চুল ঝরে যাওয়া - পরিবারের উদ্দেশ্যে
এ লেখা পেশেন্টের প্রিয়জনেদের জন্য। ক্যান্সারের চিকিৎসা চলাকালীন চুল পড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা শুধু পেশেন্টের জন্য নয়, তাঁর বন্ধু বা ফ্যামিলির জন্যও খুব চ্যালেঞ্জিং একটা ব্যাপার।
ক্যান্সারের চিকিৎসা চলাকালীন চুল পড়ে যাওয়ার ব্যাপারটা শুধু পেশেন্টের জন্য নয়, তাঁর বন্ধু বা ফ্যামিলির জন্যও খুব চ্যালেঞ্জিং একটা ব্যাপার। অনেকেরই কেমোথেরাপি নেওয়ার সময় ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার কারণে, চুল ঝরে যায়। কখনও চিরতরে। তবে বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আবার চুল ফিরে আসে।
তাঁর প্রিয়জনেরা বুঝতে পারেন না, কীভাবে সাপোর্ট করা উচিত নিজের বাড়ির প্রিয় মানুষটিকে।
এ লেখা পেশেন্টের প্রিয়জনেদের জন্য।
ক্যান্সারের ট্রিটমেন্টে মাথার চুল পড়ে যাওয়া অনেক সময়ই, খুব বিচলিত করে তোলে পেশেন্ট এবং তার পরিবারের মানুষজনকে। কখনো এমনও হয় অসুখের থেকে চুল পড়ে যাওয়াটাই, মনে কষ্টের বড় কারণ হয়। যদিও বেশীরভাগই বোঝেন যে চুল থেকে অসুখটা বড়। অনেকে প্রশ্ন করেন, ‘জানি এটা ভয়ঙ্কর কিছু নয়, কিন্তু আমার কি চুল পড়ে যাবে?’
উত্তর দেওয়াটা জরুরী। তার থেকে আরও গুরুত্বপূর্ণ, ‘সত্যি উত্তর’ পাওয়াটা। অগোছালো, অর্ধসত্য উত্তর দিলে পেশেন্ট একদিন তা ঠিকই বুঝে ফেলেন। পরিবারের মানুষদের এটা মনে রাখা প্রয়োজন।
যখনই এই হেয়ার লস ব্যাপারটা মাথায় আসবে, তখনই ভাবতে হবে পেশেন্ট একটি কঠিন অসুখের লড়াইয়ের মধ্যে দিয়ে যাচ্ছেন এবং সেই অসুখ থেকে সেরে ওঠার জন্যই, ওনার কেমোথেরাপি বা অন্যান্য ট্রিটমেন্ট চলছে। বেশীভাগ সময় সমস্যাটা সাময়িক। ত্বকে চুলের অজস্র আঁতুড় ঘর থাকে, যেখান থেকে চুল গজায়। একে বলে ফলিকল। কেমোর কারণে এই ফলিকলগুলো নষ্ট হয়ে যায়।
কেমোর পর যদিও আস্তে আস্তে চুল গজিয়ে ওঠে। হাতে গোনা, অল্প কিছু কেমো আছে যখন আর চুল ফিরে আসে না। কেমোর ডাক্তারবাবুকে জিজ্ঞেস করে নিলেই, উত্তর পেয়ে যাবেন।
চুল পড়ে যাওয়া মানে কিন্তু এই নয় যে, ওনার জীবদ্দশা সীমিত বা উনি জীবনে আর কিছুই করতে বা উপভোগ করতে পারবেন না। চুল ঝরে যাওয়া মানে এই, যে লড়াইটা চলছে জবরদস্ত।
