দুয়ারে হাসপাতাল ?
কিন্তু কয়েকদিন হল এই নিয়ে কিছু ডাক্তারবাবুরা, কিছু হাসপাতাল এবং কিছু পেশেন্টরাও দাবি করে আসছেন, বাড়িতে কেমোথেরাপি দেওয়া হোক। সেটা কেমন?
দুয়ারে হাসপাতাল ?
এই সেদিন জন্মদিনের নিমন্ত্রণ খেতে গিয়ে আধ ঘন্টার রাস্তা পেরতে সময় লাগলো আড়াই ঘণ্টা। যখন পৌঁছলাম তখন কেক কাটা শেষ, বার্থডে বয় ক্লান্ত হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে । কিন্তু কি করবো ?
এদিনটা হয়তো বাড়াবাড়ি, কিন্তু হাতে গুণে অল্প কদিন মাত্র আমরা ঘড়ি ধরে গন্তব্যে পৌঁছতে পারি।
আমাদের সেদিন ভেটকি পাতুরি আর আইসক্রিম খাওয়ার কোন বিঘ্ন হয়নি, কিন্তু কারও কারো ক্ষেত্রে ঠিক সময়ে ঠিক জায়গায় পৌঁছতে পারাটা জীবনদায়ী।
জীবন এমনিতেই বিপদসংকুল।
যেমন ধরুন মেডিক্যাল এমারজেন্সি। বাড়িতে সমস্যা হয়েছে - হাসপাতালে যাবেন।
কখনও সখনও বিপদ হয়, সমাধানও হয়ে যায় সাধারণত।
কিন্তু হসপিটালের কঠিন ওষুধ জেনে বুঝে বাড়িতে নিয়ে এসে শিরায় দিলে যদি জটিলতা হয়, তাহলে ?
যেটুকু ওষুধ না দিলেই নয়, তা বাড়িতে অনেকসময়েই দেওয়া হয় - রোগীর একান্ত অনুরোধে ।
পাড়ার জেনেরাল প্র্যাকটিস করা কাকু-জ্যেঠু ডাকা ডাক্তারকুল অবলুপ্ত। তবে আজকাল কম খরচার এবং বিলাসবহুল দু ধরনেরই প্রাইভেট মেডিক্যাল কোম্পানি গজিয়ে উঠেছে 'সেবা' পৌঁছে দেবার জন্য।
আবার রোগী হাসপাতাল পর্যন্ত আসতে অসমর্থ হলেও অনেক ওষুধ বাড়িতে চলে।
কিন্তু কোন হাসপাতালের বিজনেস মডেলই যদি এমন হয় যে তারা বাড়িতে কেমোথেরাপির মত জটিল ওষুধ দিতে পেশেন্টকে বিজ্ঞাপন দেখাবেন ?
সেকি খাল কেটে কুমির আনা ?
