ছোটরা যখন হাসপাতালে
এমন দিন না আসুক। তবুও, আলোর সন্ধান রইলো সেই সব অভিভাবক দের জন্য, যারা বন্ধু হতে চান!
শুরুর কথা- অঙ্কিতা এবছর ক্লাসে টপ করছে। বছরখানেক আগে অঙ্কিতা যখন, পেটে টিউমারের সার্জারির জন্য আমাদের কাছে এসে হাসপাতালে ভর্তি হল, তখন তার বাবা-মায়ের চোখে দেখেছিলাম নীরবতা। ঘটনার জেরে তারা তাদের মেয়ের সঙ্গে কথা বলার ভাষাও খুঁজে পাচ্ছিলেন না। সেদিনই ভেবেছিলাম, কিছু লিখব এবিষয়ে। কীভাবে ছোটদের হাসপাতাল থাকা আরও একটু সহজ করে তোলা যায়। শুধু তাদের জন্য নয়, তাদের অভিভাবকদের জন্যও। গত ক’মাস আরও একটু পড়াশোনা করলাম এবিষয়ে। তবে এই লেখা কাজে আসবে হাসপাতালের নার্স, সিস্টার এবং ব্রাদারদেরও। আবৃত্তি শিল্পী শ্রীমতি শাঁওলী মজুমদার হাত মিলিয়েছেন এই লেখায়। সঙ্গে রয়েছে, আরও অনেকের শুভেচ্ছা। আমাদের প্রত্যেকের জীবনের মত, এ লেখাতেও ভুল-চুক রয়েছে। জানালে শুধরে নেবার চেষ্টা করবো। ছোটদের জন্য রইলো অনেক ভালবাসা।
সবসময় আপনার বাচ্চা যে কথা শুনবে, এমনটা নয়। কিন্তু, আপনি চেষ্টা করে যাবেন। এতে ওর communication skill ও বাড়বে।
কোনো সময়ে হয়তো আপনার বাচ্চা একটু অসুস্থ বা ক্লান্ত বোধ করলো। তখন তার বিশ্রামের প্রয়োজন। সেই সময়ে তাকে একটু জড়িয়ে ধরে বসুন, বা পাশে শুয়ে জড়িয়ে থাকুন। অথবা তার সঙ্গে গল্প করেও, সময় কাটাতে পারেন। আবার অনেক সময়ে হয়তো, তার খেলতে ইচ্ছে করছে। তখন, তার সঙ্গে আপনিও এমন কিছু করে সময় কাটান, যাতে ওর সঙ্গে আপনিও সমান তালে সেই সময়টা enjoy করতে পারেন।
আপনি যখন আপনার বাচ্চার সঙ্গে হাসপাতালে থাকবেন, তখন তাকে আপনি এমনভাবে সঙ্গ দেবেন, এতটাই সহজভাবে তার সঙ্গে মিশবেন বা কথা বলবেন, অথবা যে কোনো বিষয় নিয়ে আলোচনা করবেন, যাতে সে বাড়ির মতোই comfort feel করে। খেয়াল রাখবেন, হসপিটালের পরিবেশ যেন তার মনের ওপর আলাদাভাবে কোনো প্রভাব ফেলতে বা চাপ সৃষ্টি করতে না পারে। আপনার সঙ্গে তার কমিউনিকেশন যেন বাড়ির মতোই সহজ বা স্বাভাবিক থাকে। সবথেকে ভালো উপায় হল, আপনি বাড়িতে বাচ্চার সঙ্গে যেভাবে কথা বলেন বা কোনো ব্যাপারে যেভাবে উৎসাহ দেন, ঠিক সেইভাবেই হসপিটালেও আপনার বাচ্চার সঙ্গে কথা বলবেন বা তাকে উৎসাহ দেবেন বা তার সঙ্গে মিশবেন।
সবসময় আপনার বাচ্চা যে কথা শুনবে, এমনটা নয়। কিন্তু, আপনি চেষ্টা করে যাবেন। এতে ওর communication skill ও বাড়বে।
হসপিটালে বাচ্চার সঙ্গে কমিউনিকেশনের কিছু উপায়ঃ-
