চিনি-কে চেনেন?
কিন্তু তাহলে এত কিছুর পরেও এত চিনি চারদিকে। কেউ কিছু বলেই না! কেউ কিছু করেই না। হায়রে ! কিন্তু কেনই বা বলবে? চিনি সস্তা, চিনি খেতে ভালো, চিনি বিক্রি হয়। চিনির নেশায় কি আপনি আক্রান্ত ?
যে দেশে ভালোবাসার নাম ‘আর চাট্টে ভাত দি?’ আর উৎসবের নাম ‘মিষ্টিমুখ’, সে দেশে মিষ্টি নিয়ে এত তেতো কথা কি ভালো লাগার কথা? কিন্তু সত্যি কি আর এড়িয়ে বাঁচা যায়? এখন ঠারে ঠোরে বোঝা যাচ্ছে যে, ‘চিনি’ ব্যাপারটা মদের থেকে কিছুমাত্র কম খতরনাক নয়।
চিনির নেশায় আপনিও কি আক্রান্ত? একটা ছোট্ট টেস্ট আছে, বলবো একটু বাদেই।
বিজ্ঞানীরা এখন বলছেন, মদ খেলে যে সমস্ত অসুখ-বিসুখ হতে পারে, তার বারোটার মধ্যে আটখানাই হতে পারে চিনি খেলে। কী কান্ড বলুন দেখি! এমন অলক্ষুণে কথা কেউ বলেছে কখনও? কিন্তু দেখা যাচ্ছে, লাখ লাখ ভারতীয় চিনির নেশায় আসক্ত হয়ে পড়ছেন। এই রহস্যে এমএলএ, এমপি-রা কীভাবে জড়িত? টাইমস অফ ইন্ডিয়া-র রিপোর্টও দেখবো আমরা। চিনি আবিষ্কার কোন দেশে হয়েছিল জানেন কি? আসলে প্রকৃতি যাকে করে রেখেছিল দুর্লভ, আমরা তাকে করেছি সুলভ।
প্রকৃতি যে সম্পদকে নিজের কোটরে গোপন করে রেখেছিল, মৌমাছি দিয়ে পাহারা দিয়ে রেখেছিল, তার ঝাঁপি খুলে আমরা আর সামলাতে পারছি না, মরছি তারই প্রতিক্রিয়ায়। কুড়ুল আপনার, পা-ও আপনার। আপনি নিজেকে নিয়ে কী করবেন, তার সিদ্ধান্ত একান্তই আপনার। কেবল দয়া করে দেশের ক্ষতিটি করবেন না। পারলে নিজের পরিবারকেও রক্ষা করুন।
বিশদে জানতে চান?
অনেক সময় আমরা ভেবে ফেলি যে সব সমস্যার কারণ বোধহয় শরীরের মেদ ! কিন্তু আদতে আমরা রায়বাবু একটু মোটাসোটা বলে ওনার ডায়াবেটিস, হাই ব্লাড প্রেসার এর বেশ গ্রহণযোগ্য উত্তর আমরা মনে মনে সাজিয়ে নিই। ওদিকে ওপাড়ার চাকলাদার বাবু, যিনি কিনা নিজের সূক্ষতার কারণে, বন্ধুমহলে সরুচাকলি বলে খ্যাত, তাঁর ডায়াবেটিস হওয়ার পিছনে আপনি কী কী কারণ সাজাবেন শুনি?
