মেজর সার্জারির আগের প্রস্তুতি
এই নিয়ে যে খুব সচেতনতা আছে তা নয়। ইংরিজিতে বলে প্রি-হ্যাবিলিটেশন। আপনি সার্জারির পরে আরও তাড়াতাড়ি সুস্থ হবেন। এবং নিজের নরমাল লাইফে ফিরে আসতে পারবেন। হাসপাতালের বিল কম হবে।
এখানে রইলো এই টপিকের বাংলা ভার্সন
For the English Version of this topic click here
একটা মেজর সার্জারির আগে কী কী করবেন?
যখন আপনি কোনো বড় সার্জারি বা চিকিৎসার মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তার আগে অনেক কিছু করার থাকে। এগুলো ঠিকমতো করলে সার্জারির পর আপনার শরীর ও মন দুটোই দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবে। এর ডাক্তারি নাম প্রি-হ্যাবিলিটেশন।
কেন আগে থেকে প্রস্তুতি নিতে হবে?
শুনতে অবাক লাগলেও, একটা মেজর সার্জারি অনেকটা ম্যারাথন দৌড়ের মত। যার জন্য প্রস্তুতি এবং ট্রেনিং দু’টোই দরকার (এই নিয়ে ২০১৭-তে দ্য ব্রিটিশ মেডিকাল জার্নালে বিশদ লেখা বের হয়, যে প্রস্তুতি কত দরকারি)। ইমার্জেন্সি সার্জারির ক্ষেত্রে প্রস্তুতির সুযোগ থাকে না, কিন্তু যে সার্জারিতে সময় পাওয়া যায়, সেই সময়টুকু আশীর্বাদস্বরূপ।
একটা মেজর সার্জারির পর সেরে ওঠার সময়, শরীর নানা রকম ধকলের মধ্য দিয়ে যায়। এই জন্যই সেরে উঠতে বেশ খানিকটা সময় প্ল্যান করে রাখা দরকার।
ক্ষেত্র বিশেষে কিছু পেশেন্টের সার্জারির আগে, কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপি নেওয়ার দরকার হয়। এই ধরনের থেরাপিগুলোও ভবিষ্যৎ সার্জারির উপরে কিছু প্রভাব ফেলে।
আপনাকে কী কী প্রস্তুতি নিতে হবে তাই ভাবছেন তো?
এই যেমন ধরুন, হালকা ব্যায়াম, শ্বাসের ব্যায়াম এবং পুষ্টিকর খাবার খাওয়া, যেটা আপনাকে ফিট করবে সার্জারির আগে।
এর ফলে কী হবে?
আপনি সার্জারির পরে আরও তাড়াতাড়ি সুস্থ হবেন। নিজের নর্মাল লাইফে তাড়াতাড়ি ফিরে আসতে পারবেন। এমনকি হাসপাতালের বিলও কম হতে পারে ।
কী কী প্রস্তুতি নিলে আমি তাড়াতাড়ি সুস্থ হব?
প্রি-হ্যাবিলিটেশনের বিষয়টা খুব কঠিন নয়, কিন্তু নিয়ম মেনে কিছু কাজ করতে হবে।
১. এক্সারসাইজ বা ব্যায়াম- শরীরচর্চা হলো প্রি-হ্যাবিলিটেশনের অন্যতম প্রধান অংশ । এটি আপনার মাসল স্ট্রেংথ বা, পেশীর শক্তি এবং ফিজিক্যাল ফিটনেস বাড়াতে সাহায্য করে।
২. পুষ্টিকর খাবার- প্রোটিন-যুক্ত খাবার খাওয়া অত্যন্ত জরুরি । প্রোটিন শরীরের ইঁট-কংক্রিটের মতো কাজ করে, যা সেরে ওঠার জন্য অপরিহার্য।
৩. মানসিক প্রস্তুতি- অপারেশন ঠিক হওয়ার পর, কিছু প্রয়োজনীয় টেস্ট করতে বেশ কয়েকদিন সময় চলে যায়। আবার কখনও কখনও ডাক্তারের সঙ্গে কথা বলে কোন হাসপাতালে অপারেশন হবে, আর কবে হবে, সেটা জানতে জানতে আরও দু-তিন দিন সময় কেটে যায়। মাঝখানের এই সময়টা কাজে লাগান। মাধ্যমিকের আগে যেমন ছাত্রছাত্রীরা শেষ তিন মাস জোর দিয়ে পড়াশোনা করে, ঠিক তেমনই এই সময়টা আপনার স্বাস্থ্যের প্রস্তুতির জন্য গুরুত্বপূর্ণ।
এবার প্রশ্ন করতেই পারেন, এই যে এত প্রস্তুতি নেব এর উপকারিতা কী?
