ফাইব্রয়েড প্রতিরোধ কি সম্ভব?
চল্লিশ ওপরে ফাইব্রয়েড দেখার সম্ভাবনা সব থেকে বেশি। কিন্তু বয়সকে তো আর বেঁধে রাখা যায় না। তাই এটা আপনি এড়াতে পারবেন না। কিন্তু অন্যান্য আরো অনেক উপায় রয়েছে। যেখানে সমাধান আপনার হাতের মুঠোয়।
আপনি ফাইব্রয়েডের নাম শোনেননি এরকম বোধহয় হওয়াটা প্রায় অসম্ভব।
লন্ডন থেকে টোকিও, কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী - একজন মহিলার জীবনে সবচেয়ে বেশি যে টিউমার দেখা যায়, তার নাম ফাইব্রয়েড।
আপনি যদি শিয়ালদা স্টেশনে যান এবং সব মহিলাকে কথাবার্তা বলিয়ে স্ক্যানের জন্য রাজি করাতে পারেন, তাহলে দেখবেন 100 জনের মধ্যে 70 জন মহিলারই ফাইব্রয়েড রয়েছে।
কেউ হয়তো জানেন, কেউ বা জানেন না।
ক্যান্সার ছাড়া আর যে যে কারণে হিস্টেরেক্টমি হয় তার সিংহভাগ জুড়ে থাকে এই ফাইব্রয়েডের সমস্যা।
কি হয় না এই ফাইব্রয়েড-এ?
পেটে ব্যথা, পিরিয়ডের প্রবলেম থেকে শুরু করে আরো নানারকম।
কিন্তু ফাইব্রয়েড প্রতিরোধের উপায় আছে কি কিছু?
তার জন্য প্রথমেই যেটা জানা দরকার যে ফাইব্রয়েড হয় কেন?
তাহলেই জানতে পারবেন যে কি কিভাবে আমরা ফাইব্রয়েড কে প্রতিরোধ করতে পারি।
🟪 ফাইব্রয়েড হওয়ার একটা বড় কারণ চল্লিশের ওপরে বয়স। ফাইব্রয়েড যে কোন বয়সেই হতে পারে কিন্তু 40 এর উপরে ফাইব্রয়েড দেখার সম্ভাবনা সব থেকে বেশি।
কিন্তু বয়সকে তো আর বেঁধে রাখা যায় না। তাই এটা আপনি এড়াতে পারবেন না।
কিন্তু অন্যান্য আরো অনেক উপায় রয়েছে। যেখানে সমাধান আপনার হাতের মুঠোয়।
🟪 বাড়িতে ক্রমাগত অশান্তি। নিজের জন্য সাংসারিক চাপে সময় বার করতে না পেরে ক্রমশই ওজন বেড়ে যাওয়া।
🟪 বেশি প্রসেসেড ফুড খাওয়া। ঠিক সময়ে ঠিক খাওয়া দাওয়া না করা।
🟪 সূর্যের আলোকে ভয় পেয়ে সবসময় রোদ এড়িয়ে থাকা। এইগুলো ফাইব্রয়েড সৃষ্টির অন্যতম রিস্ক ফ্যাক্টর।
ব্যাপারটা একটু বুঝিয়ে বলি।
➤ ক্রমাগত সাংসারিক কর্মক্ষেত্রে বা মানসিক অশান্তি বাড়িয়ে তোলে শরীরে ক্রনিক প্রদাহ বা ক্রনিক ইনফ্লামেশন। ক্রমাগত যদি ওজন বেড়ে যেতে থাকে তাহলে শরীরে তৈরি হয় নানা ধরনের কেমিক্যাল এর মাত্রাধিক্য। শুরু হয় সেই ক্রনিক ইনফ্লামেশন।
➤ ভিটামিন-ডি তৈরি করা সবথেকে ভালো কারখানা রয়েছে আমাদের ত্বকে
কিন্তু সূর্যের চড়া তাপে আমরা অনেকেই বাইরে বেরোতে ভয় পাই। ফলশ্রুতি হিসেবে ভারতবর্ষের মতো দেশে যেখানে সূর্যালোকের কোন অভাব নেই, সেখানেও ভিটামিন-ডি এর অভাব প্রায় ঘরে ঘরে।
ভিটামিন ডি শরীররে ক্রনিক ইনফ্লামেশন কে প্রতিরোধ করতে সাহায্য করে।
আর?
