হাঁটা
কার্ডিফের খুব কাছেই একটা ছোট্ট সাজানো গোছানো শহর নাম তার কারফিলি। বিনিপয়সায় হাসপাতালের বিল কমানোর উপায় জানা গেলো সেইখানে
জীবনে অনেক কিছুতে আফসোস থেকে যায়। সেটা আর মেটে না।
কার্ডিফের খুব কাছেই একটা ছোট্ট সাজানো গোছানো শহর, তার নাম কারফিলি। তখন, ২০১৩ সাল।
ইংল্যান্ড থেকে ফেরার আগে, কিছু কাজ সারতে গিয়েছিলাম কার্ডিফ ইউনিভার্সিটিতে। কাছেই কারফিলি। বন্ধুদের কাছ থেকে শুনে সেখানে গেলাম। ছোট্ট দু’টো প্ল্যাটফর্মের ঘুমন্ত ট্রেন স্টেশন। সেখান থেকে অল্প কিছু দূরে ছবির মত সাজানো গোছানো পুরোনো দিনের এক ক্যাসেল। খানিকটা অংশ বেশ ভালো রয়েছে ঠিকই, কিন্তু খানিকটা অংশ ভেঙে গেছে। বেশ খানিকটা হাঁটতে হাঁটতে পৌঁছে গেলাম। ছেলে তখন আমার ছোট। তাকে নেওয়া হয়েছে প্র্যামে। সারাদিন ঘুরে ঘুরে ক্লান্ত হয়ে হাতে বানানো স্যান্ডউইচ, সুস্বাদু স্যালাড আর বড় এক পেয়ালা কফি খেয়ে ফিরে এসেছিলাম, কার্ডিফে।
কিন্তু আফসোস থেকে যায় এই কারণে যে, সেদিন জানতাম না যে কারফিলিতে কী ধরনের এক যুগান্তকারী গবেষণা হয়ে চলেছে। ঠিক সেই সময়ে।
তাহলে নিশ্চয়ই, সেই গবেষণা যারা করছেন, সেই প্রফেসর এবং তার পেশেন্টদের সঙ্গে একবার দেখা করে আসতাম। ২০১৩ র শেষের দিকে ক্রিসমাসের জাস্ট কয়েক সপ্তাহ আগে পিটার এলউডের গবেষণাপত্রে প্রকাশ পেল যে, হাঁটা মানুষের জন্য কতখানি উপকারী। বেশীক্ষণও নয়, কিছু না পারলে দৈনিক মাত্র ৩০ মিনিট করে হাঁটা।
হাঁটা। মানুষের নানা রকম অসুখের প্রবণতা কমিয়ে দিচ্ছে। বাড়িয়ে তুলছে আয়ু। হাসপাতালের বিল কমে যাচ্ছে। প্রায় হাজার দুয়েক ভলেন্টিয়ার্সদের ওপরে গবেষণা হয়েছিল এই কারফিলিতে।
তারও আর কিছু বছর পরে প্রফেসর হিলের গবেষণায় জানা গেল যে, নিয়মিত হাঁটলে ব্রেন থেকে তৈরি হচ্ছে ব্রেন ডিরাইভড নিউরোট্রফিক ফ্যাক্টর বা BDNF।
BDNF করে কী?
আপনারা হয়তো জেনে থাকবেন, মানুষের মাথার কোষগুলো কোষ-বিভাজন করতে পারেনা। যে কটা কোষ নিয়ে জীবন শুরু হয়েছে, মৃত্যু পর্যন্ত সেই কটা মাত্রই কোষ।
তাহলে কী করে একজন ডারউইন বা জগদীশ চন্দ্র বোসের মত গবেষক, সারা পৃথিবী বিখ্যাত হয়েছেন? আর কেনই বা আমরা তাঁদের উচ্চতায় পৌঁছানোর কথা স্বপ্নেও চিন্তা করতে পারি না?