আপনি বাড়িতে রোজ বাচ্চার সঙ্গে যেভাবে কথা বলেন, হসপিটালে থাকার সময়েও তেমনভাবেই কথা বলুন।
খেলনা বা ছবির বইয়ের ছবির সঙ্গে বাচ্চার বন্ধুত্ব গড়ে তোলার চেষ্টা করুন। তারপর সেই খেলনা বা ছবির বইয়ের সেই ছবির সঙ্গে বাচ্চাকে কথা বলানোর চেষ্টা করুন।
খেলার জন্য প্রতিদিন নির্দিষ্ট কিছুটা সময় আলাদা করে রাখুন বা রাখার চেষ্টা করুন। সেই সময়ে টিভি, রেডিও বন্ধ রাখুন এবং চাইলে ঘরের পর্দাও টেনে দিতে পারেন। তারফলে ঘরের মধ্যেই, আরও cozy একটা compact zone তৈরি হবে। এই পরিবেশ আপনার আর ছোটটির একান্ত নিজেদের সময়। এরফলে আপনার বাচ্চা সহজে অন্যমনস্ক বা distracted হবে না।
হসপিটালের পরিবেশ অনেক সময়েই নানান মানুষের কথাবার্তায়, নানানরকম আওয়াজে সরগরম হয়ে থাকে। বেশীরভাগ শব্দ বাচ্চার জন্য অজানা। তাই তারা বিভ্রান্ত বোধ করতে পারে। এইরকম জায়গায় ঠিক কোনো শব্দের ওপর মনোযোগ দিতে হবে, বাচ্চার পক্ষে সেটা জানা অসম্ভব। তাই আশেপাশে যেকোনো শব্দ যেটা আপনি শুনতে পাচ্ছেন যেমন, সেটা কোন মেশিনের শব্দ বা কোনো ক্লিনারের শব্দ হতে পারে। সেই শব্দটা নিয়েই আপনার বাচ্চার সঙ্গে কথা বলার চেষ্টা করতে পারেন। এগুলো অনেক সময়ে খুবই হেল্পফুল হয়।
আপনি আপনার সন্তানকে ওয়ার্ড বা হাসপাতালের চারিদিকে বেড়াতে নিয়ে যেতে পারেন। সেই সময়ে, যে শব্দগুলো আপনি শুনতে পাবেন বা যে জিনিসগুলো আপনি দেখতে পাবেন, সেই সম্পর্কে বাচ্চার সঙ্গে কথা বলতে পারেন।
জানলার বাইরে কোন গাড়ি বা কোন প্রাণীর দিকে তাকিয়ে কথা বলাটাও, বাচ্চাদের খুবই interesting লাগে।
আপনি যখন কোনো ছবি দেখছেন, মোবাইলে কিছু দেখছেন বা কারও সঙ্গে মিট করছেন, তখন আপনি আপনার সন্তানকে নতুন-নতুন শব্দের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিন। বাচ্চাদেরও দেখান, আপনি কী করছেন। ওরা এতে নিজেদের আরও মূল্যবান বলে মনে করবে। তার সঙ্গে ওদের মধ্যে বাড়বে দায়িত্ববোধও।
ছবির বই বা খেলনার সঙ্গে আপনার বাচ্চাকে কথা বলা অভ্যেস করিয়ে, আপনি খুব সহজে তাকে নতুন নতুন শব্দ এবং কথা বলা শেখাতে পারেন।
আপনার বাচ্চা যখন হাসপাতালে ভিজিট করতে আসা পরিবারের কোনো সদস্য বা কোনো বন্ধুবান্ধবের সঙ্গে দেখা করছে, তখন তাদের সঙ্গে আপনার বাচ্চাকে কথা বলতে বা খেলতে উৎসাহিত করুন। এরফলে আপনার বাচ্চা, বিভিন্ন লোকের সঙ্গে কমিউনিকেট করতে শিখবে।
আপনার ছোট সদস্যের জন্য কীভাবে বই খুঁজবেন?
