ওভারিয়ান ক্যানসারকে চিনতে শেখা
লেখার সময় ভাষা হারিয়ে যায়। আসলে ওভারিয়ান ক্যান্সারের সিম্পটম গুলোই গড়পড়তা বাঙালি অনেক সময় গ্যাস হয়েছে বলে উড়িয়ে দেন।
👵🏻 - এরকম আনমনা কেন তুই?
গুডরিকের লিকার চায়ে চুমুক দিয়ে কাপটা ঠক করে কাঁচের টেবিলে নামিয়েই, অনুযোগ করে আমার আদরের পিসি।
👵🏻 - কদ্দিন বাদে এলি! তোর পছন্দের ভুনা খিচুড়ি আর ইলিশ ভাজা রান্না করে বসে আছি সকাল থেকে। ভাবলাম খাবার দিতেই ঠিক আইফোনে, ফেসবুক পোষ্টের জন্য ছবি তুলেই, গপ গপ করে খেয়ে নিবি! সেসব তো নয়ই, বরং চোখের সামনে সব ঠান্ডা জল হয়ে গেল একেবারে।
🧑🏻⚕️ - আনমনা নই পিসি! নীরবতা ভেঙে বলি আমি।
তোমার চায়ের সুবাস, ভুনার আকর্ষণ, জানলা দিয়ে ভেসে আসা করিম চাচার রিক্সার বেলের আওয়াজ আর তোমার অভিমান সবই বুঝছি- কিন্তু নষ্টের গোড়া এই সৌগত।
🧑🏻⚕️ - আমাকে একটা লেখা লিখতে বলেছে
👵🏻 - বেশতো তবে লিখে ফেল! পিসি বলে, তুই তো সারাদিনই কিছু না কিছু লিখছিস, প্রেসক্রিপশন বা রিসার্চ পেপার, বা ব্লগ পোষ্টের অদ্ভুত সব গল্প।
🧑🏻⚕️ - না গো পিসি, তুমি জানো না এই লেখাটা অন্য লেখার মত নয়, সবচেয়ে কঠিন লেখা।
👵🏻 - কি লেখা? পিসি এবার বেশ আশ্চর্য।
🧑🏻⚕️ - সৌগত আমাকে বলেছে ওভারিয়ান ক্যান্সারের সিম্পটম নিয়ে লিখতে।
👵🏻 হেসে গড়িয়ে পড়ে পিসি।
-তুই তো সারাদিন গাইনোকোলজিক্যাল সমস্যা নিয়েই ব্যস্ত থাকিস। আর ওভারিয়ান ক্যান্সার নিয়ে তোর এক ডজন লেখা আর ইউটিউবের ভিডিও আমি নিজেই পড়েছি। সেখান থেকেই কপি পেস্ট করে চালিয়ে দে, ৫ মিনিটে নেমে যাবে।
🧑🏻⚕️ - ব্যাপারটা ঠিক তা নয়, বলি আমি।
আসলে জানত! ওভারিয়ান ক্যান্সারের সিম্পটম নিয়ে লিখতে গেলে নিজের ভিতরটাকেই দুমড়ে মুচড়ে তারপর লিখতে হয়।
👵🏻 - কেন? পিসি চায়ে একটা বড় চুমুক দিয়ে সরাসরি জিজ্ঞেস করে আমাকে।
🧑🏻⚕️ - আসলে, ওভারিয়ান ক্যান্সারের সিম্পটম নিয়ে মেডিকেল কলেজে ডাক্তারি পড়ার সময় যা পড়েছি, আর যা শিখেছি - সেই পুরনো জানা সব জ্ঞানগুলো মুছে তারপরে এই লেখা লিখতে হয়। ঠিক যেমন দীঘার সমুদ্র সৈকতে বালির উপর লেখা কে সমুদ্রের পানির ঢেউ এসে মুছে দিয়ে যায়। নইলে নতুন কিছু লেখাই যায় না।
👵🏻 - রহস্য করিস না তো! ঝেড়ে কাশ!
