Dostarlimab ও বাস্তব
বাবা, পারসেন্টেজের অঙ্কগুলো কি মিথ্যে? যেদিন ডস্টারলিমাবের ক্যান্সার কিওর নিয়ে, মিডিয়া হইচই তার পরদিন আমি মাছ কিনতে গেলাম। কী হল তারপর? সে এক গল্পই বটে !!
কাকো, কালকে কি মাছ কিনতে যাবে ?
রাত ১১ টায়, মোবাইলে রাজ্জাকের ফোন পেয়ে ঘাবড়ে গেলাম। হঠাৎ ফোনে এই প্রশ্ন কেন? রাজ্জাকের সঙ্গে সম্পর্ক আমার বেশ ভালো। ছেলের জ্বর হলে আর আমি হাসপাতালে থাকলে প্যারাসিটামল এনে ছেলের মাকে উদ্ধার করেন তিনিই। অসময়ে হসপিটাল কল এলে, যখন ওলা-উবার ছক্কা হাঁকায় তখন ওর অটোতেই সদর রাস্তায় যাই। ছুটির দিনে মাছও কিনতে যাই, ওর অটো করেই। আজকাল পার্কিংয়ের যা প্রবলেম।
কিন্তু তাই বলে, কাল ‘কাকো’ মাছ কিনবে কি না, সেটা রাত ১১ টায়? ছেলের কাছে প্রায়ই হিসেব দিতে হয়, কেন রাজ্জাক ‘কাকু’ কে ‘কাকো’ বলে?
- - ওটা ভালবাসার ডাক বাবা, ব্যাকরণ মানে না।
ঘুম চোখে খাবি খেয়ে উত্তর দিই,
-হ্যাঁ যাবো এই ৭ টা নাগাদ। তুমি আসবে?
-কালকে দেখা হবে কাকো। হাতে একটু সময় রেখো।
-ঠিক আছে।
কাকু যখন ছেলের হাত ধরে, অটোয় উঠল ততক্ষণ রাজ্জাক পেছনের সিটে জায়গা করে দিয়েছে।
-কাকো তুমি পিছনে বস। হাতের ইশারায় রাজ্জাকের দুই সওয়ারি নির্দ্বিধায় পা মাটিতে না ছুঁইয়ে, অদ্ভুত অ্যাক্রোব্যাটিক্সে সামনের সিটে চালান হয়ে গেল।
আমার আপত্তিতেও কাজ হল না।
অটোয় স্পিড তুলে জব্বর একটা গাড্ডা এড়িয়ে, ডান দিকের রেলিং ডজ করে গুটকার পিকটা হারপুনের মত বাইরে ছুঁড়ে প্রশ্ন করল-
তাহলে কাকো ক্যান্সারের চিকিৎসা বেরিয়ে গেল, বল? আর চিন্তা নেই! ডান দিকের কান চুলকোতে চুলকোতে রাজ্জাকের মোক্ষম প্রশ্ন। চোখ সামনের রাস্তায়। চোয়ালের মাংসপেশি পানমশলা চিবনোর দমকে ফুলছে নামছে। অবিন্যস্ত চুলের জুলপি থেকে ঘাম চুইয়ে নামছে, গালের কাঁচাপাকা খোঁচা দাড়ির ওপর দিয়ে। যা গরম!!
-মানে? জিজ্ঞেস করি?
-এই যে ফেসবুক হোয়াটসঅ্যাপে সমস্ত ঘুরে বেড়াচ্ছে ক্যান্সারের নাকি, ট্রিটমেন্ট বার হয়ে গেছে আর চিন্তা নেই। ক’দিন ধরে তো সবার মুখে এক কথা।
খুব বুঝতে পারলাম, ডস্টারলিমাবের কথা বলছে। এই নিয়েই তো হইচই এখন।
বললাম,
-রেক্টাল ক্যান্সারের একটা ছোট অংশের ওপর গবেষণা হয়েছে। যার ভালো ফল পাওয়া গেছে।
-রেক্টাল ক্যান্সার মানে?
-ওই মলদ্বারের উপরের অংশটা ওই পোটির রাস্তা আর কি!
-ওই তো একই হল, মানে পেটের যা ক্যান্সার সব ঠিক হয়ে যাবে।
অটোয় সব যাত্রীদের জিজ্ঞাস্য চোখ!
