মশা ভালোবাসে আপনাকে? 'জিনের কারসাজি'
প্রায় কাঁদো কাঁদো স্বর! তবে ঠিক বুঝতে পারলাম না কিন্তু মনে হলো মিস্টার বসাক মাস্কের আড়ালে একটু হাসলেন।
— মশা ভালোবাসে আপনাকে ?
— মশা?
— হ্যাঁ মশা!
কখনো কি এমন হয়েছে আপনাকে এসে মশা বারবার কামড়ে যাচ্ছে আর আপনি যার সঙ্গে বসে চা আর বেগুনি হাতে নিয়ে আড্ডা দিচ্ছেন তাকে মশা কামড়াচ্ছে না?
অথবা উল্টোটা। আপনি আরামে টিভি তে IPL দেখছেন আর অথচ আপনার জীবনসঙ্গী মশার কামড়ে জেরবার, আপনারই পাশে বসে।
সেদিন ক্লিনিকে মধুছন্দা বসাক এসেছেন। সাথে মিস্টার বসাক। গাইনোকোলোজিক্যাল সমস্যা নিয়ে এলেও, 'গতকয়েক বছর স্বাস্থ্য কেমন গেছে' সেটা আমাদের ক্লিনিকে খুব বেসিক প্রশ্ন।
উত্তর এলো - একদম ভালো না ডাক্তারবাবু।
প্রায় কাঁদো কাঁদো স্বর!
ঠিক বুঝতে পারলাম না কিন্তু মনে হলো মিস্টার বসাক মাস্কের আড়ালে একটু হাসলেন।
মিসেস বসাক বলছেন
— ২০১২ তে ম্যালেরিয়া হলো
— কিছু দিন না যেতেই ডেঙ্গু
— তারপর বার তিনেক ম্যালেরিয়া
আমার চোখ তখন বড়ো বড়ো হয়ে যাচ্ছে কিন্তু সামলাতে পারছি না। উনি বলে চলেছেন-
— আর দুবার ডেঙ্গু
তবে গত নভেম্বরে চিকুনগুনিয়ার পর খুব কাবু হয়ে গেছি, এখনো ওষুধ খেতে হচ্ছে।
এবার স্পষ্ট বুঝতে পারছি বসাক বাবুর শরীরের কেঁপে ওঠাটা হাসির দমকে
এদিকে বসাক গিন্নি চোখ পাকিয়ে কর্তার ওপর ক্ষিপ্ত
— একবারও হাসবে না কিন্তু
মুখের মাস্কটা আবার ঠিকঠাক করে নিয়ে করতে বললেন মিস্টার বসাক বললেন
— মিসেসের সব ভালোবাসা মশার সাথে । জ্বর হলেই জিজ্ঞেস করি মশা কামড়েছে ? আমাদের কাউকে মশা কামরায় না স্যার। কামরায় শুধু মধু কে। কি যে মধু আছে ওঁর রক্তে কে জানে।
এবার কর্তা গিন্নি দুজনেই হেসে গড়িয়ে পড়লেন
পাশের বাড়ির দুষ্টু একরত্তি বাচ্চা বিট্টু নাকি তাঁকে মশা-আন্টি বলে ডাকে।
অনেক সময়েই শুনতে হয় একেকজনকে একটু বেশি মশা কামড়ায়। আপাতত গল্পগাছা বলে মনে হলেও এখন বিজ্ঞান তার পেছনে প্রমাণ নিয়ে এসেছে। আর গবেষণা হয়েছে খোদ লন্ডনে। বলেছে মশারা গন্ধ শুকতে পারে। এবং সেই গন্ধ শুঁকে মশারা তাদের লক্ষ্য ঠিক করে শুধু মানুষ নয়, মানুষের দেহের কোন অংশে কামড়াবে সেটাও।
এইটুকু বলতেই পাশ থেকে যেন কে বলে উঠলো - লন্ডনে মশার গবেষণা? গাঁজাখুরি গপ্পের জায়গা পাওনি?