ধরুন কাউকে বাড়িতে কেমোথেরাপি দেওয়ার সময় তার একটা আচমকা একটা মেডিকেল এমারজেন্সি তৈরি হলো। জ্যাম, খানা খন্দ ভর্তি রাস্তা পেরিয়ে রোগী যদি হাসপাতালে ঠিক সময় না পৌঁছান, তাহলে তিনি এবং তার বাড়ির লোক একটা অদ্ভুত সমস্যার মধ্যে পড়বেন।
হ্যাঁ আপনি প্রশ্ন করতেই পারেন এই ধরনের ওষুধপত্র বাড়িতে দেওয়া হবে নাই বা কেন।
আমার কাছে স্যালাইন আছে, ওষুধের আম্পুল আছে, বোতল ঝুলিয়ে দিলেই হল। হাসপাতালে যা মাধ্যাকর্ষণ , বাড়িতেও এক। বোতল থেকে মাধ্যাকর্ষণের টানে ওষুধ সেঁধিয়ে যাবে হাতের শিরায়। কেউ হয়তো বলবেন, পেশেন্ট কি সুন্দর ওষুধ 'টেনে' নিল।
হাসপাতালের চৌহদ্দির মধ্যেই এই ধরনের ওষুধপত্র সাধারণত দেওয়া হয়। ক্ষেত্র বিশেষে ডে-কেয়ার আছে, যাতে সকালে গিয়ে রাতে বাড়ি ফিরে নিজের বিছানায় ঘুমনো যায়। কারণ, কার কখন কি ধরনের মেডিকেল ইমার্জেন্সি ঘটবে সেটা সম্পূর্ণ অনিশ্চিত। ইদানীংকালে যত ওষুধ হাসপাতালে ব্যাবহার হয় তার মধ্যে স্যালাইনের কেমো (intravenous chemo) অন্যতম কঠিন ওষুধ। এমবিবিএস করার পর অন্তত বছর দশেক পড়াশোনা আর প্র্যাকটিস করা ডাক্তার অনেকক্ষণ মাথা চুলকে, নানা ক্যালকুলেশন করে দেন সে ওষুধ। ট্যাবলেটের কেমো বাড়িতে নেওয়ার জন্যই তৈরি - তাই সেটা এই সমীকরণের বাইরে।
কিন্তু কয়েকদিন হল এই নিয়ে কিছু ডাক্তারবাবুরা, কিছু হাসপাতাল এবং কিছু পেশেন্টরাও দাবি করে আসছেন, বাড়িতে কেমোথেরাপি দেওয়া হোক।
কিছু প্রাইভেট কোম্পানি যেমন মুম্বাইয়ের জিভিকা হেলথকেয়ারের জিগ্নেশ প্যাটেল, হেলথকেয়ার অ্যাট হোমের বিবেক শ্রীবাস্তব সম্প্রতি এক পাইলট প্রোজেক্ট চালু করেছেন। গলা মিলিয়েছেন অ্যাপোলো দিল্লির প্রবীণ ডাক্তার মণীশ সিঙ্গল। বলছেন প্যান্ডেমিকে নিরুপায় হয়ে অনেকেই নিয়েছেন ঘরে কেমো। সেটাকে এখন স্বীকৃত উপায় ভাবতে ক্ষতি কোথায়? নিয়ম মেনে দিলেই হল।
কেই বা সে নিয়ম বানিয়েছে ? কেই বা সেই নিয়ম বানানোর জন্য রিসার্চ করেছে? জানা যায় না তাও !
ভারতের রাস্তা আর সামাজিক অবস্থার নিরপেক্ষ বিচার কি হয়েছে সেই রিসার্চে? জানি না উত্তর।
এদিকে মুম্বাইয়ের সরকারি টাটা হাসপাতালের এক ডাইরেক্টর শ্রীপাদ বানভালি আবার ' দুয়ারে কেমো' শুনে আঁতকে উঠেছেন। প্রাণঘাতী সাইড এফেক্ট হলে সময় কটা মিনিট শুধু। শুনেই বোঝা যাচ্ছে বাজারি গিমিকে আতঙ্কিত উনি।
পেশেন্টের কাছে ব্যাপারটা আকর্ষণীয়। সন্দেহের বিন্দুমাত্র অবকাশ নেই যে পেশেন্টদের যদি কেমোথেরাপি বা কিছু ওষুধ বাড়িতে এসে দেওয়া যায় তাহলে পেশেন্ট নিজের ঘরোয়া পরিবেশে খুব ভালোমতো সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন। বিবেক বাবুরা বলছেন আখেরে পেশেন্টের খরচও বাঁচবে। নিশ্চয়ই। ঘরে তো আর হাসপাতালের ইনফ্রাস্টাকচার বানাতে হবে না কোম্পানিগুলোকে।
হ্যাঁ, সেটা যদি পেশেন্টের স্বতঃপ্রণোদিত সিদ্ধান্ত হয় যেটা উনি ভালো মন্দ সব জেনে নিয়েছেন - তাহলে বলার কিছু নেই।
কিন্তু সেটা যদি ‘ও কিছু হবে না' । ' কতজন নিয়ে নিলেন বা কারোর তো কোন সাইডএফেক্ট হয়নি' । ' কিছু হলে ম্যানেজ করে নেওয়া যাবে ' এই ধরনের মিথ্যের ছদ্মবেশে হয় - সেটা দুর্ভাগ্যজনক।
শোনা যায় স্বল্পসংখ্যক দুঃসংবাদ খুব সহজেই কার্পেটের নিচে চালান করে দেওয়া যায় এদেশে। আর উলটোদিকে বিজ্ঞান-স্বীকৃত সমস্যাকে চিকিৎসার অবহেলা বলে চালানো হয় এদেশেই। যেটার যে সময় কাটতি বেশি আর কি।
ছাড়ুন সেসব কথা !