আপনি যদি নিউ টাউন বা সল্টলেক এরিয়ায় থাকেন, তাহলে আপনি সিটি সেন্টারের Starmark এ বাচ্চাদের জন্য, ভালো ভালো বই পেতে পারেন।
আপনি যদি উত্তর কলকাতায় থাকেন, তবে কলেজ স্ট্রিট হল বইয়ের স্বর্গ।
আপনি যে জায়গায় থাকেন, তার আশেপাশে নিশ্চয়ই অনেক বইয়ের দোকান থাকবে। অথবা, শুধু বুক স্টোর বলে আপনার গুগল ম্যাপে সার্চ করলেই, ঠিকানা পেয়ে যাবেন।
আপনি অনলাইনেও বই কিনতে পারেন। আর হাসপাতালে বা আপনার বাড়িতে ঘরে বসে, আপনার সেই কেনা বই ডেলিভারি পেতে পারেন।
কমিউনিকেশনের আরও কিছু টিপস:-
এমন একটা সময় বেছে নিন, যখন আপনার শিশু স্থির থাকে বা শান্ত থাকে। যখন তাদের কোনোরকম খিদে বা ক্লান্তি থাকে না। এই সময়টি আপনার বাচ্চাকে, কিছু শেখানোর জন্য আদর্শ সময়।
একটা বিষয় ভালোভাবে খেয়াল করুন এবং খুব ভালোভাবে বুঝুন। আপনার সন্তান কিন্তু আপনার সঙ্গে সবসময় কমিউনিকেট করছে। তাদের body language বা মুখের এক্সপ্রেশন দিয়ে বা কোনো কোনো সময়ে তাদের মাথা নাড়িয়ে, তারা কিন্তু সবসময় আপনাকে কিছু বোঝানোর চেষ্টা করছে। অর্থাৎ, আপনাকে একটা মেসেজ দেবার চেষ্টা করছে।
তারা কোনো বইয়ের দিকে তাকিয়ে, আপনাকে কিছু দেখাচ্ছে কি না বা আপনি যেটা বলছেন, তাতে তারা রেসপন্স করছে কি না, সেগুলো খেয়াল করুন। আপনার বাচ্চার সঙ্গে আপনার কমিউনিকেশনের জন্য এগুলো খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
আপনার শিশু যদি মুখে শব্দ করে কিছু বোঝানো শিখে থাকে, তাহলে মনোযোগ দিয়ে সেটি শুনুন। কথা শেষ করার জন্য যথেষ্ট সময় দিন। শেষ হয়ে গেলে সে কী বলছে, সেটা আপনি বুঝুন এবং সেই শব্দগুলোকে আবার নতুন করে তাকে আপনি বলুন। এইভাবে আপনার সন্তানকে আপনার সঙ্গে, আরও ভালো করে কমিউনিকেট করার সুযোগ করে দিন।
আপনার কথা বলার সময়ে আপনার সন্তানের, সে দিকে মনোযোগ আছে কি না, সেটা আগে নিশ্চিত করুন। ওদের চোখে চোখ রেখে কথা বলুন।
আপনার সন্তানের সঙ্গে কমিউনিকেশনের সবথেকে ভালো একটি উপায় হল, তাকে তার পছন্দসই খেলনা নিয়ে খেলতে দেওয়া। তার পছন্দ মতো অ্যাক্টিভিটিগুলো করতে দেওয়া। এটি আপনার বাচ্চাকে কোনো কিছু বেছে নিতে বা কোনো বিষয়ে চিন্তা করতে শেখাবে, যেমন তাকে আপনি জিজ্ঞাসা করুন যে, “তুমি কী খেলনা চাও ? নাকি, গল্পের বই চাও?” যদি আপনি এটি করেন, তাহলে তার সামনে দু’টো অপশনই রাখবেন। যাতে সে তার মধ্যে থেকে একটি পছন্দ করতে পারে।
শিশুর সঙ্গে যেকোনো আওয়াজ অনুকরণ করার একটা খেলা খেলুন। যেমন দূর থেকে আদর করে চুমু দেবার আওয়াজ বা দু’টো ঠোঁটের মাঝে জিব রেখে ফুঁ দেওয়া মানে blowing raspberries এর মতো আওয়াজ করুন। যা আপনার বাচ্চার oral motor skill develop করতে সাহায্য করবে। এতে বাচ্চার মুখের মাংসপেশিগুলোর কাজ হয়।
দিনের যেকোনো সময়ই কমিউনিকেশনের জন্য ব্যাবহার করতে পারেন। রোজকার জীবনে কিছু কাজ, আপনি শিশুর সঙ্গে প্রতিদিন নিয়ম মেনেই করেন। যেমন, তার ন্যাপি চেঞ্জ করা বা জামা কাপড় চেঞ্জ করানো অথবা তাকে স্নান করানো, খাওয়ানো। এই সময়গুলোতে আপনি শিশুর সঙ্গে কমিউনিকেট করতে পারেন।
হসপিটালের মধ্যে মিউজিক এবং গানঃ-
মিউজিক বা গান শুনলে বাচ্চাদের মনোযোগের ক্ষমতা অর্থাৎ, concentrating power বাড়ে। আমরা যেকোনো সময়ে যেকোনো জায়গায়, তাদের মিউজিক বা গান শোনাতে পারি।