ঘুমে বেশ চোখটা বুজে এসেছিল কিন্তু কথা শুনে পাশে তাকাতেই দেখি একটা তাগড়াই মশা হাতের উপর বসে বেশ খানিকটা রক্ত ফুলে ঢোল। আর সে মশা- ই এসব কথা বলছে। অত্যন্ত জিঘাংসা নিয়ে মশা মারতে গেলাম কিন্তু তিনি উড়ে চলে গেলেন, আবারো আমাকে বোকা বানিয়ে।
তবে সত্যিই তো। লন্ডন আর মশা ঠিক মিলছে না।
ইংল্যান্ডে মশা নেই বললেই চলে। সেই দেশের খোদ রাজধানীতে মশা নিয়ে গবেষণা! আর গবেষণার ফলাফল এমনই তাতে, যে সমস্ত দেশে প্রতি ঘণ্টায় দশ বার মশা কামড়াতে পারে, সেসব দেশ নড়েচড়ে বসার কথা।
লন্ডনের স্কুল অফ হাইজিন অ্যান্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন এর একটা শাখা রয়েছে তার নাম - আর্থোপোড কন্ট্রোল প্রোডাকশন টেস্ট সেন্টার (ARCTEC)। এর ডিরেক্টর তরুণ-তুর্কি প্রফেসর জেমস লোগান। তুখোড় গবেষণার পাশাপাশি তাকে আমরা বিবিসি আর চ্যানেল ফোর টিভি চ্যানেলের বিজ্ঞানভিত্তিক অনুষ্ঠানের সঞ্চালকের ভূমিকায় প্রায়ই দেখতে পাই।
যে গবেষণা তাঁকে সংবাদের শিরোনামে নিয়ে এসেছে তা হলো মশা-দের গন্ধ শুঁকে মানুষ কামড়ানোর প্রবনতার কথা সামনে আনার জন্য।
তাহলে মশা কি সত্যিই এক -একজনকে একটু বেশি কামড়ায়? তাহলে কি যাকে কামড়াচ্ছে তিনি খাবারে কিছু একটা অন্যরকম খাচ্ছেন যাতে তাঁর রক্ত মশার কাছে আরো মিষ্টি হয়ে যায়? বা তার রক্তের গ্রুপ আলাদা ? নাকি অন্য কিছু?
নানারকম গবেষণায় আমরা জেনেছি যে যিনি নিঃশ্বাসে কার্বন-ডাই-অক্সাইড বেশি নির্গত করেন বা যাঁদের বিশেষ ধরণের ব্লাড গ্রুপ যাদের রয়েছে তাদের মশা কামড়ায় বেশি।
আবার বিয়ার বেশি খেলেও নাকি মশা বেশি কামড়ায়। গর্ভবতী মহিলাদের রক্ত মশা খুব পছন্দ করে। বিশেষত যে ধরনের মশা ম্যালেরিয়া বাহক। এছাড়া আধুনিককালে আমরা জানতে পেরেছি যে আমাদের গায়ের গন্ধও মশাকে আকর্ষণ বিকর্ষণ করতে পারে।
কিছু বছর আগে 37 জোড়া যমজ মানুষের উপরে এই গবেষণা চলে। এতে জানা গেল প্রায় 70 শতাংশ ক্ষেত্রে মশার ভালোবাসা নির্ভর করে মানুষের জিনের গঠনের উপর।
এদিকে ভরপেট খেয়ে মশা বাবাজি এখন আমার কানের কাছে প্যানপ্যান করে উড়ে বেড়াচ্ছেন। উফফ এই আওয়াজ যেন মশা কামড়ানোর থেকেও বিরক্তিকর।
হঠাৎ যেন শুনতে পেলাম মনে হলো তিনি চূড়ান্ত অবিশ্বাসে খেঁকিয়ে বললেনঃ মানুষের জিন থেকে কি গন্ধ বেরোয়? নাকি ডিএন এর মধ্যে আতর গন্ধের ফ্যাক্টরি ? যতসব আজগুবি ব্যাপার। তবে শোনো আমরা গন্ধ পাই।
আমার জিঘাংসা তখন অস্ত গেছে। আর আমি জানি, এ কে মারতে গেলে আবার উড়ে পালাবে। মনে মনে বলি এবার তোমাদের জারিজুরি ফাঁস। না, জিন থেকে গন্ধ আসে না। ডিএনএ তেও গন্ধ নেই। কিন্তু সূত্র অন্য কোথাও।