-পেট তো অনেক বড়ো জায়গা রাজ্জাক। লিভার, পিলে, পাকস্থলী, প্যানক্রিয়াস, কোলন, কিডনি, প্রোস্টেট আর মহিলা হলে ডিম্বাশয় জরায়ু কত কী আছে! লম্বা লিস্ট।
এই যেমন ধরুন, আপনার বাজার ব্যাগের মত। পাশের ভদ্রলোকের আসন্নপ্রসবা গ্রসারি ব্যাগের দিকে তাকিয়ে বললাম। বিস্কুট থেকে শুরু করে ধুপ কাঠি, কী নেই তাতে।
বাজারের ব্যাগের দিকে তাকিয়ে সবাই এবার, আশ্বস্ত। রাজ্জাকও ডানদিকে আড় চোখে পেছনের সিটের বাজারের ব্যাগ দেখে নিল। সিগন্যালে অটো দাঁড়িয়ে।
-কী ডাল কিনলেন আজ? জিজ্ঞেস করি, আসন্নপ্রসবার মালিককে!
-আজ ভালো বড়ো দানা মুসুর পেয়েছি। একটু ভাঙ্গা, তবে পাঁচফোড়ন আর শুকনো লঙ্কা দিয়ে দারুন লাগবে কাকু।
-পাঁচফোড়ন দিয়ে ছোলার ডাল কিন্তু, ভালো লাগবে না। মুসুর ডালের ফোড়ন ধুপ কাঠিতেও লাগবে না। তেমনই এই নতুন ওষুধে, পেটের মায় শরীরের অন্য ক্যান্সারের চিকিৎসাও হবে না।
জোরে মাথা নড়ে রাজ্জাক আর বাকি সওয়ারিদের।
আজ আমরা এই নতুন ওষুধ ডস্টারলিমাব নিয়ে শোরগোল করছি বটে কিন্তু, গল্পের আসল হিরো হচ্ছে মানুষের শরীরের T cell লিম্ফোসাইট। আমাদের ইমিউনিটির তুরুপের তাস। ২০২০ পেরিয়েও যাঁরা বেঁচে রয়েছি, তা খানিকটা এই T cell লিম্ফোসাইটের হাত ধরেই। আমাদের শরীরের সৈনিক।
সহজ কথায় বললে, লিম্ফোসাইট শরীরে ঢুকে যাওয়া কোন বিজাতীয় প্রোটিন সহ্য করতে পারে না। অ্যালার্জি রিয়াকশন করিয়ে মেরে ফেলার চেষ্টা করে। অন্য গ্রুপের রক্ত যেমন, সহ্য হয় না। মায়ের পেটে জন্ম নেওয়া বাচ্চাও, সে অর্থে বিদেশি প্রোটিন। কিন্তু, সে খুদে বাচ্চা মায়ের শরীরের ইমিউনিটি এড়িয়ে কীভাবে বেঁচে থাকে, সেটা এক কাহিনী। সে অন্য দিন হবে।
-এর জন্য কী অনেক সময় বাচ্চা নষ্ট হয়ে পারে? রাজ্জাকের প্রশ্ন।
-পারে তো বটেই, হয়ও। তবে সব বাচ্চাইয়ের জন্য নষ্ট হয় না। গবেষণা চলছে। পেটের প্রেগনেন্সি এতটাই তুখোড় বুদ্ধিমান, যে ওকে নিয়ে বোধ হয় একটা বই লেখা যায়।
শরীরে নতুন তৈরি হওয়া ক্যান্সারও এক ধরনের বিজাতীয় প্রোটিন। সে শুধু বুদ্ধিমান নয়, অত্যন্ত ধূর্ত।
ক্যান্সার যখন শরীরে তৈরি হয়, তখন তার মধ্যে নানারকম ছলাকলা চলতে থাকে। অবাক করে দেওয়ার মত, শয়ে শয়ে রাসায়নিক বিক্রিয়া হয় এমনভাবে, যাতে শরীরের নর্মাল ইমিউনিটি ক্যান্সার কোষগুলোকে ধ্বংস করতে না পারে। রীতিমত দুর্ভেদ্য দেওয়াল তৈরি করে ফেলে তারা, নিজেদের চারদিকে। সেখানে শরীরের খাবারের ট্রাকগুলোই শুধু ঢুকতে পারে কিন্তু, প্রবেশ বন্ধ আমাদের দেহের সৈনিকদের। বাড়বাড়ন্ত ঘটতে থাকে ক্যান্সার কোষগুলোর।
এক ঘাঁটি থেকে শুরু করে তারা অন্য ঘাঁটিতে বংশবিস্তার করতে থাকে। যাকে বলে, মেটাস্টাসিস।
এই নতুন ওষুধ ডস্টারলিমাব, এই দুর্গের দেওয়ালে ফাটল ধরায়। আর সেখান দিয়ে রে রে করে ঢুকে পড়ে, আমাদের শরীরের সৈনিক এইসব টি-সেল লিম্ফোসাইটস।
-সে তো দারুণ ব্যাপার।
-দারুণ বলে দারুণ? এক কথায় অসাধারণ। যে একডজন মানুষের ওপর এই পরীক্ষা হয়েছে, তারা একশোয় একশো পেয়েছেন। তবে মাধ্যমিকে যদি ১২ জন ছেলেমেয়ে যদি ফার্স্ট ডিভিশন পায়, তাহলে কি ধরে নেওয়া যায় যে, সারা রাজ্যে বা সারাদেশেই সব ছেলেমেয়ে ফার্স্ট ডিভিশন পাওয়ার উপযুক্ত?
