একা ?
মহাকাশে সর্দি? ব্রেনে মেডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বলে একটি ছোট কেন্দ্রে লুকিয়ে থাকে একাকীত্ব মোকাবিলা করার চাবিকাঠি। কিন্তু সবার পক্ষে দোকা হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। ইচ্ছেও থাকে না। তাহলে?
অসহ্য !
বেয়ারা প্রশ্নেরও কিছু সীমা হয়!
ব্যাপারটা শুরু হয়েছিল মহাকাশচারীদের কেন সর্দি লাগে তাই নিয়ে।
বুঝুন কাণ্ড! তারপর যা হয় তাই !
বেরোলো কেঁচো খুঁড়তে সাপ।
মানুষকে শাস্তি দেওয়ার সব থেকে ভালো উপায় হয়ত তাকে জেলে পুরে দেওয়া। আপনি ব্যক্তিগতভাবে কি মনে করেন তাতে কিছু যায় আসে না। কিন্তু দেশ এবং সমাজ বোধ হয় এটাই ভাবে।
আসলে মানুষের নির্বাসনে বড় ভয়।
লক্ষ বছরের ইতিহাসে মানুষ থেকেছে একসাথে। তাই যখন কোন কারনে মানুষকে একা হয়ে যেতে হয়, তখন যেন পেয়ে বসে আতঙ্ক আর মন খারাপ।
সবার অবশ্য একলা হতে জেলখানা যেতে হয় না। আটমহলা বাড়ির এয়ার কন্ডিশন্ড ড্রইং রুমে বসে নেটফ্লিক্সের রিমোট হাতে নিয়েও কেউ একলা হয়ে যেতে পারে।
একা হয়ে যাওয়াটাই যেন জীবনের ভবিতব্য।
ইন্দ্রের অভিশাপে যখন স্বর্গলোকের গন্ধর্ব সৌরসেনের স্বর্গ থেকে পতন হলো মর্ত্যে, তখন তার প্রেয়সী মধুশ্রীর কাতর অ্যাপ্লিকেশনে সাড়া দিয়ে ইন্দ্রানী তাকে-ও পাঠিয়ে দিলেন কালি ঝুলি মাখা মর্ত্যে।
বললেন, যাও মর্ত্যে। সেখানে দুঃখ পাবে। দুঃখ দেবে। আদৌ স্বর্গলোকে কি হয়েছিল সে আমার বোঝার কোন উপায় নেই। তবে এই কথাগুলো যে চরম বাস্তব সেটা রবীন্দ্রনাথের কলমের খোঁচাতেই আমরা বুঝতে পারি।
কিন্তু একা থাকা আসে নানা রকম ছদ্মবেশে।
কখনো ছোটবেলায় ক্লাসে ঠিকঠাক বন্ধু জোটে না।
কলেজ লাইফে কখনো হাত ছাড়াছাড়ি হয়ে গিয়ে মাসের পর মাস চলতে থাকে একাকীত্ব।
কারো ডিভোর্স হয়ে যায়।
কারোর বাবা-মা আকাশের তারা হয়ে যান।
অফিসে নিবেদিত প্রাণ মানুষটি retirement এর পরে একা হয়ে যান হঠাৎ, কেউবা একা হয়ে যান জীবনের পিছন দিকের বছরগুলোতে। যখন কয়েক দশকের সঙ্গী আর না-ফেরার দেশে চলে যান।
একা থাকার বয়স হয় না।
ব্যাপারটা নিয়ে যে একদম সন্দেহ ছিল না, তেমন নয়। মহাকাশবিজ্ঞানীদের মাসের পর মাস, মহাকাশে থাকতে থাকতে জ্বর জারি হচ্ছে, নাক দিয়ে ফ্যাঁচ ফ্যাঁচে সর্দি। সেখানে তো হাতের পেছন দিয়ে সিকনি মুছে জামাকাপড়ে সর্দি ভাইরাসের হরির লুট দিচ্ছি না আমরা ! ওনাদের তো ট্রেন-বাসের পাশের মানুষটি থেকেও সর্দি লাগার সম্ভাবনা নেই।
তাহলে?
সেখানেও তাঁরা হয়ে যাচ্ছেন ‘একা’
সাঁইত্রিশ লক্ষ-কোটি কোষের মানব শরীরে, বিরাশি লক্ষ-কোটি জীবাণু। গা ঘিনঘিনে চরম সত্যি।
তাহলে কি তাদের নিজের শরীরের ইমিউনিটি কমে গিয়ে নিজের শরীরের ভাড়াটে ভাইরাস থেকেই নিজের ইনফেকশন হয়ে যাচ্ছে?