কিন্তু এটাও সত্যি, যত বৈজ্ঞানিক যুক্তি দেওয়া হোক না কেন, এই সময় কোনো কিছুতেই মন ঠিক থাকতে চায় না, এমনকি কিছু পেশেন্ট এসময় নিজেদের আয়নাতে দেখতেও এড়িয়ে যান। ব্যাপারটা পেশেন্টের ফ্যামিলির জন্যও মোকাবিলা করা, বেশ কঠিন হয়ে ওঠে। তারা বুঝতে পারে না কী করা উচিত, কীভাবে সাপোর্ট করা উচিত, নিজের বাড়ির প্রিয় মানুষটিকে।
তবুও আমি চিকিৎসক হিসেবে মুগ্ধ হয়ে যাই যখন দেখি, বৈজ্ঞানিক তথ্য তেমন না জেনেও, বেশ কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সার পেশেন্টদের স্বামী, ভাই-বোনেরা, বন্ধুরা, এমনকি বাচ্চারা তাদের বাড়ির ক্যান্সার আক্রান্ত মানুষটির মন ভালো করার আন্তরিক প্রয়াস চালিয়ে যান অবিরত। তখন বুঝি, হেয়ার লসের আসল চিকিৎসা মাথায় নতুন চুল এনে দেবার মধ্যে নয়।
পেশেন্ট যখন বোঝেন যে ওনার চুল থাকা, না থাকা নিয়ে পরিবার, বন্ধু, পাড়ার লোকজন, ডাক্তার ও হাসপাতাল বিন্দুমাত্র অন্য চোখে ওনাকে দেখছেন না, তখন অনেক সমস্যার মধ্যেও উনি বেঁচে থাকার রসদ খুঁজে পান। কিন্তু এটাও সত্যি যে, এই মানসিক সাপোর্টটা দেওয়াও খুব চ্যালেঞ্জিং, অন্তত বাড়ির লোকের জন্য।
বাড়ির লোকের কাছে সবার প্রথম ভাবনা থাকে যে, পেশেন্ট কীভাবে সুস্থ হবে। এরপরেই বাড়ির লোক ও বন্ধুদের মাথায় আসে, পেশেন্টকে কতটুকু বলবো আর কতটুকু বলবো না এবং কীভাবেই বা চুল পড়ার কথা বলবো সেটাও।
মনের দ্বিধায় দীর্ণ হয়ে যান ওনারা।
তবে বাড়ির লোকের বাড়তি মনকষ্টের বোঝা কিন্তু, পেশেন্টের ওপর চাপিয়ে দেওয়া যাবে না। এটা সত্যি খুব কঠিন ব্যাপার যে, এতদিন ধরে পরিবারের লোকজন যেভাবে স্ত্রী, মেয়ে বা বোনকে যেভাবে দেখে এসেছেন, হঠাৎ একটা ক্যান্সার চিকিৎসা হয়তো তার চেহারাটাই বদলে দিয়েছে। ভালোবাসার জনের শরীর খারাপ তাঁদের খুব বিচলিতও করে তুলেছে।
যদিও পেশেন্টের কষ্টের কারণ আর বাড়ির লোকের দুঃখের কারণ, কিন্তু আলাদা হতে পারে।একে বলে এক্সপেকটেশন মিসম্যাচ। বাংলায়, আশা বা প্রত্যাশার অমিল। এর জন্য পেশেন্টকে সময় দিতে হবে, বুঝতে হবে উনি ঠিক কী চাইছেন। পেশেন্টের কষ্টটা বা সে কী চাইছে সেটা বুঝতে হলে, নিজেকে তার জায়গায় বসিয়ে বুঝতে হবে। জানতে হবে, পেশেন্ট কী চান সেটা, বাড়ির লোক কী চাইছেন সেটা নয়।
একে বলে এক্সপেকটেশন মিসম্যাচ।বাংলায়, আশা বা প্রত্যাশার অমিল। এর জন্য পেশেন্টকে সময় দিতে হবে, বুঝতে হবে উনি ঠিক কি চাইছেন। পেশেন্টের কষ্টটা বা সে কি চাইছে সেটা বুঝতে হলে, নিজেকে তার জায়গায় বসিয়ে বুঝতে হবে। জানতে হবে, পেশেন্ট কি চান সেটা, বাড়ির লোক কি চাইছেন সেটা নয়।
