মেনোপজ কী এবং কেন?
এ পৃথিবীর ৩৮০ কোটি মহিলাই একদিন মেনোপজের সমস্যার সম্মুখীন হবেন। এটা কোন রোগ নয়, অসুখ নয়, কোনো অসুখের সিম্পটম নয়। মেনোপজ নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে ভুগতে থাকেন অনেকেই
কোথায় যেন পড়েছিলাম! এ পৃথিবীর ৩৮০ কোটি মহিলাই, একদিন মেনোপজের সমস্যার সম্মুখীন হবেন।
মেনোপজ যে কোনো মহিলার জীবনে অবশ্যম্ভাবী। এটা কোন রোগ নয়, অসুখও নয়। বলা ভালো, মেনোপজ কোনো অসুখের সিম্পটমও নয়।
এটা মহিলাদের জীবনে একটি অত্যন্ত স্বাভাবিক পরিবর্তন। মহিলারা একটা নির্দিষ্ট বয়েস এলেই, মেনোপজ আসবে।
বলা বাহুল্য, ৩৮০ কোটি মহিলার সঙ্গে ৩৮৬ কোটি পুরুষও, মেনোপজের সমস্যায় পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হবেন। কিন্তু মুশকিল হল, এই মেনোপজ নিয়ে অনেক মানুষেরই বোঝা পড়া বা ধ্যান ধারণা সঠিক নয়। আমাদের পেশেন্টরা বলেন, মেনোপজ নিয়ে নিরপেক্ষ তথ্য আমাদের চারপাশে নাকি, অপ্রতুল। স্বভাবতই, মেনোপজ নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা নিয়ে ভুগতে থাকেন অনেকেই। খুব বৈজ্ঞানিক ভাষা বা অত্যন্ত জটিল মেডিকেল রিসার্চের মধ্যে না গিয়ে, আজ আমরা কয়েকটা হেডলাইন নিয়ে সাধারণ ভাষায় আলোচনা করব।
প্রথমেই, মেনোপজ কী ?
মেনোপজ হল, যখন মহিলাদের জীবনে একটা সময় পিরিয়ড বন্ধ হয়ে যায়। তবে শুধু বন্ধ নয়, বন্ধ হয়ে যখন পরবর্তী বারোমাস আর পিরিয়ড হয় না, তখন তাকে বলা হয় মেনোপজ।
কোনো টেস্ট ছাড়া ডায়াগনোসিস শুনতে সহজ লাগলেও, ব্যাবহারিক জীবনে সহজ নয়, কেন?
খেয়াল করে দেখুন, সেই বারোটি মাস অতিবাহিত না হলে, কিন্তু কারোর মেনোপজ হয়েছে বা না হয়েছে সেটা, হলপ করে বলা যায় না। সুতরাং, মেনোপজের ডায়াগনোসিস পেছনে ফিরে হয়। ১২ মাস ধৈর্য ধরে বসে থাকা কী সহজ?
অনেকেই শর্ট কাট চান। মেনোপজ হয়েছে কিনা হয়েছে, তার জন্য একটি জনপ্রিয় হরমোন পরীক্ষা প্রচলন রয়েছে অনেক বছর ধরে। কিন্তু আদতে, সেই হরমোন পরীক্ষা আমাদের মেনোপজের ব্যাপারে সঠিক তথ্য দিতে অপারগ।
এই হরমোনের নাম, FSH। এই হরমোন পরীক্ষা করে মেনোপজ হয়েছে কিনা, এই জানার পদ্ধতিটা যতটাই আকর্ষণীয়, ততটাই ভুলে ভরা। আমরা যখন লন্ডনে রয়েল কলেজের মেম্বারশিপ পরীক্ষা দিতে গিয়েছিলাম, তখন সেই পরীক্ষায় একজন নাছোড় অভিনেত্রী রোগী ( লন্ডন স্কুল অফ ড্রামা থেকে পরীক্ষার জন্য ট্রেনিং নেওয়া) থাকতেন। যিনি পরীক্ষার্থী ডাক্তারকে ক্রমাগত চাপ দিয়ে যাচ্ছেন, “ডাক্তার বাবু আপনি FSH টেস্ট করে আমার মেনোপজটা হয়েছে কিনা ধরে দিন”।
সাংঘাতিক ঝুলোঝুলি শুরু হবে। যেই না ডাক্তারবাবু ওনার অনুরোধে উপরোধের ফাঁদে পা দিয়ে তার FSH টেস্টের প্রেসক্রিপশন লিখবেন, অমনি পাশে বসা পরীক্ষক, সেই পরীক্ষার্থীর নম্বর কেটে দেবেন।
রয়েল কলেজের পরীক্ষায় পরীক্ষার্থী ডাক্তারদের মাথায় ভালো করে হাতুড়ি দিয়ে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, অমোঘ এক বার্তা- FSH লিখো না, FSH দিয়ে মেনোপজ ডায়াগনোসিস করা যায় না। সুতরাং, মেনোপজ হয়েছে কিনা, সেটা জানতে হলে অপেক্ষা করতে হবে বারোটি মাস। জীবনে অনেক কিছুর মতো এতেও শর্টকাট নেই।
কখন মেনোপজ হয়?