দীর্ঘদিনের একাকীত্বে কী তাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাচ্ছে?
মহাকাশচারীদের ওপর সেরকম মনমতো গবেষণা করা যায়নি। কারণ ওনাদের সংখ্যা নিতান্তই কম।
আর কোথায় পাওয়া যাবে একা, কিন্তু সুস্থ লোকেদের?
তাই গবেষণা চলল আন্টার্টিকায় গবেষণারত বিজ্ঞানীদের ওপরে।
অনেকদিন বাড়ির বাইরে মাসের পর মাস গবেষণা করতে করতে তারা সেখানে একা।
প্রমাণিত হলো এইবার ।
একা থেকে বেড়ে যাচ্ছে তাদের শরীরের স্ট্রেস, বাড়ছে ইনফ্লামেশন বা প্রদাহ, কমছে তাদের মনোযোগ করার ক্ষমতা, ভোঁতা হয়ে যাচ্ছে সিদ্ধান্ত নেওয়ার যুক্তি, ব্যাহত হচ্ছে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা। একাকী থাকায় হরমোনগুলো পাল্টে দিচ্ছে রোগ প্রতিরোধকারী শ্বেত রক্ত কণিকার জেনেটিক প্রোফাইল।
এইতো গেল সমস্যা । কিন্তু সমাধানের উপায়?
সেও আছে বৈকি, কোন সমস্যার সমাধানের প্রথম ধাপই বোধ হয় সেই সমস্যাটিকে ভালোভাবে বোঝা।
ব্রেনের মধ্যে মেডিয়াল প্রিফ্রন্টাল কর্টেক্স বলে একটি ছোট জায়গাতে লুকিয়ে থাকে একাকীত্ব মোকাবেলা করার চাবিকাঠি। বলা চলে এই কেন্দ্রটি মানুষের শরীরের সোশ্যাল নেটওয়ার্কিং এর জায়গা।
কিন্তু কিভাবে বশে রাখা যায় মস্তিষ্কের এই কেন্দ্রকে? চলল গবেষণা সেই নিয়েও।
‘একা’ থাকার ওষুধ হিসেবে ‘দোকা’ থাকাটা যেন একটা সহজ সমাধান ।
কিন্তু সবার পক্ষে দোকা হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। ইচ্ছেও থাকে না।
উপরন্ত জোর করে দোকা হতে গেলে কোন কারণে যদি সেটা সফল না হয়, তাহলে সমুদ্রের ফিরতি ঢেউ এর মত একাকীত্ব আসে আরও প্রবল হয়ে।
অথচ আমাদের আশেপাশের সব জায়গাতে সর্বত্র যেন দোকা হওয়ার হাতছানি।
ফেসবুক খুললেই ফ্যামিলি ডিনার, ইউটিউব খুললেই আশা গাইছেন সিঁথির এই একটু সিঁদুরে সবকিছু বদলে গেল !
সে বদলাক বা ভেঙে যাক, আবেদনটা শক্তিশালী সন্দেহ নেই !
খবরের কাগজ খুললেই বিজ্ঞাপনে ফ্যামিলির সবাই একসাথে গাড়ি করে ঘুরতে বেরিয়েছে। অথবা হিল স্টেশনে মজা করছে,
ইনস্টাগ্রাম খুললেই বন্ধুর বাড়ির ড্রয়িং রুমের পার্টিকে আরো যেন সাজানো গোছানো বলে মনে হয়।
তবে দোকা হয়ে যাওয়ার সুযোগ আর ইচ্ছে থাকলে নিশ্চয়ই হবেন।
সেটা যদি 75 বছর বয়সে গিয়েও হয় তাহলেও সই।
যে সমাজ আপনাকে কোনদিনও দেখতে আসেনি।
আপনি বালিশে মাথা দেওয়ার পরে কতক্ষণ বাদে ঘুমোতে যান তাও সে জানে না ! সে সমাজই দরাজ হাতে মন্তব্য করে 75 এ আপনার দোকা থাকাকে কাটা-ছেঁড়া করতে পিছপা হবে না। করুক। বয়েই গেছে।
খেয়াল করবেন না তাদের।
কিন্তু দোকা থাকার যদি সুযোগ না থাকে তাহলে কি জীবন অন্ধকার?