কেমোথেরাপি ছাড়াও, পেশেন্টরা যখন ক্যান্সার ট্রিটমেন্টের মধ্যে দিয়ে যান অনেকেরই চুল পাতলা হয়ে যায় বা হেয়ার ফল হয়। এর জন্য অনেকক্ষেত্রে দায়ী দুশ্চিন্তা, কম ঘুম বা খাওয়াদাওয়ার সমস্যা।
আসলে মাথার চুল, আমাদের ব্যাক্তিত্বের সঙ্গে জড়িয়ে থাকে। তাই একেকজন একেক রকমভাবে রেসপনস্ করেন। অনেক মহিলাই আছেন যারা, এটাকে খুব স্বাভাবিক মনে করে মেনে নেন। তাদের এই চুল পড়া নিয়ে কোনো ইন্টারেস্ট নেই। তাই তারা উইগ পরেন না, এমনকি স্কার্ফ দিয়ে হেড কভারিং করতেও চান না।
আবার অনেকে ভালো উইগ পড়তে চান। উইগ পছন্দ না হলে, বাড়ির বাইরে বেড়তেও চান না। এতে ওনাদের মূল্যবান দৈনিক হাঁটা-চলা, ব্যায়াম এমনকি দিনের আলো থেকে ভিটামিন ডি পাওয়ার সুযোগও হাতছাড়া হয়ে যায়।
পেশেন্টকে কেউই বলবেন না, ‘অমুক তো এটা করেছে তাই, তুমিও সেটা কর’। অনর্থক শুধু ‘কিছুই হয়নি’ ‘সব ঠিক আছে’ এমন কথা বলবেন না। পেশেন্ট জানেন, এটা সত্যি কথা নয়। এতে মুখে না বললেও, পেশেন্টের মনে দুঃখ হয়। পেশেন্ট কী চান সেটাকেই, সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিন। সেভাবেই তাঁকে সাপোর্ট করুন।
কেউ চান যে আপনি ওনার সঙ্গে চুল ছাড়া অন্য কোন ব্যাপারে, একটু গল্প করুন। কেউবা হয়তো একটা ভালো রংচঙে পোশাক বা জুয়েলারি পছন্দ করবেন। এরকম রকমারি জিনিস ব্যবহার করলে, মনটা অন্য দিকে থাকে। কেউ চান চোখকে হাইলাইট করে মেকআপ। যাতে অন্যদের চোখ চুলের বদলে তার চোখে আটকে যায়। ব্যবহার করতে পারেন সুন্দর ডিজাইনের স্কার্ফ।
ভুরু পাতলা হলে ব্যাবহার করতে পারেন, বড়ো মাপের সানগ্লাস। না এসব নিছক ফ্যাশন বলে মনে করবেন না। নিজেকে সাজানো তো নিজেকেই আরও, বেশী ভালবাসা। ভালবাসা কি কখনও চুলে আটকে থাকতে পারে?
এটা ভাবুন যে, এসবের জন্য পেশেন্টের আত্মবিশ্বাস কতখানি বেড়ে যায়? আর আত্মবিশ্বাস থাকলে হেয়ার লস কেন, দুর্গম পাহাড় ও মানুষ ডিঙ্গিয়ে যেতে পারেন।
এরপরও যদি মনে হয়, আরও কিছু জানা দরকার, তাহলে পেশেন্টের পরিবারের মানুষজনের জন্য রয়েছেন সাইকোলজিস্ট, সোশ্যাল ওয়ার্কার, এমনকি কোনো প্রফেশনাল কাউন্সিলার। চলুন সবাই মিলে জিতে ফেলি যুদ্ধ।
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Cancer Hair Loss Chemo Chemotherapy Anxiety Confidence





