নিজের যত্ন নিন
যেটা সত্যি সেটা হল আপনি ডাক্তার হন, কি পেশেন্ট, নিজের দিকে সময় দেওয়ার সময় এসেছে।
সবে আউটডোরে এসে বসছি তখন আমার সামনে রাজকন্যা।
না আছে তার রাজ্য, না আছে কোন রাজপুত্তুর, না আছে মণিমানিক্য চন্দ্রহার, না আছে সিন্দুক ভর্তি হীরে জহরত।
এ এমন রাজকন্যা সে কাজ করে মাল্টিন্যাশনাল কর্পোরেট অফিসে, যার অর্ধেক কাজ হয় অফিসে আর বাকি অর্ধেক পার্সোনাল টাইমে।
নিজের টাইমে কেন অফিসের কাজ করব এ কথা বলতে গেলেই শুনতে হবে গরম লাগে তো তিব্বতে গেলেই পারো।
ভারতবর্ষের মানব সম্পদ এতটাই আশ্চর্য করে দেওয়ার মত যেখানে চাকরির চেয়ারের সংখ্যা কম। চেয়ারে বসার লোকের অভাব নেই।
এ এমনই রাজকন্যা যার নিজের অপারেশন করতে গেলেও নিজের বৃদ্ধ বাবা, মাকে হাসপাতালে ভর্তি করে রেখে তারপর নিজে এসে নিজের প্রয়োজনে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।
তার নেই কোন সেপাই, সামন্ত, নেই করো এডমায়রাদের দল, যারা ইচ্ছে করলেই কোন উইকএন্ড ব্রেকে ঘুরিয়ে নিয়ে আসতে পারে রাজকন্যাকে। তবু সে রাজকন্যা তার বাবা-মায়ের কাছে আর আমার কাছেও কারণ তার নামটাই রাজকন্যা গাঙ্গুলি ।বুঝতে অসুবিধা হয় না বাবা, মা কত ভালোবেসে তাদের মেয়ের নাম রেখেছিলেন রাজকন্যা।
ইউটেরাস আর তার টিউমারকে আকাশের তারা করে দিতে হয়েছে হঠাৎ করেই।
সেটা না হলে রাজকন্যাই হয়ে যাচ্ছিল আকাশের তারা তা সেই রাজকন্যা আমার সামনে চেয়ারে বসে এই ধরাধামেই রাজকন্যার ইউটেরাস কে মহাসিন্ধুর ওপারে পাঠিয়ে দিয়েছি বহুদিন।
তবুও এখন তো তার ফলোআপে আসার কথা নয়, খানিকটা সৌজন্য আলাপ তারপর, খানিকটা মাথাব্যথা, গায়ে ব্যথা, সকালে ইদানিং কেমন কুয়াশা পড়ছে, সে নিয়ে দু'দন্ড কথা বলার পরেই চোখে নামলো চেরাপুঞ্জি।
🌈মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জিতে বছরে কত মিলিমিটার বৃষ্টি হয় সে কথা না বলতে পারার জন্য এক সময়ে প্রচুর তিরস্কার জুটেছে ভূগোলের টিচার লস্কর বাবুর হাতে।
এখনো বলতে পারি এখনো বলতে পারি না চেরাপুঞ্জি তে কত মিলিমিটার ঠিক বৃষ্টি হয়। কিন্তু রাজকন্যার চোখ দেখে বুঝতে পারি সেখানে বৃষ্টি, বন্যা, বজ্রপাত, সবই মিলেমিশে একাকার হয়ে রয়েছে। এই বন্যাটা ম্যানমেড, না মন মেড সেইটা ভাবার চেষ্টা করছি।
কয়েক বছর আগের ইউটেরাস সার্জারি সাথে কান্নার কি যোগাযোগ আছে আমার মন খুজে যাচ্ছে সেই সূত্র।
খান দু এক টিস্যু, এক গ্লাস জল, আর ঘড়ির কাঁটা মিনিট 25 পেরিয়ে যাওয়ার পরে বোঝা গেল রাজকন্যা এখন বন্দী।
সেই কারাগারে নেই কোন গরাদ নেই কোন দেওয়ালি, সে জেলখানা শুধু গলার কাছে দলা পাকিয়ে আসা একটা অস্পষ্ট কষ্ট। বয়সের কারণেই রাজকন্যার বাবা আর মা এখন প্রায় শয্যাশায়ী। এ দুজনেরই দেখভাল করতে হচ্ছে রাজকন্যাকে। সাউথ কলকাতার সুন্দর সাজানো গোছানো ফ্ল্যাটে রাজকন্যা আর তার বাবা মা।
এই চিত্রনাট্যে কোন গ্লানি নেই, ছেলে মেয়ে বয়স হলে বাবা-মাকে দেখবে এটাই তোর সামাজিক আকাঙ্খার চিত্রনাট্য । ছোটবেলা থেকেই শেখানো হয় বাবা-মাকে তাদের অসত্যসময়ে দেখভাল করার সামাজিক এই আকাঙ্ক্ষার চাদরে ঢাকা পড়ে থাকে রাজকন্যার পায়ে লাগানো অদৃশ্য শিকল।
