#ভুল (তৃতীয় ও শেষ পর্ব )
কেউ যদি বলেন তিনি কোনো দিন ভুল করেননি, সেটা প্রায় নিশ্চিত অর্ধসত্য। বাকি পর্বের লিঙ্ক নিচে রইল
— ( আগের পর্বের পর )
হার্টের আধুনিক পেসমেকারও আবিষ্কৃত হয়েছে এই রকম রোমাঞ্চকর ভাবে!
যাদের হৃদয় এর ছন্দ খামখেয়ালি হয়ে যায় সেই বেপথু হৃদয়কে মাঝে মাঝে মৃদু শক দিয়ে সোজা পথে নিয়ে আসতে পারে এই যন্ত্র।
এর আগে পেসমেকার বলতে যা বোঝানো হতো তা একটা প্রকান্ড বাক্স। সে নিয়ে মানুষ চলাফেরা করতে পারত না।
ইউনিভার্সিটি অফ বাফেলোতে উইলসন গ্রেটব্যাচ বলে এক ইঞ্জিনিয়ার হার্টের ছন্দকে লিপিবদ্ধ করার জন্য এক ছোট্ট যন্ত্র নিয়ে কাজ করছিলেন।
বিশ্বযুদ্ধের সময় উইলসন ছিলেন ফাইটার প্লেনের চালক। বোমারু বিমানের ক্যাপ্টেনের শখ কিন্ত ছিল বাড়ির পেছনের ভাঙাচোরা ছোট খামার বাড়িতে নানা ইলেক্ট্রিকের যন্ত্রপাতি নিয়ে নাড়াচাড়া করা।
এরকম একটা যন্ত্রের সার্কিটের মধ্যে তিনি ভুল করে একটা রেসিস্টর (ইলেকট্রিক যন্ত্রাংশ) লাগিয়ে দেন তার ফলে সেই যন্ত্র থেকে এক অদ্ভুত আওয়াজ বেরোতে শুরু হলো। যে যন্ত্রের কাজ ছিল হার্টের ছন্দ রেকর্ড করা , সেই যন্ত্রের সার্কিট থেকে মৃদু কারেন্টের শক বেরোতে লাগলো - ছন্দে ছন্দে। যে- সে ছন্দে নয়, কয়েক মুহূর্ত আগে হৃদয়ের যে ছন্দ সে শুনেছে, ঠিক সেই ছন্দে।
খানিকটা বিষম খেয়ে আবার দেখতেই ধরা পড়ল ব্যাপারটা কি। আধুনিক যুগের পেসমেকারের ইলেকট্রনিক সার্কিট আবিষ্কার হলো।
গ্রেটব্যাচের ‘ভুল’ আবিষ্কারের জন্য মানুষ পেল ছোট্ট চাকতির মত পেসমেকার যেটা হার্টের পাশেই ত্বকের তলায় থাকতে পারে অনায়াসে।
প্রায় ৩২৫ টি আবিষ্কারের পেটেন্ট পেয়েছিলেন উনি। কি ছিল না তার মধ্যে! HIV এর ওষুধ থেকে শুরু করে অপ্রচলিত শক্তির নানা প্রযুক্তি। সন্ধান দিয়েছিলেন কিভাবে পেট্রল ডিজেল ছেড়ে বিকল্প শক্তিকে মানুষ কাজে লাগাতে পারে।
গল্পের শেষ নেই, ১৮৮৯ এ ইউনিভার্সিটি অফ স্ট্র্যাসবার্গ।
ডাক্তার মিনকোস্কি আর ভন মেরিং কিছুতেই বুঝতে পারছিলেন না মানুষের শরীরের প্যানক্রিয়াস কিভাবে কাজ করে।
রেগেমেগে শেষ পর্যন্ত সুস্থ এক কুকুরের দেহ থেকে গবেষণার প্রয়োজনে প্যানক্রিয়াস কেটে বাদ দিয়ে দেন তারা।
কদিন বাদেই আশ্চর্য হয়ে দেখলেন যে সেই কুকুরের ইউরিনের উপরে মাছি ভনভন করে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পরীক্ষা করতে গিয়েই বিস্মিত হয়ে গেলেন।
ইউরিনে অসম্ভব মাত্রায় চিনি পাওয়া গেল। কিন্তু এই বিজ্ঞানীরা বহু চেষ্টা করেও আবিষ্কার করতে পারেন নি কিভাবে প্যানক্রিয়াস রক্তের শর্করা নিয়ন্ত্রণ করে।
তবে, এই গবেষণার উপরে নির্ভর করে তারও বছর ৩০ পরে টরন্টো ইউনিভার্সিটির ব্যান্টিং এবং ম্যাকলিওডের গবেষণায় প্রমাণ পাওয়া গেল যে প্যানক্রিয়াস থেকে নিঃসৃত ইনসুলিনের অভাবে রক্তে, ইউরিনে শর্করা বেড়ে যায়।
শুরু হলো ডায়াবিটিসের আধুনিক চিকিৎসা পদ্ধতি।