গত ৫০ বছরের খতিয়ান নিয়ে দেখা যায়, সারা পৃথিবীতে চিনির মাত্রাতিরিক্ত ব্যবহার বেড়েছে প্রায় তিন গুণ! আর সাথে পাল্লা দিয়ে লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ছে ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেশার ইত্যাদি।
ইউনাইটেড নেশনসের মতো সংস্থা মারণ রোগের কারণ হিসেবে তিনটে ‘গোদা গোদা’ কারণ আবিষ্কার করেছেন: তামাক, মদ এবং... প্লিজ আশ্চর্য হবেন না, তৃতীয় অপরাধী হলো অতিরিক্ত খাবার-দাবার এবং চিনি। এই তিনটের মধ্যে দুটো, তামাক এবং মদ, আজকাল পৃথিবীর বেশিরভাগ দেশেই সরকার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। মানে, ইচ্ছামত সেটা কেনা যায় না, বা ক্রেতার বয়সের বিধিনিষেধ রয়েছে।
অথচ তৃতীয় অপরাধী বা ‘অতিরিক্ত চিনি’ সমস্ত বিধিনিষেধের রক্তচক্ষুকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে সগর্বে ঘুরে বেড়াচ্ছে। শুধু তাই না, মিষ্টি, কেক, শীর খুরমা ছাড়া আমাদের উৎসব, পুজো, ঈদ, ক্রিসমাস সবই অপূর্ণ মনে হয়।
অথচ এখন সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত, অতিরিক্ত মিষ্টিজাতীয় খাবার ডায়াবিটিস এবং ক্যান্সারের মতো মারণ রোগ সৃষ্টি করতে পারে। আবার এটাও প্রমাণিত, ক্ষতির দিক থেকে চিনি আর মদের খুব বেশী তফাৎ নেই।
WHO খুব কড়া নিয়ম করেছে যে, বাচ্চা থেকে বুড়ো সব্বার চিনি খাওয়ার অভ্যাসে আমূল পরিবর্তন দরকার। আমাদের দৈনিক খাবারে ২৫ গ্রাম বা ৬ চা চামচের বেশি চিনি খাওয়া উচিত নয়। মনে হচ্ছে না, "এত চিনি তো আমি খাই না?" শুনুন, একটা কোল্ড ড্রিঙ্কস ক্যানে থাকে প্রায় ৯ চা চামচ চিনি। রাস্তার ভাঁড়ের চা বা রসগোল্লার কথা না হয় বাদই দিলাম!
পৃথিবীর অনেক দেশেই এখন চিনিকে বেঁধে ফেলা হচ্ছে নানারকম বিধিনিষেধের মধ্যে। তার উপর ট্যাক্স বসিয়ে বিক্রিবাট্টা কমানোর চেষ্টা চলছে। অতিরিক্ত চিনি যাতে মানুষের পেটে খুব সহজেই না ঢোকে, তার জন্য ঢ্যাঁড়া পিটিয়ে জোরকদমে প্রচারও চলছে।
হ্যাঁ! শুনতে নিশ্চয়ই অবাক লাগছে। দোষ নেই আপনার। এগুলো আমাদের ‘স্বর্গাদপি গরীয়সী’ ভারতবর্ষে হয় না।
তাহলেই চিনিকে তো ভালো করে চিনতেই হয়!
চিনির অষ্টোত্তর শতনাম। নানা গোপন নামে আসেন তিনি। সুগার, গ্লুকোজ, সুক্রোজ, ফ্রুক্টোজ, গ্যালাকটোজ, কর্ন সিরাপ, কত কী নামেই না চিনি লুকিয়ে থাকে খাবারে! যাতে খুব সহজেই আপনাকে দেওয়া যায় ধোঁকা। আপনি লেবেল পড়ে ‘সুগার’ লেখা খাবার বাদ দিয়ে ২০০ টাকা বেশি গচ্ছা দিয়ে খাসা ব্র্যান্ডেড বিস্কুট কিনে নিয়ে এলেন সুপারমার্কেট থেকে। এসে দেখলেন, ও হরি! তাতেও চিনি মজুত, নাম, কর্ন সিরাপ।
ভারতবর্ষ এবং বেশিরভাগ ইউরোপিয়ান দেশের মিষ্টির জোগান আসে আখ থেকে। আর আমেরিকাতে চিনি আসে ভুট্টা বা কর্ন থেকে। নামে আলাদা হলেও তারা একই রকম সুস্বাদু এবং অস্বাস্থ্যকর। ভারতবর্ষে মাথাপিছু বার্ষিক চিনির চাহিদা কুড়ি কেজিরও বেশি এবং এই চাহিদা দিন দিন বেড়েই চলেছে। আন্তর্জাতিক গড়ের তুলনায় ভারতীয়দের চিনির চাহিদা ঢের বেশি।