আপনি আপনার সন্তানকে তার ছোটবেলা থেকেই কখনও কখনও গান শোনান বা কিছু শব্দ বলুন অথবা কিছু অ্যাকশন করে দেখান। এরফলে দেখবেন, আপনার শিশুও নিজে থেকেই আপনার সঙ্গে সেটা রিপিট করছে। এইরকম করতে, তাদের উৎসাহিত করুন এবং তাদের সঙ্গে সেইসব বিষয়ে অংশগ্রহণ করুন।
বাচ্চার সঙ্গে গান করুন
আপনি ভালো গান গাইতে পারেন, কি পারেন না, সেইসব চিন্তা একদম না করে, মন খুলে আপনার বাচ্চার সঙ্গে গান করুন। আপনার বাচ্চার সঙ্গে আপনি যখন গান করবেন, তখন গানের সুর এবং কথার ওপর নজর দিন। আপনার গানের মধ্যে দিয়ে যেন আপনার ভালোবাসা এবং স্নেহ প্রকাশ পায়। সেটা খেয়াল রাখবেন। এটাই সবথেকে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। তবে, সেটি তাড়াহুড়ো করে নয়। গানটি খুবই ধীরে এবং স্পষ্ট ভাবে গাইবেন।
আপনার গানের সময়ে আপনি যতটা সম্ভব হাত-পা-মুখ নেড়ে, নানান অঙ্গভঙ্গি করে গান করুন অর্থাৎ, প্রচুর অ্যাকশন ব্যবহার করুন। মনে রাখবেন, এটি দেখেই আপনার বাচ্চা আপনাকে অনুকরণ করতে উৎসাহিত হবে। অর্থাৎ, আপনি যেটা করবেন সেটা তাকে প্রথমে আকৃষ্ট করবে, তারপর সে নিজে সেটা করার চেষ্টা করবে। মনে রাখবেন, বাচ্চারা প্রথমে অ্যাকশন কপি করবে। তারপরে তারা কথা বলবে।
পরিচিত সুরে গান করুন। যেটা আপনার বাচ্চার পক্ষে মনে রাখা সহজ হবে। গানে আপনি আপনার বাচ্চার নামও, ব্যবহার করতে পারেন। যেমন, উদাহরণ হিসেবে বলা যেতে পারে- Ankita on the bus goes up and down…….
একটু বড় বাচ্চা ও শিশুরা, এমন কোনো খেলনা নিয়ে খেলতে বা কোন instrument বাজাতে ভালবাসে। আপনি সেগুলি বাজাতে, তাকে সাহায্য করুন। যেমন, একটি খালি দইয়ের ভার বা একটা চামচ দিয়ে দুর্দান্ত শব্দ তৈরি করবে কিংবা, চালে ভরা একটা বোতল বা একটা চামচ দুর্দান্ত shaker হিসেবে বাজানো যায়।
এইরকম খেলার সময়ে, একটানা আপনি নিজে খেলে যাবেন না। কিছুক্ষণ খেলার পরে, কিছুটা সময় খেলা থেকে বিরত থাকুন। এরফলে, আপনার ছোট শিশুর আপনাকে অনুকরণ করতে সুবিধে হবে। আর বড় বাচ্চাদের সঙ্গে missing word খেলার সময়েও কিছুটা সময় বিরত থাকুন, যাতে তাদের missing word খুঁজে বার করতে সাহায্য করবে। যেমন, আমপাতা জোড়াজোড়া, / মারবো চাবুক, / ……?
মানুষের শরীর ও মনের চিকিৎসার বিজ্ঞানভিত্তি অত্যন্ত জটিল এবং সব কিছু এখনও আবিষ্কার হয়নি। তাছাড়া, প্রত্যেক রোগী একে অপরের থেকে আলাদা, তাঁর ব্যক্তিগত ইচ্ছা অনিচ্ছা ও তাঁর অসুখও অন্যের থেকে আলাদা হতে পারে। প্রত্যেকের জন্য আলাদাভাবে এই তথ্যপুস্তিকা লেখা জটিল এবং সেই কারণেই এই সংকলন ডাক্তারবাবুর সঙ্গে খোলাখুলি আলোচনা করুন। আমরা কঠোরভাবে বিশ্বাস করি, যেকোনো সিদ্ধান্ত গ্রহণের আগে, একজন প্রাপ্তবয়স্ক রোগীর মনের সব প্রশ্নের উত্তর দেবার প্রয়োজন আছে, তাই হাসপাতালে নিজেকে ভর্তি করবার আগে, ডাঃ মানস চক্রবর্তীকে সব জিজ্ঞেস করে উত্তর নিয়ে নিন। যদি কোনো প্রশ্নের উত্তর বিজ্ঞানের কাছে বা ওনার কাছে অজানা থাকে, তাও সেটা উনি আপনাদের খোলাখুলি বলবেন। আপনার যদি মনে হয়, এই পুস্তিকাতে আরও কিছু তথ্য সংযোজন করা প্রয়োজন, তা আমাদের জানান। আমরা আপনার কথা জানতে চাই।
কৃতজ্ঞতা স্বীকারঃ দেশ বিদেশের নানা বই ও তথ্যসূত্র, আবৃত্তি শিল্পী শ্রীমতি শাঁওলী মজুমদার ।
(এই টপিকের বাংলা লিঙ্ক উপরের পেজ)
(The English version of the page can be found by clicking here)
Search tool: Children Communication Hospital Young adult Talk to Child Adolescent