-কি যে বলেন কাকু! সবাই কি আর ফার্স্ট ডিভিশন পায় ? যারা ভালো ছেলে মেয়ে, পড়াশোনা করেছে, তারাই তো পাবে।
অটোয় বসা সওয়ারিদের সঙ্গে দিব্যি আড্ডা চলছে।
বলি ,
-এই নতুন ওষুধপত্রের জন্য আমরাও উদ্বেলিত তো বটেই কিন্তু, আসল নায়ক আমাদের শরীরের ইমিউনিটি। মানে যাদের শরীরের ইমিউনিটি যত ভালো, জিতবেন তারাই।
-তার মানে যারা ভালো পড়াশোনা করেছেন, তারাই ফার্স্ট ডিভিশন পাবেন তাই তো?
-ঠিক তাই।
-তাহলে ‘মা তারা’ ফার্মেসি থেকে কয়েকটা ভিটামিনের ওষুধ কিনে নিলেই হয়, যাতে আমাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে।
-উহু! এখানেই বিপদ। হর কিসি কি হাথো মে বিক জানে কো তৈয়ার নেহি। ইয়ে মেরা দিল হ্যায়-তেরে শহর কা বাজার নেহি।
হাততালি সুযোগ কি কেউ ছাড়ে! সুযোগ পেয়ে চন্দন দাসের গজল আউরে দি। হিন্দি যতই খারাপ হোক আমার।
-পয়সা দিয়ে যা কিছু কেনা যায়, সেসব সস্তা। ইমিউনিটিকে পয়সা দিয়ে কেনা যায় না।
পোড়া কপালে আমার আর হাততালি জুটলো না। সবাই অটোর রেলিং ধরে রয়েছে, রাস্তা গাড্ডায় পড়ে যাওয়ার ভয়ে।
আবার বলি,
-মজার কথা হল, ইমিউনিটি কীভাবে বাড়ে সেটা কেউই জানে না। তবে কীভাবে ইমিউনিটি খারাপ করা যায়, সেইটা খানিকটা আমরা জানি। চুপচাপ ঘরে বসে টিভি দেখলে, বা গায়ে রোদ না লাগালে, বা ফলমূল না খেলে ইমিউনিটি কমে।
আর হ্যাঁ, রাজ্জাক দোকানের পেছনের দরজা থেকে কেনা, তোমার মুখ থেকে ওই পানমশলাটাও ফেলে দিতে হবে।
বলতে না বলতেই, ঘ্যাঁচ করে অটোয় ব্রেক, বাঁক ঘুরেই সামনে সারি সারি গরু-ষাঁড় সব দাঁড়িয়ে। হুমড়ি খেয়ে পরলাম একে অপরের গায়ে।
-এই রাজ্জাক, আস্তে গাড়ি চালা। চলছে যেন পঙ্খীরাজে। যেন তোর ট্রেন ফেল হয়ে গেল। কোথায় যাবি তুই!
রহিম চাচার তীব্র মন্তব্য। নামটা জেনে গেছি এতক্ষণ। চাচার বেসামাল ভর্তি মুদির ব্যাগ থেকে বিস্কুটের প্যাকেট ছিটকে পড়ে গেলো রাস্তায়। রাজ্জাক সাত তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে নেমে বিস্কুটের প্যাকেট থেকে ধুলো মুছে, চাচার হাতে দিয়ে দিল।
-চাচা এক মিনিট একটু দাঁড়াবে? গাড়ি যখন থামলই, তাহলে একটা ছোট্ট কাজ করে আসি। ড্রাইভারের পায়ের কাছ থেকে দুমড়নো ঘোলা হয়ে যাওয়া জলের বোতল থেকে জল নিয়ে মুখ থেকে পান মশলা ধুয়ে এলো রাজ্জাক।
অটো চললো আবার।
-কাকো আর হবে না তো, পেটের অসুখ? জিজ্ঞাস্য রাজ্জাকের!