দিনের পর দিন ঝুলি থেকে যে সমস্ত রিসার্চ পেপারগুলো বের হচ্ছে তাতে জানতে পারছি, চিনি ধীরে ধীরে কাবু করে ফেলছে লিভারের কার্যক্ষমতা এবং হৈহৈ করে নিয়ে আসছে অনেক ক্রনিক ডিজিজ। একটু মিষ্টি মুখ নিশ্চয়ই খারাপ নয়, কিন্তু যখন সেটা নিয়মিত হয়ে যায়, তখন সেটা হয়ে যায় স্লো পয়জনিং।
মশাই এসব বললেই হবে? “বলি বাবা, ঠাকুরদা সবাই ছানার রসগোল্লা খেয়ে মানুষ, আর আমি খেলেই যত আপত্তি? কদু পিসে যখন বেঁচে ছিলেন বিয়েবাড়িতে একাই ৫০টা রসগোল্লা খেতেন। হুহু বাবা বললেই হবে? চিনিতে নেশা! যত্তসব আজগুবি ব্যাপার”।
চলুন একটা পরীক্ষা করে দেখি, আপনার চিনিতে নেশা আছে কিনা। আপনার খাবার-দাবার থেকে চিনি বাদ দিয়ে দিন, বেশি না, মাত্র ৩ দিনের জন্য। শুধু চিনি বাদ নয়, যেসব খাবারের মধ্যে লুকোনো চিনি আছে, বাদ দিন সেগুলোও।
তিন দিন পরে যদি মনে হয়, আপনি কিছুরই অভাব বুঝছেন না, ঠিকঠাক আছেন, তাহলে আপনি পাশ। আর যদি মনে হয়, মনটা চিনি চিনি করছে, না খেলেই কীরকম মেজাজ তিরিক্কি হয়ে যাচ্ছে, কাজে মন বসছে না, পেটটা খালি খাই খাই করছে , তবে হ্যাঁ! আপনিও চিনির নেশায় আক্রান্ত। সিম্পল।
তাহলে চিনির উপরে কেন কোনো ভারতীয় আইন কানুন নেই, সেটা আশ্চর্য! তাই তো?
চলুন একটু দেখেনি বিখ্যাত সোশ্যাল সাইকোলজিস্ট টমাস ব্যাবর কী বলেছেন।
২০০৩ সালে যুগান্তকারী এক বই প্রকাশ করেন তিনি, নাম Alcohol - No Ordinary Commodity। তিনি সেই বইয়ে প্রমাণ করে দেখিয়েছিলেন যে, নেশার চতুর্মুখী ক্ষতিকর প্রভাব থাকলে তার জন্য সরকারি বিধিনিষেধ থাকা একান্ত জরুরি।
চারটি মাপকাঠি হলো,
১. unavoidability: যা এড়িয়ে থাকা শক্ত।
২. toxicity: বা বিষক্রিয়ার সম্ভাবনা।
৩. potential for abuse: যাতে নেশা হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
৪. negative impact on society: যা সমাজের উপরে খারাপ প্রভাব সৃষ্টি করতে পারে।
তামাক বা মদের এই সবকটি গুণ (বা দোষ) আছে। তাই মদের ওপর বিধিনিষেধ আছে। কিন্তু এইগুলো চিনিরও আছে, অথচ চিনির ওপর বিধিনিষেধ নেই। চিনি লাগামছাড়া।
স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলো, ইংল্যান্ড এবং কানাডাতে অবশেষে এতদিন বাদে চিনির উপর ট্যাক্স পরছে। চিনির লাগামছাড়া ব্যবহার খানিকটা হলেও কমাবার জন্য। খাবার তৈরির কোম্পানিগুলোকে বাধ্য করা হচ্ছে, প্যাকেটের ওপর বড় বড় করে চিনির পরিমাণ লিখে দেবার জন্য, ঠিক যেমনটা আমাদের দেশের সিগারেটের প্যাকেটে থাকে। যাতে গ্রাহক নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিতে পারেন। তার থেকে বেশী সরকারের পক্ষে করা সম্ভব নয়।
🔔 Unavoidability বা যা এড়িয়ে থাকা যায় না, এই ব্যাপারটা কী?