তফাৎ এক জায়গাতেই। মানুষের ব্রেনকে কীভাবে আমরা ব্যবহার করেছি ছোটবেলা থেকে।
গবেষণায় প্রকাশ পাচ্ছে, এই চার অক্ষরের এই কেমিক্যাল মানুষের ব্রেনকে, নানা রকম ভাবে পরিপুষ্ট করে তোলে এবং ভবিষ্যতে ভালো সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। কিন্তু কী করেই বা হাঁটার সঙ্গে এই ব্রেন-কেমিক্যালের এরকম সম্পর্ক তৈরি হল, তার জন্য খোঁজ চললো।
রয়াল সোসাইটিতে প্রকাশিত এক গবেষণাপত্রে জানা গেল, এর সূত্র লুকিয়ে আছে কয়েক লক্ষ বছর আগেকার আমাদের পূর্বপুরুষের হাবে, ভাবে,আচরণে।
শোনা যায়, আমাদের যেসমস্ত পূর্বপুরুষেরা ভালো হাঁটতে পারতেন, তাদের মনে রাখার ক্ষমতা ছিল ভালো। সারাদিন খাদ্য আহরণের শেষে, তারা রাত্রে ভালো পথ মনে রেখে বাড়িতে ফিরতে পারতেন। সাথে নিয়ে আসতেন কোথায় খাবার-দাবার আছে, তার স্মৃতি আর পরদিন সেখানে পৌঁছবার পথ-নির্দেশ। যাতে পরদিন তিনি নিজে বা তার গোষ্ঠীর অন্য কেউ গিয়ে সেখান থেকে আবার সুস্বাদু খাবার আহরণ করে নিয়ে আসতে পারে।
আমরা বেশীরভাগই এইসব মানুষেরই বংশধর।
আর যে সমস্ত মানুষজন অতটা ভালো হাঁটতে পারতেন না, তারা মনে রাখতে পারতেন না যে খাবার কোথায়? সেটা খুঁজে পেতেন না, তারা পথ ভুলে হারিয়ে যেতেন রাত্রে। তারপর নিজেরাই রাতের গভীর অন্ধকারে খাদ্যে পরিণত হতেন হিংস্র জন্তু জানোয়ারের। বুঝতেই পারছেন, তাদের বংশ লোপ পেয়ে গেছে। আমরা এদের বংশধর নই।
শিল্প বিপ্লবের পর থেকে আস্তে গাড়ি, ঘোড়ার ওপর আমাদের নির্ভরশীলতা গিয়েছে বেড়ে। আমরা এখন সারাদিন চেয়ার টেবিলে বসে নানা রকম কঠিন সিদ্ধান্ত নিয়ে, হাঁপাতে হাঁপাতে বাড়ি ফিরে মনে করি যে, অনেকটা কাজ করে ফেললাম।
কিন্তু আমাদের এই ক্লান্তির সিংহভাগটাই স্ট্রেস থেকে, শরীরচর্চার থেকে নয়। তার জন্য এই স্ট্রেসের সাথে যুদ্ধ করতে করতে আমাদের মস্তিষ্ক হয়ে পড়ছে ক্লান্ত। BDNF-এর পরিমাণ কমে যাচ্ছে।
দিনের পর দিন আমরা, আরও কম ঠিক সিদ্ধান্ত নিচ্ছি। জিনিসপত্র মনে রাখতে পারছি কম। ভালো কাজ করার বদলে বেশী সময় আয়াস করছি। দরকারের থেকে বেশী খাচ্ছি। ডায়াবেটিস, ব্লাড প্রেসার, ক্যান্সার, ডেমেনশিয়া এই ধরনের অসুখে আক্রান্ত হচ্ছি, আরও বেশী করে।
তাহলে উপায়?
যদি উপায় থাকে তাহলে একটু অ্যারোবিক্স করুন। একটু ভালো করে এক্সারসাইজ করুন। আর যদি হাঁটুতে বা মনে সেটা না দেয়, তাহলে হাঁটু পালটান আর মনকে সাবালক করুন। নইলে, না হেঁটে যে জীবন পাবেন, সে জীবন হয়তো আমি, আপনি কেউই চাইনা।
এইবার প্রশ্ন হল কতখানি হাঁটবো? জাপানের এক তথ্যসূত্র থেকে জানা যায়, আমাদের দৈনিক দশহাজার স্টেপ হাঁটা জরুরী। কিন্তু তলিয়ে দেখলে বোঝা যাবে, এই রেকমেন্ডেশন কিন্তু কোনো গবেষণাপত্র থেকে আসেনি। ওখানকার একটি কোম্পানি যারা হাঁটা মনিটরিং করার মেশিন বিক্রি করেন, তাদের বিজ্ঞাপনের কথা থেকে এসেছে।
সুতরাং, এটা ভুল যে ১০,০০০ স্টেপ যদি দৈনিক না হাঁটা যায়, তাহলে হাঁটার কোনো সুফলই আমরা পাবো না। যতটুকু হাঁটবেন, ততটুকুই সম্পদ। কিন্তু নিয়মিত হাঁটুন। নিয়মিত হাঁটলে শরীর তো ভালো থাকবেই, তার সাথে ভালো থাকবে আমাদের মন এবং মস্তিষ্ক।
নিয়মিত হাঁটলে হার্টের সাপ্লাই দেওয়া, রক্তবাহগুলোর মধ্যে অলিগলি আরও খুলে যায়। তার জন্য হঠাৎ কোনো ব্লাড ক্লটে বড় রাস্তা বন্ধ হয়ে গেলেও, বাকি হার্টটা ঠিক গলিপথ দিয়ে খাবার আনিয়ে বেঁচে থাকে। একে বলে collaterals। নিয়মিত ব্যায়াম বা হাঁটাচলার জন্য আমাদের শরীরের মেটাবলিজমও নিয়ন্ত্রিত হয় এবং তার জন্য কমে আসে নানা রকম ভয়াবহ অসুখের সমস্যা।
এবার যদি বলেন কখন হাঁটবেন, সে নিয়েও গবেষণা হয়েছে। যেকোনো সময়ই হাঁটলে ভালো। তবে চেষ্টা করুন খাওয়ার আগে বা পরে কোন একটা সময় হাঁটতে। কারণ, আমাদের পূর্বপুরুষরা খাবার নিয়ে আসত আর এসে খাবার তৈরি করে খাওয়ার জন্য, অনেক হাঁটাচলা করতেন। তবে কখন হাঁটবেন অতশত না ভেবে, জাস্ট হাঁটুন।
এই যে কথাগুলো বললাম, এই কথাগুলো একটা নির্দিষ্ট বিজ্ঞানের অংশ। তার নাম evolutionary human neurobiology- বিজ্ঞানের এক নবীন শাখা। আমাদের গুহামানব জীবন এখনও কী করে, অঙ্গুলিহেলন করে যাচ্ছে দৈনিক আমাদের স্বাস্থ্যের!