🧑🏻⚕️ - রহস্য নয়, রহস্য নয় ! লেখার সময় ভাষা হারিয়ে যায়। আমাদের পুরনো বইয়ে লেখা ছিল ওভারিয়ান ক্যান্সারের কোন সিম্পটম-ই নাকি ঠিকঠাক হয় না। কিন্তু সেগুলো তো আর ঠিক নয় পিসি!
👵🏻 - বলিস কি? পিসির মুখটা আরেকটু হা হয়ে সামনের দিকে ঝুকে পড়ে।
🧑🏻⚕️ - হ্যাঁ, ব্যাপারটা ঠিকই। আসলে নতুন রিসার্চ, পুরনো তথ্যকে মুছে দিয়ে বিজ্ঞানকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। ওভারিয়ান ক্যান্সারের সিম্পটম হয় ঠিকই কিন্তু আমরা তা বুঝতেই পারি না। আর তাই, ঠিক সময়ে সিম্পটম এর ডাকে সাড়া না দিলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই ওভারিয়ান ক্যান্সার ধিকি-ধিকি বাড়তে থাকে পেটের মধ্যে সবার অজান্তেই! শেষমেশ একদিন হঠাৎ অসিত মজুমদারের মিসেসের মত বিছানায় পড়ে যায়।
👵🏻 আঁচল দিয়ে চোখের জল মুছে পিসি বলে
- বড্ড ভালো বউটা, অসুস্থ হওয়ার এক সপ্তাহ আগেই ৫০ জনের বিরিয়ানি রান্না করেছিল নিজের হাতেই। কোনদিন অসুস্থ হয়নি। আর অসিতের প্রত্যেকটা স্টুডেন্ট অঙ্কে লেটার। কি ভালো মাস্টার!
🧑🏻⚕️ - ঠিক এটাই সমস্যা, বলি আমি।
সিম্পটম গুলো এতটাই দুষ্টু, ঠিক ভালোভাবে বোঝাই যায় না! এই যেমন ধরো পেট ফেঁপে থাকা, খেতে ইচ্ছে না করা, অল্প খেলেই মনে হয় পেট ভরে গেছে - এরকম ভাব! এই ব্যাপারে কিছুতেই অঙ্ক মেলে না পিসি।
👵🏻 আমাকে মাঝপথে থামতেই হলো। কারণ বেশ বুঝতে পারলাম পিসির চোখ দুটো গোল-গোল হয়ে উঠছে। এবার ডান হাত দিয়ে আমাকে থামিয়ে দিয়ে বললো
-তোর মাথার ঠিক আছে তো? তুই যে সিম্পটম বলছিস সেই সিম্পটমগুলোতো প্রত্যেক বাঙালির ঘরে ঘরে মা-মেয়ে-বউদের হয়। সবারই কি আর ওভারির ক্যান্সার? আমারো কাল রাতে চিকেন পকোড়া খেয়ে পেট ভার ভার লাগছে। এই দেখ না, কিছুই খেলাম না আজকে। এক কাপ চা নিয়ে বসেছি ! আমার কি ওভারিয়ান ক্যান্সার আছে?
🧑🏻⚕️ - ঠিক এইটাই সমস্যা, বলা চলে ফাঁদ
চেঁচিয়ে বলি আমি!
🧑🏻⚕️ - আর এর ফাঁক দিয়েই ঢুকে যায় বড়সড়ো ডায়াগনোসিসের ভুল। আর সেই জন্যই ১০ জনের মধ্যে ৮-৯ জনের একদম অন্তিম অবস্থার আগে ওভারিয়ান ক্যান্সার ধরাই পড়ে না। তবে হ্যাঁ একদিনের পেট ফাঁপাতে তোমার ওভারিয়ান ক্যান্সার হবে না। কিন্তু এই পেট ফাঁপা ব্যাপারটা যদি চলতে থাকে একনাগাড়ে দু তিন সপ্তাহের বেশি তাহলে অতি অবশ্যই ডাক্তার দেখিয়ে নেওয়া উচিত।
👵🏻 - আমাকে আর বেশি টেনশন দিস না বাপু, পিসি এবার মুখ অন্যদিকে জানলার বাইরে টা দেখতে দেখতে বলে!