গবেষণায় দেখা গেছে, সার্জারির আগের সপ্তাহগুলোতে নিয়ম মেনে এক্সারসাইজ করলে সেরে ওঠার প্রক্রিয়া অনেক দ্রুত হয় । অনেক সময় শারীরিক অসুস্থতার কারণে ও সার্জারির টেনশনে খিদে কমে যায়, শরীর দুর্বল হয়ে পড়ে। প্রি-হ্যাবিলিটেশন এই দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে এবং শারীরিক ও মানসিক শক্তি জোগাতে সাহায্য করে ।
ব্যায়ামের নিয়ম
যদি আপনার নিয়মিত ব্যায়ামের অভ্যাস না থাকে, তবে হুট করে খুব বেশি এক্সারসাইজ শুরু করবেন না।
ধীরে ধীরে সময় বাড়ান। প্রথম দিন ১০ মিনিট করলে, কয়েক দিন পর সেটা ১৫ মিনিট করুন।
যদি ভারী ব্যায়াম করতে না পারেন, তবে সমতল জায়গায় অন্তত ১২-১৫ মিনিট হাঁটুন। টানা হাঁটাটা জরুরি, বারবার থেমে থেমে হাঁটার চেয়ে একনাগাড়ে হাঁটা বেশি উপকারী ।
শ্বাসকষ্ট বা অন্য কোনো সমস্যা মনে হলে অবশ্যই ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
কখনোই ভাববেন না যে এগুলো শুধু সার্জারি থেকে সুস্থ হওয়ার জন্যই আপনি করছেন, এই বিদ্যেগুলো সারা জীবন আপনাকে অন্য সবার থেকে আলাদা করে তুলবে। এমনকি আপনার পরিবারের কাছেও, একজন রোল মডেল হয়ে উঠবেন আপনি।
এই আলোচনার পরে আমার কী কী করা উচিত?
এই আলোচনা চলার সময় একদম নির্দ্বিধায় মনে যা আছে আমাদের জিজ্ঞাসা করুন। আমরা বলে দেব, কীভাবে আপনি নিজের এক্সারসাইজ প্ল্যান করবেন, নিজেকে ফিট রাখার জন্য।
বলে দেব কী খেলে নিজের ডায়েট আরও ইমপ্রুভ করা যায়। গড়পড়তা ভারতীয়ের ডায়েটে প্রোটিন কম থাকে। আগেই বলেছি, প্রোটিন মানুষের শরীরের ইঁট-কংক্রিটের মতো। প্রোটিন ছাড়া শরীরের সেরে ওঠা কল্পনাও করা যায় না। প্রোটিন- ডায়েটের প্রধান অংশ হবে। তারপর আপনার আর যা ইচ্ছে।
যদি স্মোক করা বা অ্যালকোহল নেওয়া আপনার অভ্যাস হয়ে থাকে, সেটা সার্জারির আগে বন্ধ করে দেওয়া দরকার। স্মোকিং আর অ্যালকোহলের মধ্যে সার্জারি করলে কমপ্লিকেশনের মাত্রা বাড়ে। হাসপাতালের বিলও বাড়তে পারে। তাই চট করে নিজেকে পাল্টে ফেলুন।
যদি আপনার কোনো প্র্যাকটিক্যাল পরামর্শ বা মানসিক (ইমোশনাল) সাপোর্ট লাগে, আমাদেরকে জানান। অনেকেরই প্রয়োজন হয় এটা।
আরও কিছু জানতে চাইলে নির্দ্বিধায় জিজ্ঞেস করুন। আমরা বলে দেব যে কোন কোন সার্জারির আগে আপনার কী কী করা উচিত।
কিছু জরুরি দরকারি পদক্ষেপ
1, ➤ অপারেশনের আগে হাত ও পায়ের নখ ছোট ছোট করে কেটে নেওয়া দরকার। লম্বা নখের নিচে লুকিয়ে থাকা জীবাণু ইনফেকশনের ঝুঁকি বাড়ায় ।
