সুন্দরবনের বাঘ নাকি বহুরূপী
মেডিকেল সাইন্সে বায়োপ্সি বলে যে মাইক্রোস্কোপ টেস্ট আছে, তার রিপোর্টের গুরুত্ব অপরিসীম। কিন্তু এই নির্ভুল রিপোর্ট লিখতে প্যাথলজিস্টের কেন কালঘাম ছোটে? সেই বায়প্সির অন্দরমহলের কাহিনী
— প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে ওঠে কৈফিয়ত চাইলাম - এই তো কয়েক বর্গকিলোমিটার জঙ্গল তার মধ্যে বাঘ গোণা যায় না- সেও কি সম্ভব ?
— ----
— বউমা এদিকে দুটো চিনি ছাড়া চা। দাদা আপনি এখানে বসুন।
আপনারও হাতে যদি এক কাপ চা থাকে তাহলে কাপ নিয়ে বসে পড়ুন ।
দুদিন আগে সুন্দরবনে বেড়াতে গিয়ে আসল মধু খুঁজতে গিয়ে বেফাঁস কথা বলে ফেলেছি। হোটেলের পাশে স্থানীয় বাজারে শ্বশুর আর বউমার। শ্বশুরের নাম জগা। জগন্নাথ। সুপার স্পেশালাইসড দোকান। শুধু মধু। আর হ্যাঁ সন্ধ্যায় একটু চা।
ভোর থেকেই বেরিয়ে পড়েছি লঞ্চে। এই শুনলাম এখানে ডোরাকাটা দেখা যাচ্ছে, ঝোপ নড়ছে, ওদিকে বাঁদর ডাকছে, হঠাৎ পাখি উড়ে গেল। এই বুঝি বাঘ দেখা গেল। সারাদিন লঞ্চে লঞ্চে ঘুরে জল, বন আর পাখি ছাড়া কিছু না দেখতে পেয়ে 'অরিজিনাল' মধু খুঁজতে সন্ধ্যার অন্ধকারে লোকাল বাজারে উপস্থিত আমি। সেখানেই জগন্নাথ বাবুর সাথে গল্প হচ্ছিল।
শুনলাম বাঘের নানা রকম গল্প । তার মধ্যে কিছু কিছু রূপকথা আর কিছু সত্যি সত্যি বাস্তব জীবনের কাহিনী। আমরা কেউই বাঘ জানি না তাই সন্ধ্যার গ্রামের বাজারে এইসব কাহিনীও রূপকথা বলে মনে হচ্ছিল ।
শুনলাম সুন্দরবনের বাঘ নাকি বহুরূপী। বনে বাঘ-শুমারি একটা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। বাঘ সংখ্যার উপর ভিত্তি করেই বনে সরকারি অনুদান আসে। আগে বাঘের পদচিহ্নের উপর ভিত্তি করে বাঘের সংখ্যা হিসেব করা হতো।
কিন্তু সে নিয়ম সুন্দরবনে অসুন্দর। পৃথিবীর একমাত্র ম্যানগ্রোভ ফরেস্ট জোয়ার ভাঁটার জলে সব সময় কাদা। তাই একই বাঘের দু'রকম তিন রকম পদচিহ্ন সুন্দরবনের পাওয়াটা অস্বাভাবিক কিছু নয়। অল্প কাদায় পায়ের ছাপ বড় আর গভীর কাদায়, একই বাঘের পায়ের ছাপের আকার ছোট হয় । মনে হতে পারে তারা আলাদা বাঘ ।
কাদার ছাপের উপর ভিত্তি করে কোন বাঘের নাম হতে পারে নান্টু , আবার অন্য কাদায় সেই একই বাঘের নাম মন্টু আবার একটু শুকনো জমিতে সেই নান্টু কে মনে হতে পারে ঝন্টু।