-তা কী বলা যায়? সম্ভাবনা কমবে কিন্তু, তাই বলে একেবারে হবে না সে কথা জোর দিয়ে বলা যায় না। পান-মশলা-গুটকা-সিগারেট এসব না খেলে শরীর ভালো হবে বৈকি, কিন্তু আমাদের শরীরে যে তিন লক্ষ বছরের জিন বইছে, তাকে বশ মানানো কী চাট্টিখানি কথা? গবেষণাও তো এখনও পুরোপুরি শেষ হয়নি রাজ্জাক।
সমস্যা আছে আরও। দাদু থেকে নাতি, বাবা থেকে ছেলেতে, মামা থেকে ভাগ্নে পাল্টে যাচ্ছে জিন।
ক্রমাগত পাল্টে যাওয়া জিনের জন্যই মেডিক্যাল সায়েন্সে, কখনও কিছুই ১০০ % হয় না।
অনেকটা কথা বলে একটু দম নিয়ে নেই।
রাস্তাটা এখন একটু ভাল। বেশ ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে। অটো একটু জোরে চালিয়ে রাজ্জাক মুখ খোলে,
-কিন্তু বলল, যে যে ক’জনের ওষুধ দেওয়া হয়েছে সব্বার অসুখ ঠিক হয়ে গেছে, সব্বার।
মাথা হেঁট হয়ে যায়। সত্যি সত্যি ভাবি, তাইতো কাগজে টিভিতে গবেষণাপত্রে সব জায়গায় এমনভাবে বলা যে, ১০০ শতাংশই ভাল উপকার পাওয়া গেছে।
রাজ্জাকের আর দোষ কি! মানুষকে অর্ধসত্য শেখানো হলে, তার দায় তো খানিক বহন করতেই হয়।
সদ্য শতাংশের অংক শেখা ছেলে, এতক্ষণ আমার জামা আঁকড়ে বসে ছিল। এখনই সাহস করে জোর গলায় বলল,
-বাবা ১২ জনের মধ্যে ১২ জন মানেই ১০০ শতাংশের মধ্যে কোনো ভুল নেই। বল, আছে?
এক অটো ভর্তি লোকের সামনে চিকিৎসা বিজ্ঞানের অক্ষমতা স্বীকার করতে লজ্জা লাগছে।
অসমান রাস্তায় অটোর বেঁকে যাওয়া ভাঙ্গা আয়নায় নিজের এক চিলতে প্রতিবিম্ব কাঁপছে। মুখের ঘাম মুছে, কোনোভাবে তড়িঘড়ি করে বলি,
-১২ জনের উপর গবেষণা করে, আজ পর্যন্ত পৃথিবীতে কোনো অসুখের ওষুধ বেরোয়নি। চাই ১২০০০ বা তারও বেশী মানুষের উপরে গবেষণা। তাতে যদি আমাদের ওষুধ আশার আলো দেখায়, তখনই আমরা বলব যে, হ্যাঁ তোমার এলেম আছে।
তবেই সেটা ঐতিহাসিক।
-তাহলে বাবা, এটা কোনো পরীক্ষাই নয়?