মানুষের সভ্যতার ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যাবে, চিনি কেবলমাত্র বছরের একটা নির্দিষ্ট সময়েই হাতে পাওয়ার কথা, যাকে বলা হয় হারভেস্ট সিজন। অথবা চিনি থাকত গাছের উপরে মৌমাছির চাকে মধু হয়ে। আসলে প্রচুর খাবার পেটে গিয়ে নিজেই চিনি হয়ে যায়, তাই আলাদা চিনির দরকার নেই খাবারে।
যেমন ভাত, রুটি, আলু, শাঁকালু, বার্লি সবই পেটে গিয়ে চিনি বা গ্লুকোজ হয়ে যায়। কিন্তু চিনি আবিষ্কার ইস্তক দু’হজার বছর ধরে এর ব্যবহার বেড়েই চলেছে।। ইদানীংকালে, চিনির ব্যবহার চলছে আরও রমরম করে। বেশীরভাগ প্রসেসফুড থেকে প্রাণপ্রিয় আইসক্রিম, চিনি সর্বত্র। ফ্রুট জুস্, কোল্ড ড্রিঙ্কসের চটকদার আবেদনে ভুলে আমরা প্রতিদিন অর্থহীন ৫০০ ক্যালরি চিনি দিয়ে শরীরকে ভরিয়ে ফেলছি, একদম অজান্তে।
🔔 Toxicity বা বিষক্রিয়ার সম্ভাবনা
সায়েন্টিস্টরা বলছেন, চিনি খেলে যে কেবলমাত্র অপ্রয়োজনীয় ক্যালরি শরীরের মধ্যে আসছে তা নয়। এর ফল আরও খারাপ। চিনি খেলে বাড়ছে ব্লাড প্রেশার, কোলেস্টেরলের সমস্যা। ডায়াবেটিসের কথা তো ছেড়েই দিন, চিনির প্রভাবে আমাদের বয়স্ক হবার যে প্রক্রিয়াগুলো, মানে ageing process, অনেক ফাস্ট ফরওয়ার্ড হয়ে যায়। আমরা বুড়িয়ে যাই তাড়াতাড়ি। এটা কিন্তু খুব আশ্চর্য নয়। ভেবে দেখুন, মদ তৈরি হচ্ছে সেই চিনি থেকেই। তাই দুটোর ক্ষতিকর প্রভাব খুব আলাদা নয় বলাই বাহুল্য।
🔔 নেশা হওয়ার প্রবণতা
সিগারেট বা তামাকজাতীয় জিনিস কিংবা মদ খেলে আমাদের মস্তিষ্কের মধ্যে একটা ক্রেভিং তৈরী হয় মাবা প্রবল ইচ্ছা তৈরি হয়। মনে হয় আরও বেশি করে খাই। শেষ পর্যন্ত আমাদের ইচ্ছেগুলো নিয়ন্ত্রিত হয়, তামাক বা অ্যালকোহল দিয়ে।
একইরকমভাবে একটু চিনি খেলে আরও মিষ্টি খেতে ইচ্ছা করে। হয়তো তখন-তখুনি নয়, কিন্তু একটু বাদেই। শেষ পর্যন্ত এই চিনি মস্তিষ্কের বিভিন্ন রকম নিউরোট্রান্সমিটার কেমিক্যাল (যেমন—লেপটিন, ঘ্রেলিন, ডোপামিন)-এর হিসেবনিকেশ পুরো ওলট-পালট করে দিয়ে মস্তিষ্ককে খালি বলতে থাকে—”আরও খাও, পারলে আরও মিষ্টি খাও।”
🔔 সমাজের উপরে ক্ষতিকর প্রভাব
তামাক বা মদ শুধু নিজের নয়, আশেপাশের লোকজনেরও ক্ষতি করে। প্যাসিভ স্মোকিং পাশের জনের ক্ষতি করে, আবার অ্যালকোহল খেয়ে গাড়ি চালালে রাস্তার বাকি সবার বিপদ। যখন কোনো পদার্থ বা সাবস্টেন্স সমাজের ক্ষতি করে, তার ওপর নিয়ন্ত্রণ জরুরি।
আপনি নিজে খেয়ে নিজের ক্ষতি করতে চাইলে, আটকানো বেশ মুশকিল। কিন্তু, নিজে খেয়ে যদি দেশের ক্ষতি করতে চান তবে নিয়ন্ত্রণ দরকার বৈকি।
চিনি এমন একটি জিনিস, মিষ্টির নেশায় মানুষ হচ্ছে মোটা, হচ্ছে অলস, হারাচ্ছে কর্মক্ষমতা, রোগে ভুগে হাসপাতাল বেড আটকে রাখছেন, অর্থনীতি ঝিমিয়ে পড়ছে। আমেরিকার মত দেশে কিছুদিন আগে, ৩ প্রাক্তন Surgeon general আর chairman of the US Joint Chiefs of Staff স্থূলতাকে ঘোষণা করেছেন দেশের সুরক্ষার উপরে এক বিশাল হুমকি হিসেবে।
কিন্তু এত কিছুর পরেও এত চিনি চারদিকে। কেউ কিছু বলেই না, কেউ কিছু করেই না। হায়রে! কিন্তু কেনই বা বলবে? চিনি সস্তা, চিনি খেতে ভালো, চিনি বিক্রি হয়। সুতরাং কোম্পানিগুলোর চিনির বিরুদ্ধে বলার কোনো ইচ্ছেই নেই। কারণ আমি-আপনি সবাই চিনি কিনছি আর মুনাফা তুলছে ওরা।
তাহলে উপায় কী?