একদমই নয় ।
মহাকাশচারীদের দেখুন।
তাদের যদি দোকা হতে ইচ্ছে করে? তখন তারা হয়তো চাঁদের পাশে। তাদের কী সেখানে দোকা হওয়া সম্ভব? কিন্তু তারাও ভালো থাকেন, মানে ভালো থাকা শেখেন।
কিভাবে?
এই নিয়ে গবেষণা চলছে। কিন্তু এখনো পর্যন্ত পাওয়া গেছে অল্প কয়েকটা রাস্তা ।
♥️ ডায়েটে আনতে হবে পরিবর্তন।
চিকেন ঝোল, ভাত, চাওমিন আর রসগোল্লা খেয়ে একাকীত্বের বাড়তি স্ট্রেসের সাথে লড়াই করা সম্ভব নয়।
♥️ দেখতে হবে মেডিটেরিনিয়ান ডায়েট বা ভূমধ্যসাগরীয় খাবার দাবারের অভ্যাস আপনার সুট করে কিনা করে কিনা। এই খাবারদাবারে নানা ধরনের কেমিক্যাল আছে, যা আপনার শরীরের ইনফ্লামেশন এবং স্ট্রেস কমাতেও সাহায্য করে।
♥️ একই কাজ করে দৈনিক মাইন্ডফুলনেসের ট্রেনিং, যাকে অনেকেই ধ্যান বলে উপহাস করেন।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় রাস্তায় জগিং করা মানুষজনকে হয়তো টিটকিরি দেয়া হতো, কিন্তু আজকে নিয়মিত এক্সারসাইজ-কে মন্দিরে বসিয়ে পূজা করা হয়।
এভাবেই পাল্টে যায় বিজ্ঞান এবং সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি। আজকে যা উপহাস, বাড়াবাড়ি, কালকে হয়তো তা জীবনদায়ী!
অন্ধকারে চোখ বন্ধ করে ধ্যান করার ধারণাগুলো নিতান্তই ক্লিশে।
পড়াশোনা করে রিসার্চ করে নিন- রান্নাঘরে রান্না করতে করতে বা অটোয় যেতে যেতে কিভাবে আপনি মাইন্ডফুলনেসের ট্রেনিং করতে পারেন।
♥️ সাথে অবশ্যই রাখতে হবে দৈনিক এক্সারসাইজ। বাড়বে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা ।
একাকিত্বের সাইড-এফেক্ট মিলিয়ে যাবে দূরে।
♥️ নিজেকে করে তুলুন স্বয়ংসম্পূর্ণ।
বাড়ির চার দেওয়ালের মধ্যে আটকে না থেকে ক্যাফেতে গিয়ে বসে ইয়ারফোনে শুনুন গান বা শ্রুতি নাটক। আশেপাশের মানুষজন কিভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে লক্ষ্য করুন।
যারা দোকা হতে পেরেছেন, লক্ষ্য করুন তাদেরও। কিন্তু সিনেমা দেখার মত।
ফেসবুক ব্রাউজ করার মত নয়।
সিনেমা দেখার মতো ।
সিনেমা টিভিতে কাশ্মীর দেখলে মনটা ভালো লাগে। কাশ্মীর না গিয়েও ভালো লাগে। সেই রকমই অনেকটা।
ফেসবুকের মত জীবনকে দেখলে মুশকিল।
ফেসবুকের মতো দেখলেই মনে হবে : কই আমি তো ওদের মতো হতে পারলাম না!