নিজের ছেলেকে উত্তর দেওয়া, সব চেয়ে কঠিন।
কোন ওষুধ ভালো কিনা, তার জন্য গবেষণার নানারকম ভাগ আছে, ফেজ ১ থেকে ফেজ ৩।
যেমন ধরো, তোর ক্লাসের এ মাসের ম্যাথ টেস্টে ৫০ এ ৫০ পেলি। আমার বুকটা ভরে উঠলো। নিশ্চয়ই আমি খুব খুশি। একসঙ্গে সবাই হাগেন ড্যাশের আইস ক্রিম খেলাম। এই পরীক্ষাটা তোর ফেজ ১। কিন্তু, যেদিন তুই জীবনে নিজের পায়ে দাঁড়িয়ে, সারা পৃথিবীর কিছু উপকারে আসতে পারবি, সেদিনই তোর আসল পরীক্ষা। সেটা ফেজ ৩।
মাঝের মাধ্যমিক, উচ্চমাধ্যমিক- সেগুলো ধর, কথার কথা, ফেজ ২।
এই ফেজ ৩ এ সাফল্য পেলে, তবেই তুই মানুষের মত ‘ মানুষ’ হলি। তার আগে তুই শুধুই অঙ্ক জানা ছাত্র।
কোন ওষুধের গবেষণা করলে, ফেজ ২ তে কয়েকশো পেশেন্ট থাকে।
আর ফেজ ৩ এ কয়েক হাজার।
সেখানে সন্তোষজনক ফল করলে, তবেই অনুমোদন।
এই ডস্টারলিমাব গবেষণা এখন ফেজ ২ পর্যায়ে আছে।
আমরা প্রায় গন্তব্যে পৌঁছে গেছি। রাজ্জাক বললো, ভালো করে পড়াশোনা করো বাবু। মানুষের মতো মানুষ হতে হবে।
ভাড়া নিতে নিতে রাজ্জাক জিজ্ঞেস করে,
-কাকো হাতে সময় নিয়ে এসেছ তো? আমি কিন্তু, তোমাকে আগেই বলেছিলাম।
আবার উল্টো দিকের যাবার অটোর স্ট্যান্ডে লাইন না দিয়ে, রাজ্জাক অটোটা পাশেই স্টার্ট বন্ধ করে সরিয়ে রেখে দেয়।
কয়েক দশক ধরে অটো যাতায়াত করার সুবাদে, এটা অন্তত জানি গুমটিতে লাইন পাওয়াটা কত বড় ঝামেলার। অনেক সময় অটোচালকদের মধ্যে মারপিটও হয়ে যায়, যে কে কার আগে দাঁড়াবে। এর ওপরেই চলে ওদের সংসার।
-এদিকে এসো কাকো, দেখি রাজ্জাক একটু এগিয়ে গেছে হেঁটে। বলে, তোমাকে একটু গোকুলের কাছে নিয়ে যাই, কাল রাত থেকেই ওর খবর ভালো না।
ভবানীগঞ্জ বাজারের ভেতরে অলিগলি দিয়ে রাজ্জাক হনহন করে ঢুকে যায়, মাছের বাজারে।
আমার কৌতূহলের শেষ নেই। রাজ্জাকের গাড়িতে করে আমি অনেক দিনই মাছের বাজারে এসেছি কিন্তু, রাজ্জাক আমার সঙ্গে কোনোদিন বাজারে ঢোকেনি।
গোকুলের মাছের দোকান। আমি কিনি না ওর কাছে থেকে। বড্ড বেশী দাম বেশী নেয়।
আজ গোকুলের দোকানে বেশ ভিড়। কিন্তু সবাই বাজারের দোকানের দোকানি। তেমন কাস্টমার কেউ আছে বলে মনে হল না। রাজ্জাকের কথায় সবাই এক বাক্যে সরে যায়।
-এইতো নিয়ে এসেছি কাকোকে। জায়গা দে।
মাছের দোকানের মাছ প্রায় ফাঁকা। গোলগাল চেহারার গোকুল পা মুড়ে বসে রয়েছে, কাঠের ছোট টুলে। ঘাড়ে গামছা। ঘামে ভিজে পুরো জবজবে। পরনে খাটো লুঙ্গি। কাল রাতে খবর শোনা ইস্তক, বাড়িও যায় নি।
চোখ দেখেই বুঝলাম অনেকক্ষণ ধরে কান্নাকাটি চলছে। সে চোখের জল শুকায়নি এখনও।
আমাকে দেখেই তারস্বরে চিৎকার করতে শুরু করল,
-হাসপাতালের ডাক্তারবাবুরা কিছুতেই বাবাকে ওষুধ দিল না। রাজ্জাক তুই বল।
বাষ্পীভূত গরম, মাছের দোকানের ওরকম ভিড় আর তার উপরে গোকুলের এরকম কান্না, আমি কিংকর্তব্য বিমূঢ়?