বউমার তৈরি করা চায়ে চুমুক দিয়ে , ডান পায়ের ধুতি টা টেনে, পা মুড়ে, জগন্নাথের গল্প চলে।
— ফরেস্ট ডিপার্টমেন্টের লোকেদের মাথা খারাপ হওয়ার উপক্রম। ইদানিংকালে ক্যামেরা নিয়ে বাঘ গণনা চলছে। কিন্তু বিপদ তাতেও, তার কারণ এই বাঘেরা অত্যন্ত ধূর্ত। ফটোয় পোজ দিতে নারাজ তিনি । মানুষখেকো বাঘ মানুষ থেকেও বুদ্ধিমান।
জগন্নাথ না বললেও আমি ভালোই জানি, বাংলাদেশের সুন্দরবনের মধ্যে বাঘের ছবি দেখার জন্য প্রথম যে ডকুমেন্টারি ফিল্ম হয় সেই ফিল্মি ক্যামেরাম্যানদের যে কত বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হতে হয়েছিল, সে গল্প এখন ডকুমেন্টারি জগতের প্রবাদ।
সুন্দরবন নিয়ে গর্বিত জগার বউমা এবার চলে আসে, মধুর বোতলটা আমার হাতে তুলে দিতে দিতে বলে,
— আমরা বেশ জানি, যেটুকু বাঘ সংখ্যা ক্যামেরা ধরতে পারে তার থেকেও অনেক বেশি বাঘ আছে সুন্দরবনে, কিন্তু সেই বাঘ ধরাছোঁয়ার বাইরে। বন দপ্তরের কর্তাদের নিশ্চয়ই মনে হয় যে বাঘ যদি হাতে একটা ফ্ল্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকতো, গোপালদের ক্লাস টু এর রোল কলের মত বলত ইয়েস স্যার, তাহলে জীবনটা অনেক সোজা হয়ে যেত।
অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে কৈফিয়ত চাইলাম - এই তো কয়েক বর্গকিলোমিটার জঙ্গল তার মধ্যে বাঘ গোণা যায় না- সেও কি সম্ভব ?
খিলখিল করে হেসে বৌমা বলে, বুঝুন কাণ্ড! বাঘ গোনাকি হাতের মোয়া? গোপালও ত বোঝে এগুলো। ও বাবা, ওনাকে বোঝাও। আমি বাড়ি যাই , সকালে আবার গোপালের বাবা বেরোবে।
জগার হাতে আমাকে রেখে চলে যায় বউমা।
আমার মতো আনাড়ি শহুরে মানুষের বনে গিয়ে বাঘ দেখাটাই আসল উদ্দেশ্য । সে বাঘ আমরা সুন্দরবনের জঙ্গলে দেখতে পাই নি বটে, কিন্তু বাঘের গল্প শুনেছি অনেক।
ছাপোষা গ্রামের মানুষের মুখে বাঘ দেখা বা না দেখার রকমারি গল্প শুনতে শুনতে আমার মনে হচ্ছিল মেডিক্যাল সাইন্সে এই দেখা, বা না দেখার মধ্যবর্তী সেই ধূসর অঞ্চলের কথা !
আমারই মতো অসহিষ্ণুতায় কেউ আমাকে যদি উলটে জিজ্ঞাসা করেন - মশাই মানুষের শরীর তো এইটুকু একটা জায়গা তার মধ্যে একটা অসুখ গোনা যাচ্ছেনা , কিছু ক্ষেত্রে সঠিক অসুখ নির্ণয় করতে দিনের পর দিন সময় লাগছে - ২০২২ এ তাও হয় ? যত আজগুবি গপ্প!