🤔বাবা মায়ের দুজনেই এখন খানিকটা স্মৃতি বিভ্রম হয়েছে, আধুনিক বিজ্ঞান যার নাম দিয়েছে ডেমেনশিয়া। এতে মানসিকতার পরিবর্তন হয়, পরিবর্তন হয় ব্যক্তিত্বের, অভিমানের মাত্রাটা বেড়ে যায় অনেক বেশি। যাতে আমরা বাঙালিরা নাম দিয়েছি অবুঝ
আয়া রেখে দিলে সে দুদিনের বেশি থাকতে চায় না, তার রাজকন্যার বৃদ্ধ বাবা মায়ের সাথে আয়ার এতটাই গন্ডগোল বেধে যায় যে মনে হয় বাবা-মা বোধহয় ইচ্ছা করেই আয়াতে সহ্য করতে পারছে না ।
জয়নগর থেকে মাসি এসেছিল সে টিকে ছিল সর্বাধিক পনের দিন তারপর সেই যে সে মোয়া আনবে বলে বাড়িতে গেল আর ফিরল না।
অগত্যা আমাদের রাজকন্যা বাবা মায়ের জন্য সকালবেলা ওটস এর ব্রেকফাস্ট, থেকে শুরু করে রাতের রুটি তরকারি, সবটুকুই একা হাতে করে। না রান্না নিজেকে করতে হয় না কিন্তু রাজকন্যা না থাকলে বাবা-মা কিছুতেই মুখে খাবেন না।
বর্ষা,বৃষ্টির মত রাজকন্যা চোখ দিয়ে বৃষ্টির জল খানিকটা কমেছে কিন্তু আবহাওয়া তখনও থমথমে এই বুঝি আবার ঝমঝমিয়ে নামলো।
কি চান আপনি রাজকন্যা?
জিজ্ঞাসা করি আমি, একটু বেড়াতে, নানা ৭ দিনের হলিডে দরকার নেই, ডান হাতে দুটো আঙ্গুল victor sign এর মতো করে দেখায় দুদিন। তারপর আস্তে আস্তে হাতের মধ্যমাটা নেমে যায়, শুধু জেগে থাকি হাতের তর্জনীটা।
বা একদিন একটু আকাশ দেখতে চাই, একটু সমুদ্র বা নিদেন পক্ষে একটা পাহাড়, টিলা বা একটা ঢিবিও চলবে। একটু চেঞ্জ দরকার। আর পারছি না গলাটা ধরে আসে।আমাদের রাজকন্যার ব্যাংক ব্যালেন্সের অসুবিধা নেই, অফিসের ছুটির সমস্যা নেই, দু পা বেরিয়ে পড়ার টিকিটের অভাব নেই, বেড়াতে যাবার জায়গার অভাব নেই, পায়ের এই অদৃশ্য শিকল তাকে বন্দী করে রেখেছে কয়েক বছর। ভারত সাবালক হচ্ছে মেয়েদের ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ টিভির জনপ্রিয় রিয়েলটি শো, বা ইলেকশন ইস্তেহার যাই বলুক না কেন প্রতিদিন এক ইঞ্চি করে পরিণত হচ্ছে ভারত বর্ষ।
একটা বড় সংখ্যার মানুষজন হয়ে যাচ্ছেন বৃদ্ধ আর তাদেরকে দেখভাল করতে হচ্ছে অপেক্ষাকৃত নবীন যুগের তাদের সন্তানকে। যাকে এতদিন স্কুল, কলেজ, পলিটিক্স, পেরিয়ে নিজেকে প্রমাণ করতেই সময় দিতে হয়েছে বেশ কয়েক দশক।
তারপর যখনই সে মনে করল এইবার একটু টাকা পয়সার মুখ দেখেছি, এবার একটু ডানা মেলে উড়তে বেরোবো। তখনই পায়ে কামড়ে বসে এই অদৃশ্য শিকল।
😥জীবনের শখ, আহ্লাদ, দিনের পর দিন, বছরের পর বছর, একটু একটু করে পিছিয়ে যখন সে জীবনের স্বাদটাকে একটু নিতে চায় তখন পায়ে আটকে ধরে এই অদৃশ্য শিকল।
নতুন যুগের বৃদ্ধ-বৃদ্ধা বাবা মা এবং নতুন যুগের এই মাঝবয়সী তরুণ তরুণী দুজনেই তৃষ্ণার্ত তাদের কোয়ালিটি অফ লাইফের জন্য।
এরকম বাবা, মাই একদিন হাইপারফর্মার ছিলেন, আজ তারা বয়েসের ধারে ঝুকে গেলেও তাদের পার্সোনালিটি এখনো আগের মতোই তীক্ষ্ণ। কখনো কখনো তা সুতীব্র,
এককালে তারা নিজেদের অফিস, স্কুল বা ঘর কন্যার কাজ করে এসেছেন দাপিয়ে। বয়সের ভারে তারা নিজেরা গৃহবন্দী।
🌈সব ঠিক হয়ে যাবে, এই তো আমি ঘুরে আসছি, এই ধরনের কথাবার্তা তে তাদের চিড়ে ভেজে না।