সাধারণত, পঞ্চাশের আশেপাশে কোনো এক বয়সে মেনোপজ হয়। দেশ, কাল, খাদ্যাভ্যাস এবং পরিবেশের ওপর নির্ভর করে এই মেনোপজের গড় বয়স, এক এক দেশে এক এক রকম।
ইংল্যান্ডে মেনোপজের গড় বয়স ৫২, ভারতবর্ষে পঞ্চাশের কাছাকাছি।
তবে, এই মেনোপজ কারোর ক্ষেত্রে ৪৫ এ হয়ে যায় আবার কারোর ক্ষেত্রে ৪৮। তবে ৪০ এর আগে যদি মেনোপজ হয়ে যায়, তাহলে অবশ্য বাড়তি কিছু ইনভেস্টিগেশন করা দরকার। ৪০ এর আগে মেনোপজকে বলে, প্রি-ম্যাচিওর মেনোপজ। আর ৪৫ এর আগে মেনোপজকে বলা হয়, আর্লি মেনোপজ। যা ডাক্তারবাবুর সঙ্গে আলোচনা করে নেওয়া ভালো। ৪০ এর আগে মেনোপজ হলে স্বাস্থ্যে কিছু বাড়তি সতর্কতা নেওয়া দরকার।
কিন্তু মেনোপজ হয় কেন?
এর কারণ অনুসন্ধান করতে গেলে আমাদের পেছন ফিরতে হবে, বেশ কয়েক বছর আগে। মেয়েরা যখন মায়ের পেটে থাকে, তখন তাদের ওভারি বা ডিম্বাশয় তৈরি হতে শুরু করে।
সেই মেয়েটি যখন ভূমিষ্ঠ হয়, তখন তার শরীরে রয়েছে নির্দিষ্ট সংখ্যক ডিম বা এগ, যেটা তার সারা জীবনের পাথেয়।
বয়:সন্ধিকালে, ১২-১৩ বছর মহিলার শরীরে গড়পড়তা তিন লক্ষ এগ থাকে। সে মহিলা যত লম্বাই হোন বা যত ভালই খাওয়া-দাওয়া করুন অথবা যতই এক্সারসাইজ করুন, তার ওভারি থেকে আর বাড়তি কোনো এগ সারা জীবনেও বেড়বে না। মানুষ ভূমিষ্ঠ হওয়ার পরে আর কোনো নতুন এগের অধিকারিনী হতে পারেন না।
পিরিয়ডের সাইকেলে প্রতি মাসে একটি করে এগ খরচ হয়, গড়পড়তা একজন মহিলা তার সারা জীবনে ৫০০টির মতো এগ ওভারি থেকে নিঃসরণ করেন।
বাকি এগ ওভারির মধ্যেই শুকিয়ে যায়। এরই মধ্যে একটি বা দু’টি এগ, স্পার্মের সঙ্গে মিশে তৈরি করে নতুন প্রজন্ম। নতুন প্রাণ।
এই ডিমগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করে, নানা ধরনের ফিমেল হরমোন। এর মধ্যে ইস্ট্রোজেন এবং প্রোজেস্টেরন দু’টো উল্লেখযোগ্য হরমোন। মেনোপজের ঠিক আগে এই এগগুলো নিঃশেষিত হয়ে যায়। তারফলে, ওভারি থেকে এগ নিঃসরণ যায় ফুরিয়ে।
সেই এগগুলোকে রক্ষণাবেক্ষণ করার জন্য, যে হরমোন বা ইস্ট্রোজেন মহিলারা তৈরি করতেন তারও প্রয়োজন যায় ফুরিয়ে।
সুতরাং, এগ এবং ইস্ট্রোজেন এই দু’টোই শেষ হয়ে যায়, মেনোপজের ঠিক আগে। ফলে আর কোন পিরিয়ড হয় না। শুরু হয় মেনোপজ। কিন্তু, এইতো গেল ন্যাচারাল মেনোপজের হিস্ট্রি।
অন্য কারণেও মেনোপজ হয়?