বহু সংস্থা এবং সমাজসেবী পরিবর্তনকামীরা সরকারের কাছে আবেদন জানিয়ে চলেছেন চিনির যথেচ্ছ ব্যবহারের বিরুদ্ধে কিছু করার জন্য। মিষ্টির সমস্যা এত গভীর যে, গভর্নমেন্ট রেগুলেশন ছাছাড়া কিছু করা অসম্ভব। কারণ কেউ বিশ্বাসই করতে চাইবে না যে চিনি ক্ষতিকর। এদিকে সরকারের কিছু করা সত্যিই মুশকিল কারণ চিনি সস্তা এবং সাধারণ খাবারের মধ্যে চিনি ব্যবহার কমানো একদমই জনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নয়। হঠাৎ করে ট্যাক্স বসিয়ে চিনির দাম বাড়িয়ে কেই বা জনরোষের শিকার হতে চায়? ভোট বড় বালাই।
তবুও আন্তর্জাতিকভাবে সর্বস্তরে চিনির উপরে বিধিনিষেধ আরোপ করার জোরদার প্রচার চলছে। যেমন ধরুন, কোল্ড ড্রিঙ্কসে চিনি মেশানো কমিয়ে দেওয়া, ফলের রসে চিনি না মিশিয়ে তাকে সত্যি ফলের রসই রাখা। কিন্তু তাতেও মুশকিল। সে ফলের রসের স্বাদ ভালো হয় না, বিক্রিও কমে।
অসুবিধে কী একটা?
এর মধ্যেই আমাদের পেটে গুচ্ছ গুচ্ছ চিনি ঢুকে পড়ছে। রসমলাই, মিষ্টি জমাট দই, তুলতুলে রসগোল্লা, চকলেট, ফ্যাশন-দুরস্ত স্পোর্টস ড্রিংক, নামী কোম্পানির মিল্ক শেক, মায় সকালবেলা কর্নফ্লেক্সের হাত ধরে। বাচ্চার টিফিনে পোড়া রুটির বদলে নামী কেকের স্লাইস দিয়ে আপনি বাচ্চার মন জয় করছেন। কিন্তু মনে রাখুন, তার সাথে কয়েক চামচ ‘দোষ’ও গিলিয়ে বাচ্চাকে করছেন নেশাগ্রস্ত।
আমাদের জিভের মধ্যে পাঁচ ধরণের স্বাদ কোরক রয়েছে। মিষ্টি লবণ টক তেতো আর উমামি।
কিন্তু গবেষণায় প্রমাণিত, এর মধ্যে মিষ্টি স্বাদ সবচেয়ে শক্তিশালী। এতটাই এর শক্তি যে, চিনির মোড়কে অনেক বিস্বাদ জিনিসও হতে পারে সুস্বাদু। এক অত্যন্ত বিতর্কিত মন্তব্য করেছিলেন তিনি। জানা গেছে যে, যথেষ্ট চিনি মিশিয়ে দিলে কুকুরের পটিও হয়ে যাবে সুস্বাদু।
এত কিছু না জেনেও ছোট বেলায় মা দিদিমারা বলতেন, ঝাল লেগেছে ? চিনি খা…..