আমাদের শরীরে দশ লক্ষ কোটি জীবাণুর বাস। মধ্যে বেশিরভাগই বন্ধু জীবাণু আর কিছু শত্রু জীবাণু । তবে দুটো তথ্য সত্যি। এক, এই জীবাণুদের ছাড়া আমরা বাঁচতে পারব না। আর দুই , এই জীবাণুরা যা খায় সেটা আমাদের শরীর থেকেই সংগ্রহ করে।
না, আপনি এদের কাছে ভাড়া বাবদ কোনো রোজগার করতে পারবেন না। কিন্তু তারা আমাদের অনেক কিছু উপহার দেয় - যেমন কিছু ভিটামিন বা অনেক উপকারী রাসায়নিক বর্জ্য যা মানুষের রোগ প্রতিরোধেও সাহায্য করে ।
এমনকি আমাদের শরীরের গন্ধ এবং শরীরের বিভিন্ন জায়গার এর গন্ধ-পার্থক্যে দায়ী এই ধরনের রাসায়নিক পদার্থ। এইসব জীবাণুদের নানা পছন্দ-অপছন্দ আমাদের জিনগত প্রভেদের সাথে সম্পর্কিত।
এর কারণ এই যে, আমরা নিজেরা ঘাম বা স্বেদ এর মাধ্যমে ত্বকের উপরে যে ধরনের রাসায়নিক বর্জ্য ত্যাগ করি সেই রাসায়নিক খাবারের উপরে নির্ভর করে চলে আমাদের ত্বকের সহ-জীবাণুদের জীবনধারণ।
এদিকে আমাদের ত্বকের বর্জ্য পদার্থের উপাদান আমাদের জিন দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। হয়তো গোদা গোদা উপকরণগুলো নয় কিন্তু চুলচেরা বিচার করলে দেখা যাবে যে একজন মানুষের বর্জ্য পদার্থের রাসায়নিক আরেকজন মানুষের বর্জ্য পদার্থের রাসায়নিক গঠন থেকে আলাদা।
এতটাই আলাদা, যে, তা প্রায় আঙ্গুল ছাপের মতোই স্বকীয়। ত্বকের উপরে আমাদের ঘাম থেকে তৈরি হওয়া বর্জ্য পদার্থের রাসায়নিক গঠন আলাদা এবং ত্বকের উপরে কোন জীবাণু থাকবে তা এই বর্জ্যের উপাদান দিয়েই নিয়ন্ত্রিত হয়।
স্বভাবতই জীবাণু থেকে তৈরী রাসায়নিক ও আমাদের বর্জ্য এবং জীবানুর বর্জ্য এই দুই বর্জ্যের রাসায়নিক কে বুঝতে পারে মশার সংবেদনশীল এন্টেনা। সুতরাং মশা ডাল সেদ্ধ খাবে, নাকি রাজভোগ খাবে, তা নির্ভর করে মশার ইচ্ছের উপরে।
জানা যাচ্ছে এদিক Aedes Gambie বলে এক ধরনের মশা, যাদের ম্যালেরিয়া হয়েছে তাদেরকে আক্রমণ করতেই বেশি পছন্দ করে। শুধু তাই নয়, তাঁদের শরীরের শুধু হাত আর পায়ের চেটো- এই দুটোই Gambie র পছন্দের রেস্টুরেন্ট। আবার কিছু মশা ধাবিত হয় প্রাণীদের বগল বা কুচকির দিকে। কেউ যায় ঘাড়ের পেছনে, কেউ পিঠের দিকে, আর কেউ বা হাঁটুর পেছনে।
তাহলে কার রক্ত মিষ্টি আর কার রক্ত ঝাল - সেরকম নয়। মশারা চুলচেরা বিচার করে নানা ধরনের রাসায়নিক এর গন্ধবিচার করে। তবেই উনি আসবেন, বসবেন এবং আহার করবেন।
লোগান সাহেব এই নিয়ে গবেষণা করছেন, আরো করবেন এবং এই গবেষণা করতে করতে হয়তো একদিন আমরা মশাকে ঠেকিয়ে রাখার অত্যাধুনিক পরিবেশবান্ধব পদ্ধতি আবিষ্কার করে ফেলতে পারব।
