ফোন - কী বলব?
'ফোন' আজ আমাদের জীবনের অঙ্গ । কিন্তু কীভাবে একটা ফোন কল কাউকে অক্সিজেন দিতে পারে? Out Of Syllabus এই স্কিল শেখা দরকার আমাদের সবারই। তাই না?
কিছু কিছু ফোন রিং হলেই আপনি বুঝে যাবেন কেন ফোন এসেছে। ফোন ধরার আগেই..
এক সময় আমাদের এক টিম মেম্বারের সকাল সাড়ে ছটায় ফোন এলেই, জানতাম বার্তা আসবে,
-আজকে শরীর খারাপ, আসতে পারবো না।
সাড়ে আটটায় ফোন এলে,
-পেট খারাপ।
দশটায় ফোন এলে,
-স্যার, চলে এসেছি।
অথবা,
-ট্রেন গণ্ডগোল দেরি হবে।
সে দেরি মানে ঘণ্টা-দুই ।
আমি ততক্ষণ বুঝে গেছি আজ আমাকে নিজেকেই কাজ সারতে হবে। পেশেন্টের অর্ধেক কাজ হবে না। হোঁচট খেয়ে খেয়ে কাজ এগোতে হবে।
আবার কখনও আমাদের একজন 'ইতি গজ' মেম্বারের ফোন আসে যখন, আমি জানি সব কথাই আমাকে দুবার ভেবে উত্তর দিতে হবে। বেশির ভাগ কথাই মিথ্যে নয়, অর্ধসত্য! সে ভারী ভয়ংকর !
একদিন জরুরী দরকারে মেসেজ করেছি। প্রত্যাশিত ফোন পেয়ে শুনি, লাইনের ওপরে মহা শোরগোল।
-স্যার রাস্তায় আছি, বাড়ি পৌঁছে আপনাকে রিং ব্যাক করছি।
কোন 'বাড়ি' সে কথা অবশ্য উহ্য থেকে গ্যালো ! বৈদ্যবাটিতে নিজের বাড়ি, নাকি বর্ধমানে বন্ধুর বাড়ি ! তাই তার ফোন ১০ মিনিটে আসবে নাকি ৩ ঘণ্টায় , কেউ জানে না।
কোনদিন হাঁফাতে হাঁফাতে ফোনের ও প্রান্ত থেকে আকুল স্বর। -স্যার ৯ টার মধ্যে বেরিয়েছিলাম বাড়ি থেকে, তাও পৌঁছতে খুব দেরি হয়ে যাচ্ছে।
পরে ফুটনোট সহ বিস্তারিত জানা গ্যালো যে ৯ টার মধ্যে মানে আসলে হল ৯ টা ৩০ । দুটোই ওনার মতে ‘নটার মধ্যেই' !
জিজ্ঞেস করলেই, আমি কিন্তু স্যার মিথ্যে কথা বলি না।
উনি ভয়ঙ্কর সত্যবাদী। সেটা যে সত্য-বাদ-ই সেটা বুঝে এখন ফোনে সতর্ক সবাই ।
পরবাসে থাকতে, ইন্ডিয়া থেকে কেউ ফোন করা মানেই দুঃসংবাদ। সেসময় বিদেশবাসীই ফোন করবেন বলে অলিখিত নিয়ম ছিল। দেশের কারও মিসড কল মানেই কারও শরীর খারাপ অথবা শরীর নেই।
কোন কোন দিন আমার ফোনে চার কুড়ি ফোন আসে। কিন্তু তার একটা থিম আছে।
ক্লিনিক শেষ করে বাড়ি এসেছি, তারপর যদি ক্লিনিকে দেখা কোন পেশেন্ট ফোন করেন তাহলে, চোখ বুজে বলা যায়..
উনি ওষুধের দোকানে দাঁড়িয়ে কোন ওষুধ পাচ্ছেন না।
-স্যার একটু ওষুধের দোকানে কথা বলবেন, ফোনটা ওনাকে দিচ্ছি…
রবিবার বিকেলে ফোন আসা মানেই সেটা ট্রিটমেন্ট চেঞ্জের জন্য।
-ভেবেছিলাম ডাক্তারবাবু, ওষুধ খেয়ে দেখব, কিন্তু আপনি সার্জারিটাই করে দিন।
বা, উলটোটা।
রবিবার বাড়িতে মুরুব্বিরা আসেন তাই হয়তো গভীর আলোচনা হয়, বুঝতে পারি।
এক প্রোথিতযশা সার্জেন নাকি লুচিতে হাত দিলেই কোষ্ঠকাঠিন্যের ফোন আসতো।
উনি কর্মজীবনের শেষ তিন দশক আর লুচি খান নি।
কখনও প্রেডিক্টেবেল ফোন আসে লম্বা ভূমিকা নিয়ে..