এর উপরে বেশীরভাগ গবেষণারই, এখনও ১০ বছর পূর্ণ হয়নি। আমরা ফিজিক্স,কেমিস্ট্রি সাবজেক্টের নাম জানি কিন্তু, এই ধরনের নামের সাবজেক্ট এবং রিসার্চের ইতিবৃত্ত আশাকরি খুব শিগগিরই আপনাদের সামনে পত্রপত্রিকা ম্যাগাজিনে, আরও বেশী করে আসতে থাকবে। ততদিন চলুন, আমরা হাঁটতে থাকি।
আজকাল নানা রকম গবেষণা হয়ে চলেছে, ঝড়ের গতিবেগে। এর মধ্যে একটি গবেষণার কথা না বললে আমাদের এই লেখাটা, অসম্পূর্ণ থেকে যাবে। আশি ছুঁই ছুঁই আশি জনের মত মহিলাদের উপর হয়েছিল, এই গবেষণা। যারা কোনোদিনও সে রকম ভাবে এক্সারসাইজ বা হাঁটাচলা করেননি।
তাদের ক্ষেত্রেও দেখা গেল, তাদেরকে মোটিভেট করিয়ে খানিকটা শরীর চর্চা করালে, মাস ছয়েকের মধ্যে তাদের মস্তিষ্কের হিপোক্যাম্পাস বলে একটি অর্গানের অভূতপূর্ব পরিবর্তন লক্ষ্য করা যাচ্ছে, আশি পেরোবার পরও। বয়স হলে মস্তিষ্কের এই হিপোক্যাম্পাস শুকিয়ে আসতে থাকে।
কিন্তু দেখা গেল, নিয়মিত শরীর চর্চা করলে এই হিপোক্যাম্পাস পেতে পারে পুনর্যৌবন। আর ভালো হিপোক্যাম্পাস মানে, ভালো স্মৃতিশক্তি, ভালো সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা। আর তার থেকেও সবচেয়ে বড় কথা, ভালোভাবে বাঁচা।
সুতরাং, আশিতেও আশা রাখতে হলে, শরীরকে খাটা খাটনি করিয়ে মজবুত রাখুন।
আরও পড়তে হলে দেখুন:
কার্ডিফের রিসার্চ
Elwood P, Galante J, Pickering J, Palmer S, Bayer A, et al. (2013) Healthy Lifestyles Reduce the Incidence of Chronic Diseases and Dementia: Evidence from the Caerphilly Cohort Study. PLoS ONE 8(12): e81877. doi:10.1371/journal.pone.0081877
হাঁটার সাথে BDNF
Hill T, Polk JD. BDNF, endurance activity, and mechanisms underlying the evolution of hominin brains. Am J Phys Anthropol. 2019 Jan;168 Suppl 67:47-62. doi: 10.1002/ajpa.23762. Epub 2018 Dec 21. PMID: 30575024.
ইভলিউশনারি নিউরোবায়োলজি
Raichlen DA, Polk JD. Linking brains and brawn: exercise and the evolution of human neurobiology. Proc Biol Sci. 2013 Jan 7;280(1750):20122250. doi: 10.1098/rspb.2012.2250. PMID: 23173208; PMCID: PMC3574441.
হিপোক্যাম্পাস আর হাঁটা
ten Brinke LF, Bolandzadeh N, Nagamatsu LS, Hsu CL, Davis JC, Miran-Khan K, Liu-Ambrose T. Aerobic exercise increases hippocampal volume in older women with probable mild cognitive impairment: a 6-month randomised controlled trial. Br J Sports Med. 2015 Feb;49(4):248-54. doi: 10.1136/bjsports-2013-093184. Epub 2014 Apr 7. PMID: 24711660; PMCID: PMC4508129.
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Inspiration Diary BDNF Stress Exercise Hippocampus Memory Walk Walking Cancer prevention