কিন্তু যেটা আশ্চর্যের ব্যাপার তা হল আরো বড়ো এক উপলব্ধি। জিনের প্রভাবে আমরা শুধুমাত্র লম্বা, খাটো কিংবা ফর্সা বা শ্যামলা হইনা। আমাদের শরীর-মন, এমনকি আমাদের শরীরে ঘুরে বেড়ানো রাসায়নিক নির্ভর করে আমাদের জিনের প্রভাবে।
পুনশ্চ : আমাদের গল্পের হিরো মশা নয়, ম্যালেরিয়া-ও নয় আমাদের গল্পের আসল হিরো আমাদের জিন। শুধু মশার কামড় নয়। আমাদের শরীরে কবে কি (নন ইনফেকসাস) অসুখ প্রকাশ পাবে যথেষ্ট গবেষণা হলে জানতে পারবো সেটা। সেই অসুখের চিকিৎসা কিরকম ভাবে হবে সেটাও নির্ভর করবে আমাদের জিনের উপরে।
ভালো দর্জির দোকান থেকে বানানো জামা কাপড় জামার আমাদের সবচেয়ে ভাল ফিট করে, তেমনই জিনগত গবেষণার উপরে ভিত্তি করে দেওয়া পার্সোনালাইজড ওষুধ পত্র আমাদের কাজ করবে অনেক বেশি। বিভিন্ন ক্যান্সারে বিশেষতঃ ওভারিয়ান ও ফুসফুসের ক্যান্সারে ইতিমধ্যেই তার ছাপ দেখছি।
এই পার্সোনালাইজড ট্রিটমেন্টের রিসার্চের পালে আরো বেশি হাওয়া লাগুক এই প্রার্থনা করি। ২০২০ এর নচ্ছার ভাইরাসের কারণে, সেই ভাইরাস ছাড়া অন্যান্য স্বাস্থ্য গবেষণা অনেকগুলো বছর পিছিয়ে গেল।
কিন্তু আশা করব খুব তাড়াতাড়ি আমরা ২০২০ কে পরাস্ত করে ফিরে যেতে পারবো প্রাণঘাতী অন্যান্য মারণ রোগের রিসার্চে। ততক্ষণ চট করে একবার দেখে নিন কোন মশা এই ফেসবুক পোস্ট পড়ার সুযোগে আপনার রেস্টুরান্টে তার ডিনার সেরে ফেলল কিনা। (শেষ)
( এই লেখা প্রথম প্রকাশিত হয় আমার ফেসবুক পেজে, 2020 সালে )
#জিন
Martinez J, Showering A, Oke C, Jones RT, Logan JG. 2021. Differential attraction in mosquito–human interactions and implications for disease control. Phil. Trans. R. Soc. B 376, 20190811 (10.1098/rstb.2019.0811)
Logan JG, et al. Identification of human-derived volatile chemicals that interfere with attraction of Aedes aegypti mosquitoes. J Chem Ecol. 2008;34:308–3
Cork A. Olfactory basis of host location by mosquitoes and other haematophagous Diptera. Ciba Found Symp. 1996;200:71–84. and discussion (1996) 200:84–88.
Syed Z, Leal WS. Mosquitoes smell and avoid the insect repellent DEET. Proc Natl Acad Sci USA. 2008;105:13598–13603.
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Gene Mosquito James Logan BBC Genetic Genetics Personalized Personalised medicine








