অ্যান্টিবায়োটিক কী ? কেন ? কীভাবে?
সাবধানের মার নেই
অ্যান্টিবায়োটিককে নিরাপদে (Safely) এবং কার্যকরভাবে (Effectively) আপনি কিভাবে ব্যবহার করতে পারেন, এই সংকলন আপনাকে সেই সমস্ত তথ্য দেবে।
অ্যান্টিবায়োটিক বিষয়ে বোঝা গুরুত্বপূর্ণ কেন ?
চিকিৎসা বিজ্ঞানে বহু বছরের গবেষণার পরেও বিগত ২০-৩০ বছরের মধ্যে কোনো নতুন ধরনের অ্যান্টিবায়োটিক আবিষ্কার হয়নি। যত দিন যাচ্ছে আমাদের চারপাশের রোগ জীবাণুরা অ্যান্টিবায়োটিক রেসিস্ট্যান্ট হয়ে উঠছে । কিছু সতর্কতা অবলম্বন করলে আপনি নিজেকে এবং সমাজকে এই প্রতিবন্ধকতার হাত থেকে বাঁচাতে পারবেন, যাতে অ্যান্টিবায়োটিক আমাদের নিজেদের প্রয়োজনে ভবিষ্যতেও দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করে যেতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক কী ?
অ্যান্টিবায়োটিক এক ধরনের ওষুধ, যা আপনার জীবানুঘটিত সংক্রমণ (Bacterial Infection) প্রতিরোধ করতে সহায়তা করে। কখনও কখনও অ্যান্টিবায়োটিককে ‘Antibacterial’ এবং ‘Antimicrobials’-ও বলা হয়ে থাকে। তবে ডাক্তারের প্রেসক্রিপশন ছাড়া সাধারণত অ্যান্টিবায়োটিক বিক্রি করা হয় না।
অ্যান্টিবায়োটিক বিভিন্ন ধরনের হয়। রোগীর শরীরের কথা চিন্তা করে অ্যান্টিবায়োটিক লিকুইড, ট্যাবলেট, ক্যাপসুল নাকি ইনজেকশনের মাধ্যমে দেওয়া হবে তা নির্ধারণ করা হয়। যেমন- কোন ছোট বাচ্চা ট্যাবলেট বা ক্যাপসুল গিলতে পারে না। তাই তার ক্ষেত্রে তখন লিকুইড অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার করা উচিত । সাধারণত, যারা গুরুতর সংক্রমণে সংক্রমিত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন তাদেরই ইনজেকশনের মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
ত্বক, কান ও নাক জীবানুঘটিত সংক্রমণ (Bacterial Infection) দ্বারা সংক্রমিত হলে ক্রিম(Cream), মলম (Ointment), লোশন (Lotion) বা ড্রপস্ (Drops) -এর মাধ্যমে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়।
অ্যান্টিবায়োটিক কিন্তু সাধারণত ঠান্ডা (Common Cold), ফ্লু (Flu), কাশি (Cough) অথবা গলা ব্যাথা (Sore Throats) ইত্যাদি ভাইরাস ঘটিত সংক্রমণের জন্য নয়। বেশিরভাগ ভাইরাল ইনফেকশন অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা ছাড়াই ঠিক হয়ে যায়।
সংক্রমণে অ্যান্টিবায়োটিক :-
আপনার সংক্রমণ কীরকম তা বুঝেই, আপনাকে অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করা হয়। আপনার অ্যান্টিবায়োটিকের ডোজ কতদিন ধরে চলবে, তা সংক্রমণের ধরনের উপর নির্ভর করে। অর্থাৎ, সংক্রমণের গুরুত্ব বুঝে আপনাকে ডোজ দেওয়া হয়।
অ্যান্টিবায়োটিকের একটি কোর্স হয়, অর্থাৎ যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনার সংক্রমণ সম্পূর্ণভাবে সেরে উঠছে ততদিন অ্যান্টিবায়োটিকের একটি কোর্স হয়, অর্থাৎ যতক্ষণ না পর্যন্ত আপনার সংক্রমণ সম্পূর্ণভাবে সেরে উঠছে ততদিন পর্যন্ত আপনাকে অ্যান্টিবায়োটিক নিয়মিত নিয়ে যেতে হবে।
আপনাকে ঠিক যে নিয়মে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়েছে , ঠিক সেই নিয়মেই ওষুধ নিতে হবে। না হলে সমস্যা দেখা দিতে পারে। কিছু সময়ে সেই ব্যাকটেরিয়া অ্যান্টিবায়োটিকের প্রতিরোধক (Resistance) পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে। এর অর্থ হল, ভবিষ্যতে সেই অ্যান্টিবায়োটিকটি আর সেই ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করবে না।
সংক্রমণকে কীভাবে প্রতিরোধ (Preventing Infection) করবেন ?