অসুখের মহিষাসুর কখনও সিংহ, কখনও হাতি আবার কখনও মোষ। ব্যাকরণ না মেনে তৈরি হয় হাঁসজারু, বা হাতিমি। সে যে হাতি না তিমি বোঝাই দায়।
বিজ্ঞানীদের ব্যাকরণ মানতে অসুখের বয়েই গেছে।
যে সংজ্ঞায় নান্টু হয়ে যায় মন্টু বা ঝন্টু - অনেকটা ওই রকম ভাবেই অনেক অসুখ বহুরূপে আমাদের সামনে এসে হাজির হয়, যার চুলচেরা বিশ্লেষণ করতে চিকিৎসকদের কালঘাম ছুটে যায়।
বিজ্ঞানে অনেক টেস্টের রেজাল্ট কখনো এটা, কখনো ওটা। যে হিমোগ্লোবিন 10.5 সেটা যে সত্যি সত্যিই 10.5 কিনা সেই নিয়ে যথেষ্ট তর্কবিতর্কের অবকাশ রয়েছে। শরীর খুব শুকনো থাকলে রক্ত ঘন হবে হিমোগ্লোবিনও মিথ্যে বাড়বে ! আর অনেক জল খেয়ে বা একটু বেশি স্যালাইন চলার সময় টেস্ট করলে ঠিক হিমোগ্লোবিনও অঙ্কের হিসেবে খানিকটা কম দেখাবে।
বড় বড় স্ক্যান, যেমন আল্ট্রাসাউন্ড, সিটি, এম আর আই বা পেট সিটি এই ধরনের অনেক স্ক্যানের রিপোর্ট সব সময় নির্ভুল হবে এরকম কোন গ্যারান্টি নেই। শরীরের অঙ্গের ছায়া নিয়ে পড়াশোনা করে রিপোর্ট হয় এদের।
বাঘ ঠিক দেখা না হলে যেমন গোনা যায় না, তেমনই একটা বিশেষ টেস্ট না হলে অনেক অসুখের সুনির্দিষ্ট ডায়াগনোসিস হয় না। কি সেই টেস্ট?
মেডিকেল সাইন্সে বায়োপ্সি বলে যে মাইক্রোস্কোপ টেস্ট আছে, তার রিপোর্টের গুরুত্ব অপরিসীম। ঠিক যেন সুপ্রিম কোর্ট । কিন্তু এই নির্ভুল রিপোর্ট লিখতে প্যাথলজিস্টের কেন কালঘাম ছোটে?
ক্যান্সার কে নন-ক্যান্সার আর নন- ক্যান্সার কে ক্যান্সার বলে প্রকৃতি কি মাইক্রোস্কোপের নিচে ফাঁদ পেতে রাখতে পারে ? কতটা নির্ভুল বায়োপ্সি রিপোর্ট?
প্যাথলজিস্টরা মাইক্রোস্কোপের তলায় কিই বা দেখেন? তাঁদের রিপোর্টের ওপর ভিত্তি করেই তো দেওয়া হয় ওষুধ, করা হয় ক্যান্সারের সার্জারিও।
বায়োপ্সি পদ্ধতি নিয়ে স্পষ্ট ধারনা নেই অনেকেরই। MBBS এর থার্ড ইয়ারে পড়তে হয় প্যাথলজি। কিন্তু প্যাথলজির অন্দরমহলের দোলাচল নিয়ে ধারনা পেতে আমার নিজেরই আরও দু দশক সময় লেগেছে।
এই বায়োপ্সি রিপোর্ট যাঁরা করেন সেই রকম এক স্বনামধন্য প্যাথলজিস্টকে নিয়ে আমরা কিছু আউট অফ সিলেবাস আড্ডা দিয়েছি ।
অভীকদার রান্নাঘরের খিচুড়ি আর সংস্কৃত উচ্চারণের জুড়ি মেলা ভার। নটিংহ্যাম ইউনিভার্সিটির স্বনামধন্য শিক্ষক অভীকদা, চিকিৎসা বিজ্ঞানকে সাধারণ মানুষের বোঝার মত করে BBC স্টুডিওতে উপস্থাপন করেছেন বেশ কয়েকবার।
সেই অমায়িক অভীকদা আজ আমাদের অনুরোধে আমার কম্পিউটারের বৈঠকখানায়। যেখানে কথা বলতে হলে কৈফিয়তের ঠেলায় মুখ বন্ধ হয় না । উনি আর আমি আজ ডাক্তারের খোলস ছেড়ে শুধু মানুষ । রইলো আপনার আর আমার এই মনুষ্য শরীর নিয়ে অজানা কিছু বাস্তব কথা।
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search keywords: Avik Abhik Mukherjee Pathology Pathologist Biopsy Data