মিনিট পাঁচেকের প্রাণপণে যেটুকু বুঝতে পারলাম, তা হল গোকুলের বাবার কোলন ক্যান্সার হয়েছিল এবং তার চিকিৎসা হয় সদর হাসপাতালের ক্যান্সার বিভাগে। বছর চারেক ভালো থাকার পরে, গত বৈশাখে অসুখের বাড়বাড়ন্ত হওয়াতে, এবার উনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।
কেঁদে লাল টকটকে চোখ উঠিয়ে গোকুলের পরিষ্কার বক্তব্য,
-ডাক্তারবাবুদের হাতে-পায়ে ধরে বলেছি যে, বাবার জন্য যা ওষুধ দরকার হয় দিন।
গোকুলের রাগ এই কারণেই যে ডস্টারলিমাব ওষুধ আবিষ্কার হওয়া সত্ত্বেও, তার বাবাকে এই ওষুধ দেওয়া হয়নি।
আজই তারা হাসপাতালে জবাব দিহি চাইতে যাবে, ডাক্তারের কাছে।
-শোন গোকুল, ওনারা তো এত ভালো করে চিকিৎসা করে বাবাকে কিছুদিনের জন্য ভালো করে দিয়েছিলেন।
-নানা আমি আর শুনতে চাই না। লোক ঠকানো ছাড়া আর কি! ক্রুদ্ধ কণ্ঠ গোকুলের!
-শোনো গোকুল, এ ওষুধ ব্যবহারের ছাড়পত্রই আসেনি এখনও।
ডস্টারলিমাব ভারতের ওষুধের দোকানে পাওয়া যায় না বললেই চলে।
-কেন এত টিভি , কাগজে লেখা হচ্ছে, কেউ তো সেটা বলল না! গোকুলের সটান প্রশ্ন।
রাজ্জাক এতক্ষণে এক গেলাস লস্যি এনে গোকুলের হাতে ধরিয়ে দিয়েছে।
-খেয়ে নে গকলো, সারা রাত কেঁদেছিস, একটু কিছু খা!
রাজ্জাক এবার নিজেই, নিজের ভাষায় ফেজ ২ আর ৩ ওষুধের রিসার্চের কথা বলে দিয়েছে। ক্লাসের উইকলি পরীক্ষা আর জীবনের পরীক্ষার তফাৎ ঝরঝর করে বলে দিয়েছে।
রাজ্জাকের পিঠ চাপড়ে বলি,
-সাবাস বস।
-পড়াশোনা শেখার সুযোগ হয়নি কাকো, চোখ রাস্তায় থাকলেও চেষ্টা করি, কান দিয়ে যেটুকু শেখা যায়।
-সত্যি বলছে রাজ্জাক? স্যার? গোকুল শুধোয় ঢোঁক গিলে। হাতে ধরা বরফ ঠাণ্ডা লস্যির গ্লাস থেকে টপটপ করে জল ঝরে পড়ে, মাছের আড়তের প্লাস্টিকে।
সম্বিত ফিরে আমার হাতেই, গোকুল ধরিয়ে দিতে চায় লস্যি!
-আপনি এত কষ্ট করে এসেছেন স্যার।
জিভ কেটে গ্লাস ফিরিয়ে দি!
-তুমি খাও। তোমার দরকার। তবে, রাজ্জাক যা বলল একদম ঠিক।
একটু থেমে বলি, যাঁদের এই ওষুধ কাজে লাগবে, সেসব পেশেন্ট সনাক্ত করাও বেশ মুশকিল।
পোটির রাস্তায় ক্যামেরা ঢুকিয়ে টিউমার থেকে পাওয়া টুকরো অংশে মিস্ম্যাচ জিনের পরীক্ষা হয়।
কিন্তু, সেই টেস্টই এখানে অপ্রতুল আর দামও অনেক। অর্ধেক লোক তো বায়োপসির নামেই উলটো দিকে হাঁটা লাগায়! চিকিৎসা করবে নাকি তকমাওলা টেস্টের পেছনে ছুটবে? ঢাকের দায়ে মনসা বিক্রি আর কি।
-নাহ বায়োপসি হলেও, এমন কোন জিনের টেস্ট হয়নি বাবার, মাথা নাড়ে গোকুল!
-দুঃখ পেও না গোকুল। আস্তে আস্তে হয়তো টেস্ট আর ওষুধ দু’টোর দামই কমবে। গাল ফোলা নামের টেস্ট করলেই তো হল না , তার ট্রিটমেন্টও থাকা দরকার হাতের কাছে। সাধ্যের মধ্যে। আর ডস্টারলিমাব পাওয়া গেলেও যা দাম! তিন হপ্তা অন্তর সাড়ে আট লাখ!
-অন্তত যদি একটাও দেওয়া যেত, দোকানটা বিক্রি করে হলেও।
-না গোকুল, তিন হপ্তা অন্তর ৬ মাস, প্রায় সত্তর লাখ টাকা। আফসোস করো না। দোকানের আয়ে তোমার সংসার চলে ভুলে যেও না। তোমার বাবা কী তাই চাইতেন?
ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে গোকুল। পায়ের দিকে তাকিয়ে বলে, দোকান তো বাবাই দিয়েছিল কাকু। আমি আর ভাই মিলেই চালাই।
পেছনে শোরগোল,
-কে বলেছে এত দাম, স্রেফ পঞ্চাশ হাজারে পাওয়া যাবে, এই দ্যাকো!
ফোনের সবুজ মেসেঞ্জারে আসা মেসেজ দেখিয়ে বলে, দাঁড়িয়ে থাকা এক দোকানি। নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অফ মেডিসিনের নির্ভেজাল রিপোর্ট, আর নিচে বাংলায় লেখা ভিন রাজ্যের ঠিকানা আর ফোন নম্বর। বুঝতে অসুবিধে হয় না, জনপ্রিয় খবরের ঘোড়ায় জিন দিয়ে সওয়ারি শ্রীযুক্ত ‘দালাল’। এর আগে ২০২০ তেও তো ব্রাজিলের ওষুধের অর্ধসত্য খবরের পাশে পিচ্ছিল ফোন নম্বর সহ, উড়ো বার্তার সাক্ষী তো আমরাই। অর্ধসত্য বড়ো বালাই।
বলি,
-এটা আর দয়া করে আর কাউকে পাঠিও না।
শোরগোলে আমার গলার আওয়াজ চাপা পরে যায়। আধ কোটির ওষুধ পঞ্চাশ হাজারে পাওয়া যাচ্ছে শুনে, একে অন্যের ফোনে ফরওয়ার্ড করছে মনে হল। ঠিক বুঝতে পারলাম না।
দোকানে রাজ্জাক, গোকুল আর গোকুলের ঘোমটা দেওয়া বউ ছাড়া আর কেউ নেই।
বললাম,
-বুঝেছ?
-বুঝেছি , অনেক ধন্যবাদ আজকে আসার জন্য। কালকে রাজ্জাক দা কে বলেছিলাম, গোকুলকে বোঝাবার জন্য। কাল রাতে এখান থেকেই ফোন করে আপনাকে। রাজ্জাকদাই বাবাকে শেষ দিকে দেখেছিলো। আওয়াজ এল ঘোমটা সরিয়ে। তারপর গোকুলের দিকে বলে, এবার চলো বাড়িতে - একটু ঘুমোবে।
ছেলে ঠিক বুঝতে পেরেছে। পেছনে হাত দেখিয়ে বলে,
-বাবা ওরা তো বুঝল না?
-সময় লাগে বুঝতে। তবে আমরা সবাই মিলে যদি বলি, তবে নিশ্চয়ই সবাই বুঝবে, কী বলিস? চলো রাজ্জাক, এগোনো যাক।
উপশম (remission) আর নিরাময়ের (cure) মধ্যে তফাৎ অনেক। অনস্বীকার্য যে, অনেকের কাছে remission ও হাতে স্বর্গলাভ, কিন্তু আশ্বাস যেন সঠিক হয়।
বিশেষত, যে আশ্বাসে মিস্টার মুখার্জি ৩ হপ্তা অন্তর তাঁর ম ব্ল্যা কলম দিয়ে সাড়ে আট লাখের চেক লিখবেন। হয়তো সাধ্য আছে বলেই, সাগরপারের ভাগ্নের চেষ্টায় সরাসরি নিউ ইয়র্ক থেকে দমদম এয়ারপোর্ট পেরিয়ে লম্বা পরদাওয়ালা কাঁচের কেবিনে পৌঁছে যাবে, ‘ওষুধ’। কতটা কাজ হবে সেটা তো, ফেজ ৩ বলবে।
আর বাজারের মেছো গোকুলরা চোখের জল ফেলবে, জানবে, তার বাবার জীবন নিয়েছে তার অনটন।
এই আদ্যোপান্ত ধোপদুরস্ত ফরসা নিটোল ‘ঐতিহাসিক’ খবরে যেন মেডিক্যাল সায়েন্সের সাদা-কালো মেশান, বাস্তব ইতিহাস আর নাম না জানা বিজ্ঞানীদের শতাব্দী পুরনো ঘাম ঝরানো নির্ভেজাল ইতিহাস, অস্ত না যায়।
গোকুলের হাসপাতাল বা আরও ছোট বা আরও বড়ো হাসপাতালের চিকিৎসক-নার্সের চেষ্টা যেন কোনঠাসা না হয়।
আরও তাড়াতাড়ি অসুখ ধরতে পারার প্রচেষ্টাও যেন, অস্পষ্ট না হয়ে যায়।
হাই ফাইবার ডায়েট, স্বল্পাহার, নিয়মিত ব্যায়াম, ঘাম ঝড়ানো জীবনের মাহাত্ম্য যেন ক্ষীণ না হয়ে যায়। সঙ্গে সরকারি গবেষণাগারে আরও অনুদান আসুক যাতে, সেখানেই এসব নতুন ওষুধ তৈরি হয়। আর দামও থাকে সাধ্যের মধ্যে।
চমকে আমরা আশাবাদী, কিন্তু সতর্কতার সঙ্গে। পা থাকুক মাটির সঙ্গে। সঙ্গে থাকুক, বুক ভরা আশা।
(পুঃ বাজারের সবাই আমার কথা না মানলেও, গোকুল আমাকে আসার সময় এক থলে মাছ দেয়।
-আপনি তো আমার দোকানে আসেন না। আসলে, আমি আর ভাই সেই ভোর তিনটে থেকে ফ্রেশ মাছ ধরি। তাই দাম একটু বেশী। খেয়ে দেখবেন!