অপারেশনের পর সংক্রমণকে প্রতিরোধ করার জন্য আপনাকে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়া হয়। তবে একে ‘সার্জিক্যাল প্রোফাইলেক্সিস (Surgical Prophylaxis)’ নামেও চেনা যায়। সাধারণত সার্জারির আগে এবং পরে এই ওষুধ দেওয়া হয়।
আপনার রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা (Immune System) যদি দুর্বল হয়, তবে সংক্রমণের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য আপনাকে দীর্ঘ সময় ধরে অ্যান্টিবায়োটিক খেতে হতে পারে।
অ্যান্টিবায়োটিক কীভাবে নেবেন ?
ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টের কাছ থেকে জেনে নিন অ্যান্টিবায়োটিক নেবার সঠিক পদ্ধতি :-
যদি কোন ওষুধে আপনার অ্যালার্জিক হিস্ট্রি থাকে, তবে তাদের বলুন কী ওষুধ কোন সময় নেওয়ার ফলে আপনার অ্যালার্জিক প্রতিক্রিয়া (Allergic Reaction) হয়েছিল।
আপনার লিভার বা কিডনির যদি কোন সমস্যা থাকে সেটিও তাদের বলুন।
আপনি প্রেগন্যান্ট অথবা ব্রেস্ট ফিড করালে সেক্ষেত্রে অতি অবশ্যই তাদের বলুন।
অ্যালকোহল, খাবার অথবা ওষুধের সঙ্গে আপনি যদি নিয়মিত অ্যান্টিবায়োটিক খেতে থাকেন, তবে সেটি ভবিষ্যতে কিছু ক্ষেত্রে পার্শ্ব প্রতিক্রিয়া (Side Effects) হতে পারে। আপনি যদি নিয়মিত কোন ওষুধ নিয়ে থাকেন, এমনকি যদি কোন Herbal Remedies বা Herbal Medicine নিয়মিত নিয়ে থাকেন, তাহলে আপনার ডাক্তার বা ফার্মাসিস্টকে সবটা বলুন।
অ্যান্টিবায়োটিক কখন নেব ?