🧑🏻⚕️ - না অত টেনশন পাওয়ার কিছু নেই। চিকিৎসা তো আছে। সচেতন হওয়াটা আমাদের সবার দায়িত্ব। তবে হ্যাঁ, পেট যদি ব্যথা হয়, বিশেষত তলপেটে, বা পটি - হিসুর নতুন আসা সমস্যা, তাহলে মহিলাদের অন্তত ডাক্তার দেখিয়ে একবার পেটের আল্ট্রাসাউন্ড আর CA125 বলে একটা পরীক্ষা করিয়ে নেওয়া দরকার। আর সিম্পটম যদি চলতেই থাকে তাহলে প্রাথমিক টেস্টে কিছু ধরা না পড়লেও আবার ৩-৪ মাস বাদে আবার ডাক্তার আর টেস্ট দুটোই রিপিট করা দরকার।
আসলে ওভারিয়ান ক্যান্সারের সিম্পটম গুলোই গড়পড়তা বাঙালি অনেক সময় গ্যাস হয়েছে বলে উড়িয়ে দেন।
👵🏻 - বুঝলাম। ভালোই বলেছিস। দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলে পিসি। তবে এবার তোর একটা নম্বর কেটে দিলাম। তুই একটা মস্ত জিনিস বললিই না! গাইনোকোলোজিক্যাল ক্যান্সার হওয়া সত্ত্বেও তুই কিন্তু পিরিয়ডের কোনো সমস্যার কথা বললি না। ভুলে গেছিস নাকি রে,? অট্টহাসি হেসে বলে পিসি।
🧑🏻⚕️ - না ভুলিনি! ভুলবো কেন? আর এইখানেই লুকিয়ে আছে ওভারিয়ান ক্যান্সারের দ্বিতীয় ফাঁদ। জরায়ু বা ইউটেরাইন ক্যান্সারে ব্লিডিং প্রায়শই এবনরমাল হয়। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠ ওভারিয়ান ক্যান্সারে ব্লিডিং এর কোন সমস্যাই আসে না। আসে হজমের সমস্যা! তাই অনেকেই ওভারিয়ান ক্যান্সার নিয়ে গাইনি ডাক্তার দেখানোর বদলে চলে যান গ্যাস্ট্রো ডাক্তারের কাছে। সেখানে এন্ডস্কোপি করে খাদ্যনালী আর পটির রাস্তা চেক হলেও সেসব ক্লিনিকে ওভারির টেস্ট আর ca125 এর অত চল নেই। মহিলাদের পেটে জল জমলেও ওভারি চেক করে নেওয়া দরকার। ইংল্যান্ডে থাকার সময় দেখেছি গবেষণা করে এমন অদ্ভুত সব সত্যি আবিষ্কার হয়েছে
👵🏻 - বোঝো কাণ্ড! চিৎকার করে ওঠে পিসি
🧑🏻⚕️ - আর কিছু কিছু সময় ওভারিয়ান ক্যান্সার ধরা পড়ে সম্পূর্ণ অন্য কোনো কারণে আল্ট্রা সাউন্ড করতে গিয়ে! যদি ওভারিতে কমপ্লেক্স সিস্ট ধরা পড়ে।
👵🏻 পিসি এবার যায় রেগে
-তোর এই আজগুবি গল্প থামা দেখি! ওভারি তে সিস্ট নেই এইরকম কোন মেয়ে-মহিলাকে খুঁজে পাওয়া যাবে এই গোটা ভূভারাতে? বা এই কলকাতায়?