➤ আমাদের মানুষের শরীরে ৩৭ লক্ষ কোটি মানুষের কোষ আর ৮২ লক্ষ কোটি জীবাণু রয়েছে। আমাদের স্কিনে আঙ্গুলের ফাঁকে, মুখে, মাথায় কোথায় নেই এই জীবাণু! সবথেকে বেশি জীবাণু রয়েছে আমাদের পেটের ভেতর।
আপনি যে সকাল বেলা পটি করেন তার অর্ধেক ওজন এই জীবাণুর ধ্বংসাবশেষ।
শুনতে আশ্চর্য লাগলেও আপনার আগামী স্বাস্থ্য কিরকম থাকবে তা এই জীবাণুদের অঙ্গুলি হেলনেই নিয়ন্ত্রিত হয়। এই জীবাণুগুলোকে একসাথে বলা হয় মাইক্রোবায়াটা।
➤ খুব বেশি প্রসেসড ফুড খেলে তার সঙ্গে যে সমস্ত রাসায়নিক মিশে থাকে তার জন্য মারা যায় বন্ধু মাইক্রোবায়াটা। বাড়তে থাকে ক্রনিক ইনফ্লামেশন।
🏆 কিন্তু ক্রনিক ইনফ্লামেশন ব্যাপারটা কি?
কেনই বা এটা এত বেশি গুরুত্বপূর্ণ?
আসলে ক্রনিক ইনফ্লামেশনের একটা আশ্চর্য ক্ষমতা রয়েছে। শরীরের ডিএনএ বা জিনের মধ্যেকার যে স্ট্রাকচার সেগুলোকে ভেঙেচুরে ক্ষতিগ্রস্ত করার এই ক্ষমতা পৃথিবীর খুব কম শক্তিরই আছে। জিনের মধ্যেকার গোলমাল কে বলে মিউটেশন।
➤ অনেকদিন ধরে ক্রনিক ইনফ্লামেশন চলতে থাকলে তৈরি হতে পারে বাড়তি কোষ বিভাজন।
তৈরি হয় নানা টিউমার। এবং কিছু কিছু টিউমার থেকে তৈরি হয় আবার ক্যান্সার।
এই ধরনের একটি অত্যাধুনিক মিউটেশনের নাম এম ই ডি ১২- ফাইব্রয়েড সৃষ্টির জন্য দায়ী।
ব্যাপারটা বিজ্ঞানের কচকচি বলে মনে হলেও একটু খোঁজখবর না রাখলে নিজেকে ভালো রাখা আজকালকার দিনে খুবই কঠিন।
➤ হেয়ার স্প্রে থেকে সুগন্ধি, কলকারখানার ধোঁয়া,কীটনাশক, পাউরুটি, রং, রাংতা মোরা খাবারের মধ্যেও লুকিয়ে থাকতে পারে এক ধরনের বিশেষ কেমিক্যাল তার নাম (ইডিসি EDC - Endocrine Disturbing Chemical)
সহজ কথায় এন্ডক্রিন মানে হরমোন।
আপনি জানতে চাইলে পরে একদিন এই ইডিসি নিয়েই লেখা যাবে। ব্যাপারটা গোলমেলে তো বটেই - এমনকি, গভীরে ভাবতে গেলে বেশ চাপের।
🔔 কিন্তু প্রাথমিকভাবে যেটা মনে রাখুন একটা সহজ ফর্মুলা।
আপনি যদি ইংরেজি জানেন তাহলে খাবারের প্যাকেটে যে উপাদান গুলির নাম আপনি এক নিঃশ্বাসে পড়তে পারছেন না সেই খাবার খাবেন না।
আর আপনি যদি শুধুমাত্র বাংলা জানেন তাহলে সমীকরণটা আরও সোজা। যে খাবারের নাম আপনি উচ্চারণ করতে পারছেন না সেই খাবার বর্জন করুন।
খাবারকে আরো সুস্বাদু করে তোলার জন্য, অনেকদিন ধরে তাজা রাখার জন্য, এবং খাবারকে আরও সস্তায় আপনার কাছে যাতে পৌঁছে দেয়া যায় তার উদ্দেশ্যে অনেক ধরনের কেমিক্যাল খাবারের মধ্যে মিশিয়ে দেওয়া হয়।
এই ধরনের কেমিক্যাল গুলো আমাদের শরীরের হরমোনের যে দাড়িপাল্লা তার ভারসাম্য করে দেয় নষ্ট। তৈরি হয় নানা টিউমার। তার মধ্যে একটা ফাইব্রয়েড।
🔔 তাই সব থেকে বেশি বিশ্বাস করুন নিজের রান্নাঘরে। আর বিশ্বাস রাখুন টাটকা ফল শাকসবজিতে।
🔔 এমনকি ব্লাড প্রেসার বাড়ার সাথেও ফাইব্রয়েড এর সম্পর্ক রয়েছে কিছু গবেষণায় প্রকাশ যে যাদের ব্লাড প্রেসার বেশি সেই সব মহিলাদের 5 গুণ হওয়ার সম্ভাবনা আছে।
