দাম
হাসপাতালে অনেক কিছুই ট্রেন কম্পার্টমেন্টের মত। হঠাৎ অগভীর পরিচয়। তারপর স্টেশন এলেই নেমে যাওয়া। হয়তো কোনদিন আর দেখাও হবে না।
-রাখো রাখো! রাখো না ! ব্রাদার এর প্যান্টের পকেটে পেন ঢুকিয়ে দিতে চাইছেন এক তরুণী, নিজের হাতব্যাগ থেকে বের করে।
যা মনে হচ্ছে ব্যাবহার করা ওয়াটারম্যান জাতীয় ফাউন্টেন পেন, চটজলদিতে ব্যাগে যা ছিল তাই।
ব্রাদার ‘না না কি করছেন’ বলে খালি সরে সরে যাচ্ছেন।
নিঃসন্দেহে অস্বস্তিকর পরিবেশ। চোখ ফিরিয়ে নিই। কিন্তু জোরজার চলতেই থাকে।
করোনার ঘোরতর ঘনঘটা চলছে তখন। সবার মুখে মাস্ক। হাসপাতাল থেকে বেরিয়ে গাড়িতে উঠতে যাচ্ছি, পাশে ঠেলায় করে কমলালেবু, আপেল, আতা। বেশ আকর্ষণীয় ফলগুলো। তাই ক’টা কিনে নিয়ে যাবার জন্য ফলওয়ালার কাছে দাঁড়িয়েছি। ব্রাদারও বোধকরি ডিউটি শেষ করে বাড়ি যাবার পথে, আপেল-আতার আকর্ষণে ঠেলার সামনে।
আজকাল হাসপাতালে সিস্টারদের সাথে সাথে ব্রাদাররাও নার্সের ভূমিকায় উল্লেখযোগ্য । ব্রাদারকে আমি ভালোই চিনি। মার্জিত ভদ্র স্বভাবের। বেশ পড়াশুনো করছে। চান্স পেলেই MSc নার্সিং পড়ে রিসার্চের লাইনে যাবার ইচ্ছে।
এদিকে ফলের ঠেলা-গাড়ির সামনে, মাঝ রাস্তায় হোন্ডা সিটি গাড়ি থেকে আচমকা নেমে পড়েছেন তরুণী। মনে হচ্ছে ব্রাদারকে টার্গেট করেই। দুজনের মুখেই মাস্ক।
আতার ঠেলাগাড়ির চারদিকে ঘুরে যাচ্ছে ব্রাদার, পেছনে ধাবিত কলম দিতে উদ্যত তরুণী।
আর চোখ ফিরিয়ে রাখা গেল না।
ব্রাদারের কাতর ডাক আমার দিকে -ও স্যার দেখুন
… -উনি কি করবেন ! আমাকে দেখিয়ে বলেন তরুণী, হাঁফাতে, হাঁফাতে।
-আপনার কিছু ভুল হচ্ছে, এই দেখুন, মাস্ক নামিয়ে জোর হাতে ব্রাদারের উক্তি হোন্ডা সিটিকে, আমি আপনাকে চিনিই না।
-আপনাকে আমি কিন্তু চিনি, ঠিক ধরেছি, মাস্ক থাকলেও আমি চিনতে পারবো। তরুণী এবার কাতর, কতদিন হাসপাতালে এসে খোঁজ করেছি আপনার। নাম জানিনা বলে খোঁজ পাইনি।
ব্রাদার এখনও প্রবল অস্বস্তিতে।
রাস্তা জুড়ে বাঁকা করে রাখা হোন্ডা গাড়ির পাশ কাটিয়ে একটা মারুতি বেরোবার চেষ্টা করছে। পারছে না, তবু হর্ন দিচ্ছে না। মারুতির ড্রাইভার কাঁচ নামিয়ে পথনাটিকা দেখতে ব্যাস্ত।
-আমার যখন করোনা হল, তখন তুমি আমাকে খাইয়ে দিতে মনে আছে? ICU ছ'নম্বর বেড। জ্বরের ঘোরে বাড়িতে পড়ে গিয়ে কপালে কালশিটে হয়ে গিয়েছিল। সেন্স ছিলনা তখন আমার। বিছানায় হিসু পটি করছিলাম। পরে নরমাল ওয়ার্ডে গিয়ে বাড়ি চলে এসেছি সুস্থ হয়ে। তুমি যা করেছিলে সে সময়ে, কোনদিন ভুলব না। এক নিশ্বাসে বলেন তরুণী।
ব্রাদারের চোখে এবার খুশির ঝিলিক। তবু চেহারায় প্রশ্নের ছাপ।
-চিনতে পারছ না তো ? মাস্ক নামিয়ে দিয়েছেন তরুণী এবার।
-ওহ আপনি ? কেমন আছেন এখন, আমি তো চিনতেই পারিনি, সরি - আপ্লুত হয়ে ব্রাদার বলেন।
-এই তো দেখুন একদম ফিট, আপনার নাম বললে আমি পরে আপনাকে ফ্রেশ পেন দিয়ে যাব, নইলে এটাই রাখতে হবে। শুনবই না ।
এবার আমার চোখ দরদাম করে ফলওয়ালার সাথে।
-আতা কত ?
-দু' শ
-দু' শ !! এতো দাম ? চোখ কপালে আমার!
-দেখুন, এমন জিনিষ পাবেন না।
মানি ব্যাগ বার করে খানিকটা নেব কিনা ভাবছি, সত্যিই ভালো ফলগুলো।
তবে, মনটা তখন অন্য আবেশে ভরে আছে আমার। জানিনা, ব্রাদার পেনটা নিলেন কিনা। জানার দরকারও তেমন নেই। সংসার চালাতে টাকার দরকার সবার, কিন্তু জীবনের অনেক ভালো জিনিষগুলোর প্রাইস ট্যাগ হয় না।
হাসপাতালে অনেক কিছুই ট্রেন কম্পার্টমেন্টের মত। হঠাৎ অগভীর পরিচয়। মৃত্যুর সাথে লড়াইয়ের কটা দিন একসাথে সবাই। তারপর স্টেশন এলেই নেমে যাওয়া। হয়তো কোনদিন আর দেখাও হবে না। তা না হোক ।
সর্বে সন্তু নিরাময়া।
যেটা স্মৃতি টা থেকে যায় সেটা ‘ব্যবহার’ ।
How you made me feel like. টেবিলের এপার-ওপার প্রতিটি মানুষের জন্যই সত্যি। তখন আমি পেশেন্ট, নার্স বা ডাক্তার, যেই হই।
গাড়িতে উঠে পেছনের আয়নায় দেখি হোন্ডা সিটি স্টার্ট দিয়েছে। ব্রাদার হাত নেড়ে হাসিমুখে নিজের গন্তব্যে..
“Everyone you meet is fighting a battle you know nothing about. Be kind. Always.” ― Brad Meltzer
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.