কোনটা আলগা প্রতিশ্রুতি, আর কোনটা বাস্তব, সে নিয়ে তাদের আর টুপি পড়ানো সম্ভব নয়। নতুন যুগের বাবা, মা এখন ঘরে ঘরে। নতুন যুগের এই রাজপুত্র রাজকন্যারাও এখন ঘরে ঘরে।
তবুও এই বাবা মায়েদের এখন কারো হয়ত ডেমেনশিয়া, কারো ডায়াবেটিস, কারুর স্থূলতা, কারুর হাটের ব্যামো, কারো বা ক্যান্সার, চিকিৎসা বিজ্ঞানের অগ্রগতি হচ্ছে তারা বেঁচে থাকছেন আরো দীর্ঘদিন ধরে। সে তো ভালই বিজয়া ন ববর্ষের দিনগুলোতেই যখন প্রণাম করার মানুষ ফুরিয়ে যাবে সে দিনগুলোও তো ভালো নয়।
কিন্তু এই সমস্ত মানুষকে দেখভাল করতে হচ্ছে আজকের রাজকন্যাদের তাই বিজ্ঞান ও বারবার মনে করিয়ে দিচ্ছে বাবা-মায়ের দিকে নজর দেওয়ার সাথে সাথে রাজকন্যারা যেন নিজের দিকেও নজর দেন জীবনের ছোট ছোট আনন্দ গুলো যেন হারিয়ে না যায়। বিজ্ঞান এর নাম দিয়েছে কেয়ার অফ কেয়ারার্স।
যারা যত্ন নেন তাদেরও যে যত্ন আত্মির দরকার হয় বিজ্ঞান এখন এ ব্যাপারে সম্পূর্ণ সহমত।
দিস্তা দিস্তা কাগজ উড়িয়ে, হাজার হাজার আর্টিকেল জার্নালে ছাপা হচ্ছে এই নতুন যুগের দাবি কেয়ার অফ কেয়ারার্স।
এই রাজকন্যারা যদি নিজেদের দিকে খেয়াল না দেন, নিজেদের অফিস না করেন তাহলে একদিন এই বৃদ্ধ বাবা মায়েদের দেখভাল করা মুশকিল হয়ে যাবে।
তবে সবটুকু রোজগার তো আর রুটি কেনার জন্য নয়। অল্প হলেও একটু টাকা বাঁচিয়ে কখনো ফুল কিনতে মন চায়। রাজকন্যারা যদি এই ফুল না কেনেন, একটু আকাশ না দেখেন, তাহলে বেজায় বিপদ। অথচ এই সময়ে বৃদ্ধ বাবা মাকে বাড়িতে রেখে হলিডেতে যাওয়া ভারতীয় সমাজের চোখে এক অমার্জনীয় অপরাধ।
🩺কিন্তু না নতুন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে হবে নতুন যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চলা শুধুমাত্র মোবাইল, কম্পিউটার বা মলে, গিয়ে বাজার করা নয়।
নতুন যুগের সাথে পা মিলিয়ে চলতে গেলে স্বীকার করতে হবে চরম বাস্তবকে। যেখানে সমাজ হৈ হৈ করে বলে উঠবে এই মেয়েটা কি স্বার্থপর সেখানেও নিজের মানসিক সুস্থতার তাগিদে এই রাজকন্যাদের শরীর মনকে সবসময় ভালো রাখতে হবে।
কিভাবে তারা এই নিয়ে নিজেদের ভালো রাখবেন সে নিয়ে আমরাও রিসার্চ করে আর্টিকেল রেখেছি, ভিডিও করেছি, কিন্তু সময় পেলে সেটা পড়ে নেবেন বা দেখে নেবেন। কিন্তু যেটা সত্যি সেটা হল আপনি ডাক্তার হন, কি পেশেন্ট, নিজের দিকে সময় দেওয়ার সময় এসেছে।
অন্যের উপর ভরসা করে নয় নিজে নিজেই একা একাই ভালো থাকতে শিখতে হয়। স্কুল-কলেজ পড়াইনি এ সমস্ত শিক্ষা।
আর পড়াবেই বা কি করে এ নিয়ে রিসার্চ হচ্ছে মাত্র কয়েক বছর ধরে। সে যাই হোক যতটুকু বিজ্ঞান আমাদের হাতে তুলে দিয়েছে ততটুকু শিখেই সাবালক হই আমরা রাজকন্যা রা যেন পায়ের শেকলটাকে দুহাত ছড়িয়ে আকাশের দিকে মুখ তুলে প্রাণ ভরে তাজা অক্সিজেন নিতে পারে কদিন বেড়াতে গিয়ে।
ফিরে আসবে রাজকন্যারা তার বৃদ্ধ বাবা-মায়ের কাছে, কিন্তু নিজের দিকে খেয়াল দিলে তবেই জীবনের বাকি গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো করা সম্ভব।
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.