১৯৩০ সালে ব্যান্টিং এবং ম্যাকলিওড ইনসুলিন আবিষ্কার করার জন্য পেলেন নোবেল পুরস্কার।
আজকে কোটি কোটি মানুষের ডায়াবেটিস কন্ট্রোল করে চলেছে ইনসুলিন।
মানব সভ্যতার প্রবৃত্তি হলো ভুলকে চেপেচুপে দেওয়া। প্রথাগত ভাবে বিখ্যাত ব্যক্তিদের চরিত্র নির্মাণ এমন ভাবেই হয়, যাতে মনে হয় তিনি কোনো ভুল করেন নি, তিনি কোনও ভুল করতে পারেন না।
কিন্তু পিছনে তাকিয়ে যুগে যুগে যেটা দেখতে পাচ্ছি সেটা হচ্ছে ভুল থেকে শিক্ষা নিলে, তবেই তৈরি হয় মানুষের আরো ভালো থাকার এক নতুন দিগন্ত।
ছোটবেলায় থেকে ভুল করলে যে সাজা মেলে, সে তো সবাই জানে। আর বড়রা ভুল করলে, অপমান, লাঞ্ছনা।
বিজ্ঞানীরা ভুল করলে তাদের গবেষণার তহবিল বন্ধ হয়ে যায় এরকম নজির ভুরি ভুরি।
কিন্তু এবার বোধহয় সময় এসেছে সাবালক হবার।
অনিচ্ছাকৃত ভুল কেন হলো তার ‘রুট কজ’ বা কারণ জানার। ভুলের পেছনের মনস্তত্ব আর সমস্যার বিশ্লেষণের।
নাহলে এক বা একদল মানুষকে শাস্তি দিয়ে বাকিদের গায়ের ঝাল মিটবে, কিন্তু তার থেকে সভ্যতা শিখবে কি করে!
ভুলগুলোকে বাক্সবন্দি করে নির্বাসন না দিয়ে দরকার তার যথেষ্ট বিশ্লেষণ।
আজকের ছোট ছেলেকে বা মেয়েটিকে যদি পুরনো ভুলগুলোর শিক্ষা না দেওয়া হয়, তবে তারা বড় হয়ে বিজ্ঞানের ভুল গবেষণাগুলোকে আবার কেঁচে গণ্ডুষ করবে না, তারই বা নিশ্চয়তা কোথায়।
আমার ব্যক্তিগত ভাবে খুব মনে হয় যে ভুলগুলো নিয়ে আলোচনা আরও বৃহত্তর প্রেক্ষাপটে করা দরকার।
যেখানে আজকের প্রশাসনিক, আইন, কলা , বিজ্ঞান, ইঞ্জিনিয়ারিং, ডাক্তারি, পুলিশ একাডেমি, সাংবাদিকতার ছাত্র নিজস্ব ক্ষেত্রের প্রথিতযশা ব্যক্তিত্বদের ভুল থেকে শিক্ষা নেবে।
হয়তো সেই ভুল হাস্যকর।
হয়তো সেই ভুল ন্যাক্কারজনক।
হয়তো সেই ভুল কারও প্রাণ নিয়েছিল একদিন।
হয়তো সেই ভুল কোটি কোটি টাকার গবেষণা তহবিল নিশ্চিহ্ন করে দিয়েছিল কোন ফলাফল ছাড়াই।
হয়তো সেই ভুলে আসল অপরাধী শাস্তি পায়নি।
কিন্তু আমি নিশ্চিত এই ভুলগুলো মানব সভ্যতার ইতিহাসে অনিচ্ছাকৃত ভুল।
এই ভুলগুলো মানুষের ইতিহাসে উন্নতির সোপান।
এমন কি কোনো দিন আসতে চলেছে যেদিন কচিদের ক্লাসের একটা পিরিয়ড হবে 'errors' ?
এনাটমি, ফিজিওলজির সাথে ডাক্তারি ছাত্ররা ভিড় করে শুনবেন প্রথিতযশা চিকিৎসকদের লেকচার 'errors of my life' ?
আই এ এস অফিসারদের ট্রেনিংএ ক্লাস হবে 'errors in administration' ?
কেউ যদি বলেন তিনি কোনো দিন ভুল করেননি, সেটা প্রায় নিশ্চিত অর্ধসত্য বাক্য।
লজ্জায় কুঁকড়ে না গিয়ে, সাবালক হয়ে বরং সেই ভুল থেকেই কিছু শিক্ষা নেওয়া যাক।
আপনি কি বলেন ?
“Failure is a learning experience, and the guy who has never failed has never done anything” – Wilson Greatbatch
(শেষ )
#ভুল
প্রথম পর্ব ( এই লিংকে )
দ্বিতীয় পর্ব ( এই লিংকে )
তৃতীয় ও শেষ পর্ব ( এখানেই )
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search keywords: bhul goldar golder communication error