এই ধরনের মানসিকতাকে বলা হয় FOMO- fear of missing out
আমরা সবাই একলা এসেছি। একলাই যাব।
সুতরাং নিজেকে স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবতে শিখুন। নিজের মধ্যে খানিকটা অ্যাডভেঞ্চারের মানসিকতা নিয়ে আসুন। যদি সম্ভব হয় একটা ব্যাগ গুছিয়ে বেরিয়ে পড়ুন। কোথাও ঘুরতে। আজকাল অনেক গ্রুপ একা-একা ঘুরতে যাওয়াকে প্রমোট করে। একা ঘুরতে যাওয়া এখন অনেক নিরাপদ।
সেখানে ঘুরতে গিয়েও দেখবেন কতগুলো মানুষের সাথে আপনার যোগাযোগ হয়ে গেল।
দোকা থাকাই মানে যে রোমান্টিক সম্পর্ক এরকম দুর্গন্ধযুক্ত ভাবনা থেকে নিজেকে দূরে রাখুন।
বুক বাজিয়ে বলতে থাকুন।
আমি একা, কিন্তু নির্বাসিত নই।
কোন বন্ধুবান্ধবের গ্রুপ বা চেনা জানার গ্রুপের সাথে মিশে যদি ভালো লাগে, এনজয় করুন। যেদিন সেই গ্রুপ ভালো লাগবে না বেরিয়ে আসুন। সারা জীবনের বন্ধু বলে কেউ হয় না।
সারা জীবন যদি কেউ আপনার সাথে থাকে সে আপনি নিজেই।
তাই দশ বছরের চেনা গ্রুপ থেকে নিজের মানসিক আত্মরক্ষার খাতিরে বেরিয়ে আসতে হলে হাপুস নয়নে কাঁদতে বসবেন না।
মহাজগতে অনেক বিরল ঘটনা ঘটে। যেটা কোনদিন সম্ভব নয় সেরকম জিনিসও ঘটে। পৃথিবীতেও প্রাণ এসেছিল এ রকমই এক কোন বিরল ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে।
তাই আপনার আর বন্ধু হবে না, আপনার আর নিজস্ব ঘুরে বেড়ানোর গ্রুপ হবে না, সেটা আপাতত বিরল বলে মনে হলেও সেটা সম্ভব হতেই পারে।
আজকাল আধুনিক জীবনযাপনে একাকিত্ব যেন এক মহামারী।
কিন্তু আমাদের কোন ট্রেনিং নেই এই একাকিত্বের সাথে লড়াই করার।
কিন্তু একাকীত্ব অবশ্যম্ভাবী।
একটি বাচ্চা ছেলে যেমন সারা বছর অংক কষে তারপরেই পরীক্ষা দিতে যায়। একজন ব্যায়ামবীর যেমন কয়েক বছর চেষ্টা করে তার বাইসেপ, ট্রাইসেপ কে বাড়াতে পারে, ঠিক তেমনি আপনিও দৈনিক কিছুর ছোট ছোট দৃষ্টিভঙ্গি পাল্টে তৈরি করতে পারেন, বর্ষাতির মতো মানসিকতা।
যেখানে বৃষ্টি হলেও আপনি ভিজবেন না।
আরও পড়তে:
একাকিত্ব আর ইনফ্লামেশন
Cole SW, Capitanio JP, Chun K, Arevalo JM, Ma J, Cacioppo JT. Myeloid differentiation architecture of leukocyte transcriptome dynamics in perceived social isolation. Proc Natl Acad Sci U S A. 2015 Dec 8;112(49):15142-7. doi: 10.1073/pnas.1514249112. Epub 2015 Nov 23. PMID: 26598672; PMCID: PMC4679065.
ব্রেনের সামাজিক যোগাযোগের কেন্দ্র
Price RB, Duman R. Neuroplasticity in cognitive and psychological mechanisms of depression: an integrative model. Mol Psychiatry. 2020 Mar;25(3):530-543. doi: 10.1038/s41380-019-0615-x. Epub 2019 Dec 4. PMID: 31801966; PMCID: PMC7047599.
উপশমের কিছু রাস্তা
Countermeasures-based Improvements in Stress, Immune System Dysregulation and Latent Herpesvirus Reactivation onboard the International Space Station – Relevance for Deep Space Missions and Terrestrial Medicine. Brian E. Crucian et al: https://doi.org/10.1016/j.neubiorev.2020.05.007
সোশ্যাল ব্রেন
Self-Other Representation in the Social Brain Reflects Social Connection Andrea L. Courtney and Meghan L. Meyer Journal of Neuroscience 15 July 2020, 40 (29) 5616-5627; DOI: https://doi.org/10.1523/JNEUROSCI.2826-19.2020
বংশানুক্রমিক একাকীত্ব
Gao J, Davis LK, Hart AB, Sanchez-Roige S, Han L, Cacioppo JT, Palmer AA. Genome-Wide Association Study of Loneliness Demonstrates a Role for Common Variation. Neuropsychopharmacology. 2017 Mar;42(4):811-821. doi: 10.1038/npp.2016.197. Epub 2016 Sep 15. PMID: 27629369; PMCID: PMC5312064.
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Medial Prefrontal Cortex Inspiration Diary Alone Immunity Brain Inflammation Mediterranean Diet Mindfulness Training FOMO eka aka