আপনি নিশ্চয়ই এতক্ষন ভাবছেন যে তাহলে তো সবারই ফাইব্রয়েড হবার কথা। আপনি খুব একটা ভুল নন।
প্রথমেই বলেছি 70 শতাংশ মহিলারই ফাইব্রয়েড ছিল আছে বা থাকবে।
সুতরাং ভয় না পেয়ে তার প্রতিরোধের উপায় গুলো জানা খুব জরুরী।
এর মধ্যে কিছু কিছু ব্যাপার, যেমন বাড়তে থাকা বয়স বা আপনার উত্তরাধিকার সূত্রে পাওয়া জেনেটিক মেকআপ গুলি চেঞ্জ করার তো কোনো উপায় নেই।
🔔 যেটা উপায় আছে সেটা - আপনার শরীরের দিকে বাড়তি নজর দেওয়া প্রয়োজন।
যে সমস্ত মহিলারা অত্যাচারিত হন বেশি তাদের উপরে ফাইব্রয়েড এর প্রভাব বেশি দেখা যায়। সে অত্যাচার কেবলমাত্র শারীরিক অত্যাচার তা নয়।
🔔 মানসিক অত্যাচারও একটা বড় কারণ। তাই নিজের মনের দিকেও খেয়াল রাখুন
পারলে মাঝে মাঝে বন্ধুদের সঙ্গে কোথাও ঘুরে আসুন। নিজের আশেপাশে পারিবারিক এবং কর্মক্ষেত্রে পরিবেশ যদি পাল্টানো সম্ভব হয় তাহলে সেটার দিকে নজর দিন।
যখনই আপনি বাড়িতে এ ধরনের কথাগুলো আলোচনা করবেন তখনি দেখবেন পাশের মানুষরা সচেতন হচ্ছেন।
তার কারণ যিনি কষ্ট দেন আর যিনি কষ্ট পান দুজনেরই শারীরিক অবনতি ঘটতে থাকে দিনের পর দিন।
🔔 আপনার বস যদি আপনাকে দৈনিক পিন দিতে থাকেন, বা আপনি নিজেই বস হয়ে রিভার্স শোষণের শিকার হন তাহলে অফিসে সেমিনার করুন কিভাবে ক্রনিক স্ট্রেস কমানো যায়।
মানসিক আত্মরক্ষাও আমাদের জীবনের প্রয়োজনীয় স্কিল।
🔔 শুনতে অবাক লাগলেও দৈনিক অল্প কিছু সময় মেডিটেশন বা মাইন্ডফুলনেসের কিছু স্কিল আমাদের জীবনকে সাজিয়ে তুলতে পারে।
মেডিটেশন যে শুধুমাত্র অন্ধকার ঘরে বসে চুপচাপ বসেই করতে হয়, তেমন নয়। অটোতে বসে বা রান্নাঘরেও চোখ খুলে মেডিটেশন করা যায়।
🔔 আরও যেটা উপকারী সেটা হল সপ্তাহে তিন থেকে চার ঘন্টা মাঝারি থেকে ভারী এক্সারসাইজ করা। কনকনে ঠান্ডা বা প্যাচপ্যাচে গরম দু সময়েই ব্যায়াম প্রয়োজন।
আজ শরীরের দিকে আপনি কতখানি টাইম দিচ্ছেন তার ওপরে আপনার ভবিষ্যৎ নির্ভরশীল।
🔔 সকালের হালকা রোদ বা বিকেলের পড়ন্ত রোদ গায়ে লাগানোর থেকে বিরত হবেন না।
আমাদের ত্বক যে মুন্সিয়ানা থেকে ভিটামিন ডি তৈরি করতে পারে সেই কোয়ালিটির ভিটামিন ডি ল্যাবরেটরি থেকে তৈরি করা অসাধ্য।
🔔 খাবার দাবারে প্রিজারভেটিভ বা নিত্য নতুন কেমিক্যাল যেসব মিশে থাকছে সেখানেও আপনার সতর্কতার প্রয়োজন।
হ্যাঁ সব কেমিক্যালই হয়তো খারাপ নয়।নিজে পড়াশুনা করে জেনে নিন কোনটা ভালো আর কোনটা নয়।🔔 তবে হ্যাঁ পড়াশুনা করুন এমন জায়গা থেকে যেখানে নিরপেক্ষভাবে তথ্য দেয়া হয়েছে।🔔 কিছু সন্দেহজনক মনে হলে সরকারি প্রতিনিধির কাছে জানতে ভুলবেন না।
কারণ সুনাগরিকের সাহায্য ছাড়া কিন্তু আমাদের সরকার ভবিষ্যতের চাষের সার বা তৈরি খাবারের রেগুলেশন করতে পারবেন না।
হ্যাঁ, এসব হলে, অবশ্যই খাবার-দাবারের দাম খানিকটা বাড়বে। কিন্তু আখেরে যেটা কমবে সেটা হলো আপনার হাসপাতালের বিল।
🔔 শরীরের ওজনকে ঠিক লক্ষের মধ্যে বেঁধে রাখাও এক অত্যাবশ্যকীয় স্কিল।
