না। ফাইব্রয়েড ছোট ছোট করে কেটে বাদ দিলে, ‘ফাইব্রয়েডে’ ক্যান্সার না থাকলেও ‘disseminated leiomyomatosis’ ধরনের কিছু সমস্যা দেখা দিতে পারে। যদিও বিরল কিন্তু, পেশেন্টদের জানার অধিকার রয়েছে। তাই সাবধানতা প্রয়োজন।
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
আরও পড়তে হলে
References
Giuntoli RL 2nd, Metzinger DS, DiMarco CS, et al. Retrospective review of 208 patients with leiomyosarcoma of the uterus: prognostic indicators, surgical management, and adjuvant therapy. Gynecol Oncol. 2003;89(3):460-469.
Dinh TA, Oliva EA, Fuller AF Jr, Lee H, Goodman A. The treatment of uterine leiomyosarcoma. Results from a 10-year experience (1990-1999) at the Massachusetts General Hospital. Gynecol Oncol. 2004;92(2):648-652.
Tsikouras P, Liberis V, Galazios G, et al. Uterine sarcoma: a report of 57 cases over a 16-year period analysis. Eur J Gynaecol Oncol. 2008;29(2):129-134.
Kho KA, Lin K, Hechanova M, Richardson DL. Risk of occult uterine sarcoma in women undergoing hysterectomy for benign indications. Obstet Gynecol. 2016;127(3):468-473.
Hosh M, Antar S, Nazzal A, Warda M, Gibreel A, Refky B. Uterine sarcoma: analysis of 13 089 cases based on surveillance, epidemiology, and end results database. Int J Gynecol Cancer. 2016;26(6):1098-1104.
Brooks SE, Zhan M, Cote T, Baquet CR. Surveillance, epidemiology, and end results analysis of 2677 cases of uterine sarcoma 1989-1999. Gynecol Oncol. 2004;93(1):204-208.
Sun S, Bonaffini PA, Nougaret S, et al. How to differentiate uterine leiomyosarcoma from leiomyoma with imaging. Diagn Interv Imaging. 2019;100(10):619-634.
এফডিএ নোটিশ পড়ুন এখানে
Search tool: Fibroids Fibroid Non-Cancer Tumor Ultrasound Scan Adenomyosis Endometriosis Sarcoma Carcinosarcoma Morcellation Laparoscopy Hysterectomy FDA