2, ➤ হাসপাতালে ভর্তির আগে, নেলপলিশ, নেল ভার্নিশ বা যদি আর্টিফিশিয়াল নখ তুলে ফেলুন। তার কারণ, আঙুলে লাগানো পালস অক্সিমিটার যন্ত্র দিয়ে রক্তে অক্সিজেনের মাত্রা মাপা হয়। নেলপলিশ থাকলে এতে ভুল রিডিং আসতে পারে।
3, ➤ নিয়মিত সাবান দিয়ে স্নান করুন। বিশেষ করে নাভি বা বেলী-বাটন পরিষ্কার রাখুন। অনেক সময় নাভিতে ময়লা জমে ‘আম্বলিথ’ (একধরণের শক্ত ময়লার দলা) তৈরি হয়। নাভির আশেপাশে অপারেশন হলে, সার্জনরা সেই আম্বলিথ বার করে দেবেন। কিন্তু অপারেশনের আগেই এই জমে থাকা অংশগুলো বার করে নাভি পরিষ্কার থাকলে, অপারেশনের সময় ইনফেকশনের সম্ভাবনা অনেকাংশ কমে যায়।
4, ➤ দিনে অন্তত তিনবার শ্বাসের ব্যায়াম করুন। অনেক সময় হাসপাতাল থেকে আপনাকে ইন্সেন্টিভ স্পাইরোমিটার বলে, একটা ছোট শ্বাসের যন্ত্র দিয়ে দেওয়া হয়। যার ভেতর দিয়ে শ্বাস নিলে, কিছু বল লাফিয়ে লাফিয়ে ওঠে নামে। এটি ফুসফুসের কার্যক্ষমতা বাড়াতে এবং অপারেশনের পর নিউমোনিয়া বা ফুসফুসের সংক্রমণ ঠেকাতে দারুণ কার্যকর ।
যন্ত্র না থাকলে চেয়ারে বসে হাত দু’টো টেবিলের উপর রেখে গভীর শ্বাস নিন। সেই শ্বাস যতক্ষণ সম্ভব ধরে রাখার চেষ্টা করুন এবং তারপর ধীরে ধীরে শ্বাস ছেড়ে দিন। এটিও খুব উপকারী ।
এরকম সকালে ১০ বার দুপুরে ১০ বার রাতে ১০ বার করে করার চেষ্টা করুন। গড়পড়্তা মানুষের ফুসফুসের নিচের বেশ খানিকটা অংশ কাজ করে না। চুপসে থাকে। এই ধরনের ব্যায়াম করলে, আস্তে আস্তে সেই সব জায়গা গুলো খুলতে থাকে। অপারেশনের সময় আপনার শরীর এতে বাড়তি অক্সিজেন পায়।
অপারেশনের দ্বিতীয়, তৃতীয় দিনের ফুসফুস সংক্রমণ থেকেও, আপনাকে রক্ষা করে। এতে অপারেশনের পর আপনার সেরে ওঠার প্রক্রিয়া আরও ত্বরান্বিত হয়।
যদি ইন্সেন্টিভ স্পাইরোমেট্রি কিনতে চান তাহলে, আপনার কাছের কোনো ভালো ওষুধের দোকানে পেয়ে যাবেন। আমার প্রেসক্রিপশনের মধ্যে কীভাবে ইনসেনটিভ স্পাইরোমেট্রিক করতে হয় আর ফিজিওথেরাপির কাছ থেকে, এই ধরনের স্কিল শিখতে হয় সেগুলোর খোঁজ দেওয়া থাকে। যদি না বুঝতে পারেন তাহলে, জিজ্ঞাসা করে নিন।
5, ➤ অপারেশনের আশেপাশের সময় পুষ্টি এক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার। পেটের অপারেশনের পরে যতক্ষণ না গ্যাস (ডাক্তারি ভাষায় পাদকর্মকে ফ্ল্যাটাস বলা হয়) পাস হচ্ছে, ততদিন পর্যন্ত মুখে খাবার দেওয়া অনেক সময়, বারণ করা থাকে। খুব তাড়াতাড়ি বড় খাবার শুরু করে দিলে, বমি হবার সম্ভাবনা থাকে।