-পূজাতে বাড়িতেই ছিলে? বিজয়ার শুভেচ্ছা নিও।
আমি হাতড়ে বেড়াই হঠাৎ এক দশক বাদে কালি পূজার রাতে, আমাকে বিজয়া শুভেচ্ছা কেন, ফোনের মাহেন্দ্রক্ষণের জন্য অপেক্ষা করি..
-চা খেয়েছ ? ছেলে কোন ক্লাসে? বাবা কেমন আছেন? কত বয়েস হল ?
তার পরেই,
-আচ্ছা শোন !
ফোনের মাহেন্দ্রক্ষণ আগত.. মন দিয়ে শুনি
-হ্যাঁ বলুন।
-আমার ভাগ্নে উডল্যান্ডস এ ভর্তি হয়েছে, একটু খবর নিতে পারবে?
-আমি তো উডল্যান্ডস এ নেই।
-সে জানি, তবে তুমি পারবে।
জানি, বিপদে পড়লেই মানুষ সাহায্য খোঁজেন, সাধ্য মত করি-ও,
কিন্তু গৌরচন্দ্রিকা ছাড়া বোধয় সাহায্য চাইতে ইতস্তত বোধ করেন মানুষ।
যেদিন টেবিলের ওপারে আমি থাকব , সেদিন আমিও হয়তো একই কাজ করবো
তবে প্রেডিক্টেবেল ফোন কারও পছন্দ নয়। সে ফোন যেন লেবু-নারকোল ছাড়া মশলা মুড়ি। নুন কম, পাপড়ি চাট । যেন অ্যাডভেঞ্চারের গন্ধই নেই ।
প্রেডিক্টেবেল ফোন আমাদের ডিউটি হলেও, কারও কাছে সেটা একঘেয়ে। কারও কাছে সেটা শুধুই মেঘ পিওন। বয়ে নিয়ে আসে মন খারাপের দিস্তা।
ধরুন, কঠিন সার্জারি হয়ে বাড়িতে ফিরেছেন পেশেন্ট। অজস্র ফোন আর হোয়াটসঅ্যাপ।
প্রথম কথাই এখন কেমন আছ?
শয়ে শয়ে প্রশ্ন , 'কেমন আছ?'
ধ্বনি প্রতিধ্বনিতে 'কেমন আছ, এখন ?'
ভালো থাকলেও, পেশেন্টের মনে হবে, আমি বোধহয় ভালো নেই, ভালো থাকার কোন কথাও ছিল না। পরদিন হয় পেটে গ্যাস অথবা মনটা ঝাপসা ।
অনেক সময় ফোনের ‘শিকার’, যিনি ফোন করেছেন, আর যাকে করেছেন তার দুজনেরই কেউই নয়।
শিকার- ঘরের তৃতীয় ব্যাক্তি ।
তার হয়তো একটা কঠিন রোগ নির্ণয় হয়েছে । বা কোলেস্টেরল রিপোর্ট বেশি এসেছে। বা, ফাস্টিং সুগার ২৫০।
বাড়িতে ফোন এলেই ফিসফিস করে কথা বলতে বলতে বেরিয়ে গেলেন অন্য আত্মীয়।
সে ফোনে লটারি পাওয়ার খবর থাকলেও যিনি অসুস্থ তার হাত শীতল হতে বাধ্য।
ফোনের ক্ষমতা অপ্রতিরোধ্য!
নতুন বছর বা নতুন মাসে আমাদের রেসলুশন সবার আলাদা আলাদা..
কেউ সিগারেট বাদ দেবেন!
কেউ এক্সের সাথে সম্পর্ক!
কেউ যাবেন জিম!
কেউ কমাবেন চিনি!
কেউ কি ভাবছেন যে তিনি যে ফোনগুলো করবেন তাতে উনি এক ঝলক অক্সিজেন দেবেন নতুন বছরে?
অক্সিজেন শুধু সিলিন্ডারে আসে না, গলা থেকেও আসে!
অসুস্থ কাউকে যদি বলা যায়..
-তুমি যে বইটা দিয়েছিলে, আমি দুবার পড়েছি । তুমি আরও একবার পড়বে নাকি ? দিয়ে আসব?
বা,
-তোমার মুড়িঘণ্টের রেসিপিটা দিও তো একবার!
-সেদিন জানলা খোলা ছিল, পুরো জলে ভেসে গেছে সিঁড়ি..
-পুরুলিয়া গিয়ে কোন হোটেলে ছিলে তুমি ?
পাশে যদি দাঁড়াতেই হয়, সেটা 'কেমন আছ ?' বলে নয়, চলুন বলি অন্য কথা।
শরীর সুস্থের ভার যদি পেশেন্ট আর ডাক্তারের হয়, তাহলে মন টা ভালো করার দায়িত্ব আমাদের সবার।
দেখুন না ফোনেই কাউকে জীবন দিতে পারেন কি না ? এই নতুন বছরে?
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Phone Talk Inspiration Diary