🧑🏻⚕️ পিসিকে শান্ত করে বলি আমি,
- উত্তেজিত হয়ে লাভ নেই, শান্ত হয়ে বসো। সমস্যাটা গুরুতর বলেই এটা নিয়ে লিখতে বসলেই আর ভালো লাগে না। তোমার দেওয়া সুস্বাদু খাবারও ঠান্ডা হয়ে যায়। আসলে চোখের সামনে বারবার ডায়াগনসিস বিভ্রাটের চিত্রনাট্য দেখে দেখে ডাক্তার হিসেবে কি কষ্ট হয় বলে বোঝাতে পারব না। ভালো করে বোঝ পিসি। আমি সিস্ট বলিনি! আমি বলেছি কমপ্লেক্স সিস্ট। সব মহিলাকে এ ব্যাপারটা জানতে হবে।
আল্ট্রাসাউন্ড করলেই বোঝা যায়। সিম্পল সিস্ট এর মধ্যে শুধু লিকুইড থাকে। আর কমপ্লেক্স সিস্টে থাকে বাড়তি জিনিস পত্র। সেপটা বা পার্টিশন দেওয়াল। বা সিস্ট যদি সলিড হয়। অথবা লিকুইডে ভেসে থাকে দ্বীপের মতো সলিড এরিয়া। মানে সেসব জায়গায় বাড়তি কোষ বিভাজন হচ্ছে! অনেক সময় অনেকগুলো সিস্ট এক সাথে আঙ্গুরের থোকার মত বাসা বেঁধে থাকে। এ-সব কিছু কমপ্লেক্স সিস্ট।
এসব দেখলে কিন্তু আর উপসর্গের আশায় সময় নষ্ট করলে চলবে না। সঠিক ট্রিটমেন্ট শুরু করে দিতে হবে। কমপ্লেক্স সিস্ট এর ট্রিটমেন্ট সিম্পল সিস্ট এর ট্রিটমেন্টের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। তবে হ্যাঁ কমপ্লেক্স সিস্ট হওয়া মানেই ক্যান্সার - এরকম মোটেই নয়। কিন্তু সন্দেহের তীব্রতাকে আরো শক্তিশালী করা দরকার। সন্দেহ হলেই যাতে ডাক্তার দেখিয়ে নিতে পিছপা না হন কেউ।
আর হ্যাঁ, আর একদল মহিলা আছেন যাদের ফ্যামিলিতে BRCA বলে একটা জিন থাকে। পরিবারে কারও ব্রেস্ট বা ওভারিতে টিউমার হলে BRCA টেস্ট করে নেওয়া হয়। এসব জিন, মা বাবা থেকে ছেলে -মেয়েতে চলে আসে।
এদের তো বছর বছর ডাক্তারের কাছে গিয়ে আগাম চেকআপ করিয়ে নিয়ে আসতে হয় কোন ছাড়াই সিম্পটম ছাড়াই। যাতে একদম শুরুতেই বিনাশ করে ফেলা যায় ওভারিয়ান ক্যান্সারের সম্ভাবনা। ব্যাস!
আর হ্যাঁ যাদের ব্রেস্ট ক্যান্সার হয়েছে তাদেরও বছর বছর ওভারির চেক করা দরকার। শুধু ব্রেস্টের দিকে ফলোআপ করলে চলবে না।
👵🏻 - তার মানে সতর্ক হতে হবে সবাইকে, তাই তো?
🧑🏻⚕️ - ঠিক তাই, বলি আমি।
👵🏻 পিসি এবার বলে, - নে এবার ভুনা আর ইলিশ ভাজাটা তাড়াতাড়ি খেয়ে নে। আমি মাইক্রোওভেনে গরম করে দিচ্ছি!
🧑🏻⚕️ - আগে এক গ্লাস জল দাও পিসি, বকে বকে গলা শুকিয়ে গেলো, বলি আমি।
আর হ্যাঁ আপনাদেরও বলি, মনোযোগ দিয়ে লেখাটা পড়ার জন্য ধন্যবাদ। আশা করি ওভারিয়ান ক্যানসারকে হারিয়ে দেওয়ার এসব স্ট্রাটেজি আপনাদের কাজে লাগবে। আরও প্রশ্ন থাকলে ফেসবুক, ইন্সটা তে আমাদের খুঁজে জিজ্ঞেস করে নিতে পারেন। এখন টা টা। এবার পিসির সাথে গল্প না করলে আর পিসি এর পর আমার জন্য আর ভালোমন্দ রাঁধবে না!
🧑🏻💻 facebook.com/WinningThePink
🧑🏻💻 instagram.com/WinningThePink
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Ovarian Cancer Endoscopy Ca125 BRCA Simple Cyst Complex Cyst