-কী যে করো তুমি! মাথা ঠাণ্ডা হলে, একবার বাবার পুরনো ডাক্তারের কাছে থেকে ঘুরে এসো, যদি ছেলে হিসেবে কিছু টেস্ট করে, তোমার স্বাস্থ্যটা অন্তত সুরক্ষিত রাখা যায়।
গোকুলের পকেটে খানিক টাকা গুঁজে দেই জোর করে। ফোন আসছে। হাসপাতাল যেতে হবে। রাজ্জাক বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে গেল।
-কাকো তোমাকে কী যে বলবো, খুব দরকার ছিল তোমার যাওয়া।
-টাটা রাজ্জাক, পরে কথা হবে।
ছেলের হাত ধরে টান লাগাই - তাড়াতাড়ি বাড়ি ঢোক। আমাকে হাসপাতাল যেতে হবে।
বাবা, পারসেন্টেজের অঙ্ক গুলো কী মিথ্যে?
-তা কেন, সব সত্যি , সা রে গা মা সব সত্যি, কীভাবে সাজালে কোন গান হয়, সেটাই শেখার।
Reference (data source)
GLOBOCAN 2020
Cercek A, et al PD-1 Blockade in Mismatch Repair-Deficient, Locally Advanced Rectal Cancer. N Engl J Med. 2022 Jun 5.
College of Americal Pathologists QCDR Measure MMR/MSI Testing - Primary and Metastatic Colorectal Cancer
কাজের কথা,
রেড মিট, প্রসেসড মিট, অ্যালকোহল, শারীরিক মেদ কোলন/ রেক্টামের ক্যান্সারের ঝুঁকি বাড়ায়।
নিয়মিত ঘাম ঝড়ানো ব্যায়াম (গরমের ঘাম নয়), স্বল্পাহার, শাক সব্জি, দই কমিয়ে দেয় ঝুঁকি।
প্রতি দশটি শরীরের ক্যান্সারে একটি কোলন/ রেক্টামের ক্যান্সার
এর মধ্যে, ১০০ টি কোলন/ রেক্টামের ক্যান্সারের মধ্যে মাত্র ২ থেকে ৪ (চার) টিতে MisMatch Repair (MMR) সমস্যা ( মিউটেশন) পাওয়া যায়। ভবিষ্যতে ডস্টারলিমাব এদের আশার আলো দেখাতে পারে।
MMR বংশানুক্রমিক হতে পারে। MMR জিনের সমস্যায় কোলন ছাড়াও, ইউটেরাস (জরায়ু), ডিম্বাশয় (ওভারি), পাকস্থলী, ব্রেন সহ অন্যান্য অঙ্গেও ক্যান্সার হতে পারে। MMR সমস্যা জানা থাকলে, খুব প্রাথমিক অবস্থায় ধরা পড়লে ডস্টারলিমাব ছাড়াই, নিরাময় সম্ভব হতে পারে। আর হ্যাঁ, ইংল্যান্ডের মত দেশেও জরায়ুর ক্যান্সারে ডস্টারলিমাবের রুটিন ব্যাবহার আরও গবেষণার অপেক্ষায়।
Search tool: Dostarlimab Rectal Cancer Colon Cancer T cell Lymphocytes Biopsy Media reporting Remission Cure Research