অ্যান্টিবায়োটিক নেবার কোন নির্দিষ্ট সময় যদি আপনার ডাক্তার বা ফার্মাসিস্ট না দিয়ে থাকেন, তবে আপনি দিনের যেকোন একটি নির্দিষ্ট সময় বাছুন এবং সেই সময়ে অ্যান্টিবায়োটিক নেবার চেষ্টা করুন।
সেই নির্দিষ্ট সময় যদি আপনি অ্যান্টিবায়োটিক নিতে ভুলে যান তবে আপনি ঘড়িতে অ্যালার্ম দিয়ে রাখতে পারেন অথবা আপনার আত্মীয় বা বন্ধু কাউকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য অনুরোধ করতে পারেন।
অ্যান্টিবায়োটিক নেবার পর যদি শরীরে কোন অস্বস্তি লক্ষ্য করেন, তবে আপনি অবশ্যই আপনার ডাক্তার বা নার্সের সঙ্গে এই ব্যাপারে কথা বলুন।
শিশুরা যাতে হাত না পায় সেরকম জায়গায় অ্যান্টিবায়োটিক রাখার চেষ্টা করুন।
আপনার জন্য নির্ধারিত (Prescribed) ওষুধ আপনি আপনার নিকট বন্ধু, পরিবার বা আপনার বাড়ির পোষা প্রাণীদের ভুলেও দেবেন না।
পুরনো হয়ে যাওয়া (Expired) অ্যান্টিবায়োটিক ঘরে রাখবেন না। আপনাকে যদি অনেক অ্যান্টিবায়োটিক প্রেসক্রাইব করা হয়ে থাকে বা কোন নির্দিষ্ট ওষুধের কোর্স শেষ হয়ে গিয়ে থাকে এবং সেই ওষুধগুলি যদি পুরনো হয়ে গিয়ে থাকে, তবে ওষুধগুলি আর ঘরে রাখবেন না। সেগুলি লোকাল ফার্মেসীতে নিরাপদে ফেরত দিয়ে আসুন। যদিও লোকাল ফার্মেসী তার পরিবর্তে আপনাকে কোন অর্থ দেবেন না, কিন্তু সঠিকভাবে সেগুলির ডিসপোজ (Dispose) করার মাধ্যমে ওষুধগুলিকে মাটিতে মেশা থেকে বা কোন শিশু বা পশু-পাখির সংস্পর্শে আসা থেকে রক্ষা করতে পারবে। যার ফলে আমাদের পরিবেশের এবং প্রাণীজগতের ক্ষতির সম্ভাবনা অনেকটাই রোধ করা সম্ভব । সুতরাং, পুরনো হয়ে যাওয়া (Expired) অ্যান্টিবায়োটিকের সঠিকভাবে ডিসপোজ হওয়া অত্যন্ত জরুরী।
Common Side Effects :-
প্রতিটি ওষুধের মতো অ্যান্টিবায়োটিকেরও কিছু পার্শ্ব প্রতিক্রয়া (Side Effects) আছে। সাধারণত, যে সাইড এফেক্টস গুলি খুবই কমন সেগুলি হল- ডায়রিয়া, পেট খারাপ (Upset Stomach), বমি বমি ভাব (Nausea) অথবা বমি (Vomiting)। এছাড়াও আর কী কী সাইড এফেক্টস হতে পারে তার একটি লিস্ট আপনি পেয়ে যাবেন প্রস্তুতকারকের (Manufacturers) ওয়েবসাইটে। সাইড এফেক্টসগুলি থেকে সতর্ক থাকতে আপনি অবশ্যই একবার এই লিস্টে চোখ বুলিয়ে নিতে পারেন।
আপনার যদি নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা হয় বা মাথা ঘোরে, পতন/অবসন্নতা (Collapse) বা ত্বকে কোনো র্যাশ (Rashes) ইত্যাদি দেখা দেয়, তবে সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করুন। এক মুহূর্তও দেরি না করে কাছাকাছি যে সমস্ত জরুরী ব্যবস্থা (Emergency Facility) আছে তাদের সঙ্গে দ্রুত যোগাযোগ করুন।
Antibiotics-এর Allergic Reaction :-
বহু মানুষ মনে করেন অ্যান্টিবায়োটিক নেবার পরেই তাদের শরীরে অ্যালার্জি দেখা দিয়েছে, কিন্তু আদতে তারা হয়তো শুধুমাত্র ওষুধের পার্শ্ব প্রতিক্রিয়ার (Side Effects) শিকার হচ্ছেন, এটিকে কিন্তু অ্যালার্জিক Reaction বলা যায় না।
Allergic Reaction-এর মূল লক্ষণ হল ত্বকে কোনো র্যাশ (Skin Rashes)। আরও গুরুতর Allergic Reaction-এর মধ্যে রয়েছে জিভ এবং মুখ সম্পূর্ণরূপে ফুলে যাওয়া, নিঃশ্বাস নিতে না পারা। এটিকে ‘Anaphylactic Reaction’ বলা হয়। সঠিক সময় চিকিৎসা না করা হলে এটি মৃত্যুর কারণ পর্যন্ত হতে পারে।