বা ধরুন English-এ একটা idiom আছে, : sugar coated words. চিনির মোড়কে ভালো লাগে সব।
হ্যাঁ হ্যাঁ! আমরা জ্ঞানপাপী - সব জেনেও বলছি জানি না।
ক্যানাডা এবং ইউরোপিয়ান দেশগুলোতে চিনির উপর বসছে ট্যাক্স, আমেরিকাতে কিছু কিছু জায়গায় বাচ্চাদের অভিভাবকরা স্কুল ছুটির পরে দোকানের দরজা আগলে দাঁড়িয়ে থাকছেন, যাতে বাচ্চারা যথেচ্ছ লজেন্স কেক কিনতে না পারে। কিন্তু, এই ধরনের বিপ্লব আমাদের দেশে হওয়া কি আদৌ সম্ভব?
ভারতবর্ষের মত গরীব দেশে, যেখানে অনেক সময় খাবারই অপ্রতুল, সেখানে এই ধরনের ট্যাক্স আমরা খুব সহজে আশা করতে পারি না। সত্যি সেলুকাস, কী বিচিত্র এই দেশ। কারো বাড়ি ২৭ তলা, ৬০০ জন শুধু কেয়ারটেকার আর এখানেই ভাত জোটে না, এখনও আরেক দলের। আমাদেরই তাই ক্ষেত্রবিশেষে সচেতন হতে হবে, নিজেদের আর পরবর্তী প্রজন্মের জন্যই। দায়িত্ব আমাদের।
ভারতবর্ষের বিশাল বাজার অর্থনীতির দিকে বড় বড় কোম্পানিরা লোলুপ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রয়েছে—কবে আমরা চিনি খাব। চিনি দেওয়া ফলের রস খেতে শুরু করব, সুস্বাদু প্রসেসড ফুড খাব, আর ওদের মুনাফা হবে। এমনকি আমরা অনেক সময় চিনি এড়ানোর জন্য যে স্যালাড খাই, সেই স্যালাড ড্রেসিং বা সসের মধ্যেও থাকে গড়গড়ে চিনি। পালাবেন কোথায়?
জেনে রাখুন, ভারতবর্ষে চিনির উপর বাধানিষেধ আপাতত দুরস্ত।
এসব সত্ত্বেও আমরা সারাক্ষণ ভেবে যাচ্ছি আমাদের কিছুই হয়নি। চিনির নেশা ফালতু। আমরা কেউই আসক্ত নই। আর এই ধরনের অবিশ্বাসটাই কিন্তু চিনির প্রতি নেশার একটা বড় প্রমাণ। ঠিক যেমন ধূমপায়ীরা বা মদ্যপায়ীরা কিছুতেই মানবেন না যে তাঁরা আসক্ত। প্রিন্সটনের বিখ্যাত সাইকোলজিস্ট বার্ড হোবেল-এর যুগান্তকারী গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, চিনির আসক্তি কোকেন, মরফিন বা নিকোটিনের নেশা থেকে কিছুমাত্র কম নয়।
পরবর্তী অনুচ্ছেদটা একটু জটিল। আমরা ধরুন একটু মিষ্টি খেলাম বা কেকের একটা টুকরো খেলাম। এর মধ্যে বেশ কয়েক চামচ বাড়তি চিনি। মানে সিম্পল কার্বোহাইড্রেট। পেট থেকে মাংসপেশিতে সে গ্লুকোজকে ঢোকাতে শরীরের মধ্যে তৈরি হল, একটা মাত্রাতিরিক্ত ইনসুলিনের স্পাইক।
এই স্পাইক আসতেই হবে, না হলে শরীর এতখানি অতিরিক্ত চিনি হজম করতে পারবেনা। এবার দেখুন সেই চিনি তো হজম হল, কিন্তু সেই বাড়তি ইন্সুলিন তখন শরীরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। সেই বিশাল বড় ইনসুলিনের সুনামি আপনার রক্তবাহের চিনি, এবার কমাতে শুরু করল। দেহের মাংসপেশিতে কিন্তু মিষ্টির তখন কমতি নেই।
কিন্তু তবুও, রক্তবাহের চিনি কম থাকার জন্য শরীর মন সব চিনি চাইছে। না খেলেই মেজাজ খিটখিটে। চেনা চেনা লাগছে ? হ্যাঁ ঠিক ধরেছেন! ঠিক যেমন সিগারেট না পেলে স্মোকারদের হয়।
এই প্রসঙ্গে একটা কথা না বললে ব্যাপারটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে, যদিও বিষয়টি খুব বিতর্কিত। আখের চাষ ভারতবর্ষের রাজনীতিতে একটা বড় প্রভাব বিস্তার করে। চট করে চিনির কারখানাকে বন্ধ করার কথা কেউ ভাবতেও পারেন না। কারণ তা থেকে প্রচুর মুনাফা।
উত্তর প্রদেশ এবং মহারাষ্ট্র, যারা ভারতের মধ্যে সবচেয়ে বেশী আখ তৈরি করে, তারা ভারতের লোকসভার ৫৪৩ সিটের মধ্যে ১২৮ টা সিটের ভাগ্য নির্ধারণ করেন। ভোট বড় বালাই। তাই না?