এটা নিয়ে আমরা প্রচুর ভিডিও করেছি দেখে নিতে পারেন।
➤ কিন্তু যেটা বড় কথা তা হচ্ছে এই নিয়মিত এক্সারসাইজ, ভিটামিন ডি, শরীরের ওজন নিয়ন্ত্রণের মধ্যে রাখা বা ঠিকঠাক ভাবে খাওয়া দাওয়া করা শুধু যে আপনার ফাইব্রয়েড প্রতিরোধে সাহায্য করে তা নয়।
হার্টের অসুখ, ব্রেনের অসুখ, এমনকি ক্যান্সার প্রতিরোধেও এদের জুড়ি নেই।
বাড়িয়ে রাখে আপনার স্মৃতিশক্তি। আর আপনাকে করে তোলে মানসিক এবং শারীরিকভাবে সর্বাঙ্গিক সুস্থ।
➤ ওরাল কন্ট্রাসেপটিভ পিল ফাইব্রয়েডকে ঠেকিয়ে রাখতে সাহায্য করে। তবে খুব অল্প বয়সে ওরাল কন্ট্রাসেপটিভ পিল দরকার না থাকলে ইউজ না করাই ভালো। তবে একবার ফাইব্রয়েড তৈরি হয়ে গেলে সেখানে ওরাল কন্ট্রাসেপটিভ পিল কতটা কাজের সেটা নিয়ে বিজ্ঞান এখনো দ্বিধা বিভক্ত।
➤ কিছু কিছু গবেষণায় এমনও তথ্য বেরিয়ে আসছে যে খুব বেশি পরিমাণে দুধ বা সয়াবিন জাতীয় খাবার খেলে ফাইব্রয়েড হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যাচ্ছে।
আবার কিছু কিছু গবেষণায় এই ফাইব্রয়েড, ডেয়ারি শিল্পে হরমোন ইনজেকশন আর সয়াবিনের মধ্যে সম্পর্ক অতটা পাওয়া যাচ্ছে না। তবুও দুধ এবং সয়াবিনে থাকতে পারে মহিলা হরমোন বা ইস্ট্রোজেন।
যে ইস্ট্রোজেন ফাইব্রয়েড কে খাবার দিয়ে বাড়বাড়ন্ত রাখে।
সুতরাং সতর্ক থাকতে ক্ষতি কি?
আরও পড়তে হলে:
Hypertension: fibroid
Takeda T, Sakata M, Isobe A, et al. Relationship between metabolic syndrome and uterine leiomyomas: a case-control study. Gynecol Obstet Invest. 2008;66(1):14-17.
Adolesencet Contraception use
Stewart EA, Cookson CL, Gandolfo RA, Schulze-Rath R. Epidemiology of uterine fibroids: a systematic review. BJOG. 2017;124(10):1501-1512.
Marshall LM, Spiegelman D, Goldman MB, et al. A prospective study of reproductive factors and oral contraceptive use in relation to the risk of uterine leiomyomata. Fertil Steril. 1998;70(3):432-439.
Chiaffarino F, Parazzini F, La Vecchia C, Marsico S, Surace M, Ricci E. Use of oral contraceptives and uterine fibroids: results from a case-control study. Br J Obstet Gynaecol. 1999;106(8):857-860.
Milk Soybean
Gao M, Wang H. Frequent milk and soybean consumption are high risks for uterine leiomyoma: A prospective cohort study. Medicine (Baltimore). 2018;97(41):e12009.
Orta OR, Terry KL, Missmer SA, Harris HR. Dairy and related nutrient intake and risk of uterine leiomyoma: a prospective cohort study. Hum Reprod. 2020;35(2):453-463.
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Fibroids Fibroid Tumor Cancer Chronic Inflammation Vitamin D Mutation EDC