আমরা কলকাতা এবং তার উপকণ্ঠের ওষুধের দোকানে দাঁড়িয়ে খোঁজ করে দেখেছি, ভারতবর্ষে হুবহু এই ধরনের পুষ্টিযুক্ত ড্রিংক পাওয়া যায় না। তবুও, হুবহু না হলেও একটি নির্দিষ্ট নিউট্রিশন পাউডারের মধ্যে এর কাছাকাছি পরিমাণে এনার্জি, ক্যালরি এবং প্রোটিন পাওয়া যায় (আমরা নীতিগত ভাবে কোনো নির্দিষ্ট কোম্পানির নির্দিষ্ট প্রোডাক্ট সুপারিশ করার বিরুদ্ধে, তবে আপনি একান্তই জানতে চাইলে আমরা প্রশ্নের উত্তর দিতে পারি)। কী কারণে ভারতের অন্য কোম্পানিগুলো এই ড্রিংক বানায় না, তা আমার বোঝার বাইরে।
অপারেশনের দু-তিন দিন আগের থেকে প্যাকেটের গায়ের নির্দেশাবলী অনুযায়ী, দৈনিক দু’বার এই ড্রিংক আপনি খেতে পারেন। এই প্যাকেটটি হাসপাতালেও নিয়ে আসুন, যাতে অপারেশনের আগের দিন আপনি এই বাড়তি পুষ্টি সংগ্রহ করে নিতে পারেন। হাসপাতালের ফার্মাসিতে এই ড্রিঙ্ক নাও পাওয়া যেতে পারে।
আমি যদি এই সার্জারির আগে এসব না করি তবে, আমার শরীরের ওপর কী কোনো এফেক্ট পড়বে?
যদি আপনি এসব না মানেন, আপনার সার্জারি ক্যানসেল বা দেরি করে হবে এমন হয়তো নয়। কিন্তু এই ছোট ছোট লাইফ চেঞ্জিং অভ্যাসগুলো, শরীরে অনেক বড় রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি করে।
যদি আপনি প্রত্যেকটি অ্যাডভাইস ফলো করতে পারেন, আপনি নিজেই দেখতে পারবেন কয়েক মাস বাদে নিজের প্রশংসনীয় পরিবর্তন হচ্ছে।
6. ➤ হার্ট বা অন্য কোনো সমস্যার জন্য অ্যাসপিরিন বা ক্লোপিডগ্রেল টাইপের ওষুধ (যা রক্তকে আরও তরল করে রাখে) খেলে অবশ্যই ডাক্তারবাবুকে জানান। সার্জারির দিন ৫-৭ আগে থেকে, এসব ওষুধ বন্ধ করার দরকার হতে পারে। কারণ, এই ওষুধের মধ্যে সার্জারি করলে রক্তক্ষরণ বেশী হতে পারে।
কোন কারণে সার্জারি পিছিয়ে গেছে?
সার্জারি যদি কোনো কারণে পিছিয়ে যায়, তবে মন খারাপ করবেন না। ভাবুন, নিজেকে আরও ফিট করার জন্য আপনি বাড়তি কিছুটা সময় পেলেন। এই ছোট ছোট অভ্যাসগুলো কেবল সার্জারির জন্যই নয়, সারা জীবনের জন্যই আপনাকে সুস্থ থাকতে সাহায্য করবে।
কোনো প্রশ্ন বা পরামর্শের প্রয়োজন হলে আমাদের জানাতে দ্বিধা করবেন না।
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Prehabilitation Major Surgery Chemotherapy Radiotherapy Protein Diet Spirometry Walking