আরও একটা সাংঘাতিক এবং বিরল Side Effect হল- ‘স্কিন পিল (Skin Peel)’। এই Side Effect স্টিভেন জনসন সিনড্রোম (Steven-Johnson Syndrome) নামে পরিচিত। দুঃখের বিষয় হল, কোন্ অ্যান্টিবায়োটিকের জন্য কী Side Effects দেখা যাবে তা, আগে থেকে বলা প্রায় অসম্ভব। তবে অ্যান্টিবায়োটিকের জন্য সাংঘাতিক Side Effects কিন্তু একেবারেই বিরল।
যদি আপনার মনে হয় অ্যান্টিবায়োটিক নেবার পর আপনার Allergic Reaction দেখা দিচ্ছে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে ওষুধ খাওয়া বন্ধ করুন। দরকার পড়লে আপনার নিকটস্থ কোনো হাসপাতালেও যোগাযোগ করতে পারেন।
Antibiotic Resistance (প্রতিরোধক) :-
কিছু ব্যাকটেরিয়া রোগীর স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্টিবায়োটিক ট্রিটমেন্টের প্রভাবে দিন দিন প্রতিরোধক হয়ে উঠছে। ফলে, যেসমস্ত ব্যাকটেরিয়াগুলি অ্যান্টিবায়োটিক প্রতিরোধক (Antibiotic Resistance) হয়ে উঠেছে, তাদের থেকে হওয়া সংক্রমণের চিকিৎসা করা ভবিষ্যতে আরও বেশি কঠিন এবং জটিল হয়ে উঠছে।
Resistance Bacteria-এর থেকে আপনার সংক্রমণ হয়েছে কিনা, তা পরীক্ষা করার জন্য ডাক্তার আপনাকে পরামর্শ দিতে পারেন। তারা এই পরীক্ষার রিপোর্ট নিয়ে আলোচনা করে আপনার জন্য উপযুক্ত চিকিৎসা নির্ধারণ করে দিতে পারেন। তারা আপনার অ্যান্টিবায়োটিকের ধরণ পরিবর্তন করে দিতে পারেন বা অ্যান্টিবায়োটিকটি পাল্টেও দিতে পারেন। যদিও এইধরনের পরীক্ষার প্রয়োজন খুব বেশি পড়ে না। আপনার অ্যান্টিবায়োটিক চিকিৎসা সম্পর্কে আপনার যদি মনে আরও কোনো প্রশ্ন থাকে, তবে আপনি আপনার ডাক্তার,নার্স বা ফার্মাসিস্টের সঙ্গে যোগাযোগ করে নিন।
মানুষের শরীর ও মনের চিকিৎসার বিজ্ঞান-ভিত্তি অত্যন্ত জটিল। এখনও সব কিছু আবিষ্কার হয়নি । তাছাড়াও, প্রত্যেক রোগী একে অপরের থেকে আলাদা। তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছা-অনিচ্ছা ও তাঁর অসুখও অন্যের থেকে আলাদা হতে পারে। প্রত্যেকের জন্য আলাদাভাবে এই তথ্যপুস্তিকা লেখা জটিল। সেই কারণেই এবিষয়ে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করুন। আমরা কঠোর ভাবে বিশ্বাস করি যে, কোন সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর মনের সব প্রশ্নের উত্তর দেবার প্রয়োজন। তাই হাসপাতালে নিজেকে ভর্তি করবার আগে ডাঃ মানস চক্রবর্তীকে সব জিজ্ঞেস করে উত্তর নিয়ে নিন। যদি কোনো প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানের কাছে বা ওনার কাছে অজানা থাকে তাও সেটা উনি আপনাদের খোলাখুলি বলবেন। আপনার যদি মনে হয় এই পুস্তিকাতে আরও কিছু তথ্য সংযোজন করা প্রয়োজন তা আমাদের জানান, আমরা আপনার কথা জানতে চাই।
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ দেশ বিদেশের নানা বই ও তথ্যসূত্র, সৌকান্তা ও সঞ্চারী।
Search tools: Antibiotic Side effect Allergic reaction Bacterial Infection Surgical Prophylaxis Immune System Immunity