প্রচুর সংখ্যায় রাজনীতিবিদেরা এইসব সুগার কো-অপারেটিভ ফ্যাক্টরির সদস্য বা সভাপতি। এছাড়া আরও অনেক ব্যক্তিগত মালিকানার চিনির কল রয়েছে। লাখ লাখ কৃষক আখের চাষে তাদের জীবিকা নির্বাহ করতে বাধ্য হন।
সুগার লবি তাই অত্যন্ত ক্ষমতাশালী। আপনাদের হয়তো মনে থাকবে, সরকার কয়েক বছর আগে চিনি শিল্পকে তাজা রাখার জন্য প্রায় ৫৫০০ কোটি টাকা অকাতরে দান করেছেন।
যতদূর জানা যায় চিনির যাত্রা শুরু হয়েছিল এই ভারতবর্ষেই, দু’হাজার বছর আগে।
সারা পৃথিবী আজ এই চিনি থেকে সরে আসছে, কিন্তু ভারতবর্ষ কি পারবে তার মিষ্টিমুখ থেকে সরে আসতে?
বলা কঠিন।
তবুও, একটাই আমরা করতে পারি, তা হল, জনসচেতনতার মাধ্যমে বার্তা পৌঁছে দেওয়া। বাকিটা একজন প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের ইচ্ছে অনিচ্ছের ওপরেই ছাড়তে হবে। কারণ, সরকার বাহাদুরের হাত বাঁধা।
কানাঘুষো শুনতে পাই যে ইদানিং আখ থেকে চিনির বদলের আরো বেশী ইথানল বা মদ তৈরির চেষ্টা চলছে । কারণ সুগার লবি বুঝতে পেরেছেন মানুষকে আর বেশীদিন বোকা বানিয়ে রাখা যাবে না।
সূত্রঃ :
Guideline: Sugars intake for adults and children. Geneva: World Health Organization; 2015
Mumbai Mirror : Markand Gadgill, Oct 23, 2018
Times of India : Lakhs of Indians becoming sugar dependent, Teja Lele Desai, May 23, 2013
Nature: The toxic truth about sugar, Robert H. Lustig, Feb 2012,
Lustig, R. H. J. Am. Diet. Assoc. 110, 1307–1321 (2010).
Babor, T. et al. Alcohol: No Ordinary Commodity: Research and Public Policy (Oxford Univ. Press, 2003).
Vio, F. & Uauy, R. in Food Policy for Developing Countries: Case Studies (eds Pinstrup-Andersen, P. & Cheng, F.) No. 9-5 (2007); available at http:// go.nature.com/prjsk4
Joint WHO/FAO Expert Consultation. Diet, Nutrition and the Prevention of Chronic Diseases WHO Technical Report Series 916 (WHO; 2003).
Tappy, L., Lê, K. A., Tran, C. & Paquot, N. Nutrition 26, 1044–1049 (2010).
Garber, A. K. & Lustig, R. H. Curr. Drug Abuse Rev. 4, 146–162 (2011).
Finkelstein, E. A., Fiebelkorn, I. C. & Wang, G. Health Aff. W3 (suppl.), 219–226 (2003). Engelhard, C. L., Garson, A. Jr & Dorn, S.
Reducing Obesity: Policy Strategies from the Tobacco Wars (Urban Institute, 2009); available at http://go.nature.com/w4o5uk
Room, R., Schmidt, L. A., Rehm, J. & Mäkela P. Br. Med. J. 337, a2364 (2008).
Sturm, R., Powell L. M., Chriqui, J. F. & Chaloupka, F. J. Health Aff. 29, 1052–1058 (2010).
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Sugar Diabetes High Blood Pressure Slow Poisoning WHO