প্রাকৃতিক মেনপজ ছাড়াও, নানারকম কারণে মেনোপজ হতে পারে। যেমন ধরুন, কিছু সময় কারোর ওভারিতে টিউমার বা অন্য কোনো কারণে, অপারেশন করে ওভারি বাদ দিতে হলে, তার হয় মেনোপজ। তার নাম সার্জিক্যাল মেনোপজ।
কিছু কিছু মহিলার ক্ষেত্রে তাদের জেনেটিক কারণে, স্মোকিং বা এই ধরনের পারিপার্শ্বিক কিছু কেমিক্যালের প্রভাবে হয়, মেনোপজ। কিছু ক্ষেত্রে ক্যান্সারের ট্রিটমেন্টে যদি ওভারির ওপর কোনো রেডিয়েশন পড়ে বা কেমোথেরাপি চলে, তাহলেও চলে আসতে পারে মেনোপজ।
কারণ, এগুলোর ক্ষেত্রে অনেক সময় শরীরের সঞ্চিত এগ বা ডিম নষ্ট হয়ে যায়।
কখন মেনোপজ আশীর্বাদসম?
এতক্ষণ পড়ে যদি আপনার মনে হয় যে, মেনোপজটা সত্যিই খারাপ বা খুব দুঃখজনক ব্যাপার, তাহলে জেনে রাখুন, কিছু মহিলারা আছেন যারা মেনোপজের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করে থাকেন। কতবার ডাক্তার বাবুর কাছে এসে তারা বলেন,
-ডাক্তারবাবু মেনোপজ কবে আসবে! আর যে পারছি না!
এই ধরনের মহিলারা সাধারণত বিভিন্ন নন ক্যান্সার কারণে ভোগেন। যেমন ধরুন, এন্ড্রোমেট্রিওসিস। অসম্ভব পেটে ব্যথা। পিরিয়ডের দিনগুলো যেন তার কাছে ভয়াবহ অভিশপ্ত দিন। যাদের ফাইব্রয়েডের সমস্যা রয়েছে, পিরিয়ডের সমস্যা রয়েছে বা যাদের পিরিয়ডের কারণে প্রোজেস্টেরন মুড সুইং তৈরি করে (প্রি-মেন্সট্রুয়াল সিনড্রোম)।
এরাও অপেক্ষা করে থাকেন, কবে তাদের মেনোপজ আসবে।
আরও কিছু কিছু জটিল সমস্যায় তো ওষুধপত্র এবং অপারেশন করে, মেনোপজকে কৃত্রিমভাবে এগিয়ে নিয়ে আসা হয় আরও আগে। যাতে সেই মহিলার প্রাণ রক্ষা পায়। কিছু কিছু ব্রেস্ট ক্যান্সারের ক্ষেত্রে এবং হরমোন নির্ভরশীল ক্যান্সারের ক্ষেত্রে ওষুধ পত্র দিয়ে আগেই মেনোপজ তৈরি করে দেওয়া হয়, যাতে সেই মহিলার ভবিষ্যৎ থাকে আরও সুরক্ষিত।
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Menopause Period FSH After 40 Endometriosis HRT Menopause Estrogen Therapy Lactobacillus Vaginal Dryness Hormone





