নোট যখন টাকার থেকে দামি!
তখন সবে বাইপাসের সব থেকে বড়ো প্রাইভেট হসপিটাল ছেড়ে দিয়েছি। হঠাৎ মেডিকেল কলেজেরই এক দাদা র ফোন...... নিজের জীবনের ডায়েরি থেকে এক পাতা
তখন সবেমাত্র বাইপাসের সব থেকে বড়ো প্রাইভেট হসপিটাল ছেড়েছি। মনমালিন্যের জেরে, হঠাৎ ছেড়ে দেওয়া। মাসের প্রাপ্য টাকা পাইনি। সেই হাসপাতালের প্রাচীরের বাইরে কোনো প্র্যাকটিস নেই। পরের মাস কীভাবে চলবে, তাই ভাবছি। ছেলের স্কুলের মাইনেইবা, কীভাবে দেব তাই ভাবছি। চেনা-জানা সবাইকেই বলছি যে, আমার শেখা কাজ যদি কারও কাজে লাগে, তাহলে যেন আমার কাছে পাঠিয়ে দেন। হঠাৎ মেডিকেল কলেজেরই এক দাদার ফোন।
-একটা পেশেন্ট দেখে দিতে পারবি? গরীব পেশেন্ট। হয়তো ফিজ দিতে পারবে না।
-নিশ্চয়ই, কোথায় যেতে হবে?
গিয়ে দেখি, সাধারণ হসপিটালে কোনোভাবে ভর্তি হয়ে আছে মেয়েটি। তলপেটে দু’টো বড় বড় টিউমার। কেমো চলছে। কিছুদিনের মধ্যে, কেমোতে কাজ করলে সার্জারি করার দরকার হবে।
প্রেসক্রিপশন লেখার পরে ওনাদের মুখ দেখেই বুঝতে পারলাম, ফিজ দেওয়া সম্ভব না ওনাদের। মেয়েটি মুর্শিদাবাদের অত্যন্ত দুস্থ পরিবারের। এখানে এসে ট্রিটমেন্ট নিচ্ছে।
ওয়ার্ড থেকে বেড়বার সময় মেয়ের মা হাতজোড় করে বললেন,
-অনেক ধন্যবাদ ডাক্তারবাবু। আপনি সময় নিয়ে দেখলেন মেয়েকে…
জানতে চাইলেন, মেয়ে ভালো হবে তো? আমি বললাম, যে ধরনের টিউমার হয়েছে তাতে, ট্রিটমেন্ট করলে আশা করি ভালো ফল হবে।
বছরখানেক বা তার বেশীই কেটে গেছে তারপর। আমি সল্টলেকের একটা চেম্বারে পেশেন্ট দেখছি। ঠা-ঠা গরম দুপুর। রিসেপশনের কাবেরি দি এসে বললেন, স্যার আপনার সঙ্গে একজন দেখা করতে এসেছেন।
বললাম, ভিতরে নিয়ে আসুন!
-স্যার উনি অনেকক্ষণ হল বসে আছেন। বলছেন, ভিতরে ঢুকবেন না। আপনার কাজ শেষ হলে, বাইরেই দেখা করবেন।
দেখি, মলিন-বস্ত্রে এক ভদ্রমহিলা বসে রয়েছেন চেম্বারে সিঁড়িতে। আমাকে দেখেই ত্রস্ত হয়ে উঠে দাঁড়ালেন।
-ডাক্তার বাবু কেমন আছেন?
এমনভাবে বললেন, যেন অনেক দিনের চেনা।
আমি তাকে নমস্কার জানাই। তবে আমার হাতজোড় হলেও, চোখ খুঁজে যাচ্ছে ওনার পরিচয়।
-ডাক্তারবাবু, সেদিন আপনার ফিজটা দেওয়া হয়নি, আজ নিয়ে এসেছি।
ক্ষণিকে মনে পড়ে গেল সেই মেয়ে, তার টিউমার আর মায়ের কথা। এতো সেই মেয়েটির মা!
প্লাস্টিকে মোড়া কতগুলো গুটলি পাকানো, ১০ টাকা ২০ টাকার নোট আর ঝুলে থাকা কিছু খুচরো আমার দিকে বাড়িয়ে দিলেন।
-মেয়ে কেমন আছে? এটা কী? জিজ্ঞেস করি আমি।
-মেয়ে এখন অনেকটাই ভালো ডাক্তারবাবু কিন্তু, তখন তো আপনার কাছে ফিজ দিতে পারিনি তাই, আজ নিয়ে এসেছি।
আমি মাথা নেড়ে না না বলে উঠতেই, উনি খুব কাতর হয়ে আমার দিকে তাকালেন।
-ডাক্তারবাবু এতদূর থেকে এসেছি, আপনি নেবেন না? ধান কাটার পরেই মজুরি থেকে টাকাটা সরিয়ে রেখেছিলাম। কিন্তু, আপনাকে খুঁজে পাচ্ছিলাম না। শেষে, আমাদের ওখানে কলকাতার এক ডাক্তারবাবু যান। ওনার থেকে জেনে আপনার চেম্বারে চলে এসেছি, খুঁজে খুঁজে। তাও ভুল বাসে উঠে গতকাল আপিস পাড়ায় চলে গেছিলাম। আজ এসেছি।
কথায় মুর্শিদাবাদি টান
-আপনি অল্প কিছু দিন, বাকিটা মেয়ের চিকিৎসায় কাজে আসবে। আপনি ভেতরে এসে বসুন।
প্লাস্টিকের মোড়ক নামছে না।
এটা আপনার ডাক্তারবাবু, আমি নিয়ে এসেছি। হাওড়া কোন বাস যাবে এখান থেকে?
উল্টো দিকে, রিসেপশনিস্ট কাবেরি দি আমার দিকে রক্তচক্ষু! ইশারা করলেন নিয়ে নিন।
আর কথা না বাড়িয়ে নিয়ে নেই প্লাস্টিক। স্তব্ধহীন আমি।
-আসি স্যার, ভালো থাকবেন!
অস্ফুট স্বরে বললাম,
-আপনিও ভালো থাকবেন
কাঁধের ব্যাগ তুলে বেড়িয়ে যান উনি।
-হাওড়া যাবে ২১৫ এ , চলুন আমি উঠিয়ে দিয়ে আসি আপনাকে, ওনার পিছু পিছু যেতে যেতে বলেন কাবেরি দি। আবার না, ভুল বাসে উঠে পড়েন!
আমি পকেট থেকে বাস-ট্রেনের ভাড়ার টাকাটা দিতে চাই কাবেরি দি কে!
কাবেরি দি ঝাঁঝিয়ে বলে আমাকে,
-রাখুন তো! এটা ওনার আত্মসম্মান! আপনি কি বুঝবেন!
টাকার বিনিময় মূল্য তো এক। তবু কিছু নোট বোধহয় আলাদা ভাবে গর্বিত বোধ করে যে তাকে ব্যবহার করেছে, তার জীবনবোধের মূল্যে।
Sear tools: Inspiration Diary Private Hospital Prescription Proud Of The Cost of Life Value Pride Fees|