আমাদের দেশ উন্নয়নশীল। সেখানে রাস্তার কাজ লেগেই থাকবে। সেটাই স্বাভাবিক । পরবর্তী প্রজন্ম যাতে ভালো রাস্তা, ফুটপাথ, মেট্রো, ট্রাম পায়, তার জন্য এই ধরনের রাস্তার কাজ অত্যন্ত উপকারী । কিন্তু তার সাময়িক ফল ভুগতে হবে আমাদের।
অনেক সময় রাস্তায় লেখা থাকে টুডেজ পেইন, টুমরোস গেইন। রাস্তাঘাটের যদি ক্রমাগত তার উন্নতি না ঘটতে থাকে তাহলে উন্নয়নশীল দেশ কোনদিনই উন্নত দেশ হতে পারবেনা।
রাস্তা ভালো হলে, গাড়ির খরচ কমবে। দুর্ঘটনা কমবে। ইন্টার্ভিউ দিতে গিয়ে দেরি হবে না। ট্রেন মিস হবে না। ব্লাড ব্যাঙ্কের ওপরে চাপ কমে যাবে।
কিন্তু ততদিন ?
এই অবশ্যম্ভাবী মাঝের সময়টিতে দৈনন্দিন দুরবস্থার মধ্যে বাড়িতে গিয়ে এই ধরনের ওষুধপত্র দেওয়া কতখানি সমীচীন সেই ব্যাপারে যথেষ্ট সন্দেহের অবকাশ রয়েছে।
বাড়িতে এসব ওষুধ দেবার সময় অঘটন ঘটলে দুমিনিটে হাসপাতালে আসা যাবে কি ? নাকি আসা সম্ভব ? যেসব দেশে আসা সম্ভব, তারাও তো দুয়ারে কেমো দেয় না !
আমরা কি আশু সমাধান চাইছি আর কিই বা পেতে চলেছি তার বদলে, সেই ব্যাপারে সম্যক ধারণা থাকা পেশেন্টদের জন্য তো বটেই, ডাক্তার এবং হাসপাতালেরও থাকা জরুরী।
জেপ্টো, ব্লিঙ্কিট এর যুগে আশা থাকতেই পারে যে বাড়িতে এসে কেমো দিয়ে যাবেন কেউ । চাকরির মন্দা বাজারে, সদ্য পাশ করা ডাক্তারের শিফট ডিউটি পাওয়াও মুশকিল হবে না। প্রাইভেট কেমোর কোম্পানি ইউনিফরম পরা লোকজন পাঠাবেন বাড়িতে।
বাজারের ডিমান্ড বেশি থাকলে বাঘের দুধও টেট্রা প্যাকে সুপারমার্কেটে পাওয়া যাবে। তবে যা পাওয়া যায় সেই 'সুবিধে' টা ভবিষ্যতের জন্য কতখানি নিরাপদ সেই ব্যাপারে সতর্ক হওয়ার সময় এসেছে
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search Keywords: Hospital at Home Chemo Chemotherapy at Home







