চোখ দেখে না !
আমাদের মন, কিভাবে আমাদের চোখে দেখা, কানে শোনা পরিবেশকে অনুবাদ করে তার ওপরেই নির্ভর করে আমাদের ভবিষ্যৎ, সুস্থতার চাবিকাঠি। কিভাবে? সেটা আউট অফ সিলেবাস।
- নাহ! কি ক্যাটক্যাটে সবুজ বিচ্ছিরি কালার!
- তাহলে কালোটা নিন!
- ওটা অন্ধকার !
- কোনটাই তো আপনার পছন্দ হয় না!
- কালারই তো নেই কেসের! কেবল দুটো ! হতাশ হয়ে বলি!
- দেখুন, মোবাইল কেনার সময় এরকম আনকমন কিনবেন না, তাহলেই দেখবেন অনেক জামাকাপড় পাবেন। উৎসাহ হারিয়ে দোকানদার পেছন ফিরে লাঠির ডগায় লাগানো ঝাড়ন দিয়ে দোকান ঝাড়তে শুরু করেন!
- আনকমন মোবাইল মানে? শুধাই আমি। আনকমন কোশ্চেন পেপার শুনেছি, কিন্তু মোবাইল আনকমন ? চাঁদনিতে এসেছিলাম মোবাইল কেস খুঁজতে।
- আলবৎ আনকমন! যদি ধরুন স্যামসাং হয়। এই যে, এই মডেলটার সাত সাতটা কালারের কভার । লাল, কালো, নীল, থেকে শুরু করে ঝিঙ্কু চিকচিকে সব আছে। কল এলে আলোও জ্বলে।
নিজের মোবাইলটা কেসের পাশে নিয়ে এসে দেখায়, ঝিকমিক আলো জ্বলে কেসে। প্রজাপতি, মৌমাছি চিকচিক করে।
এমনিতেই আস্তিন গুটিয়ে শার্ট পরি বলে হাসপাতালে নতুন লিফট ম্যান এলে সন্দেহজনক দৃষ্টিতে তাকায়। ভাবে এও কি ডাক্তার হতে পারে? তারপর এমন ঝিঙ্কু চিকচিকে কেস !
- আপনি সবুজটাই দিন। বাড়ির কাছে কোথাও তো কেসই পেলাম না।
- পাবেনও না, এই লাস্ট পিস - এর পর চাঁদনি এলেও পাবেন না। চেঞ্জ ফেরত দিতে দিতে গজগজ করে দোকানি।
মোবাইলে কেস পরিয়ে হাঁটা দিই।
মনটা খচখচ করছে, রং টা ঠিক মন মত হল না, সবুজ রঙ হয় স্কুলের ইউনিফরমের প্যান্টের!
কিন্তু মোবাইলে সবুজ ! ধুর!
বাড়িতে এসেই ছেলের চিৎকার,
- মা দেখো! বাবা মোবাইলে সবুজ কেস লাগিয়েছে, দেখি দেখি! ছিনিয়ে নেয় মোবাইল।
মায়ের অবিশ্যি তেমন ভ্রুক্ষেপ নেই।
চশমা তুলে নিচ দিয়ে ভালো করে দেখে,
- ভালোই তো !
পর দিন হসপিটালে গেছি, সকালে ওটি।
লিফট ম্যান পকেট থেকে সবুজ নোকিয়া ফোন বার করে কথা বলছে।
ওটি সিস্টারের মি-ফোনে সবুজ কভার।
হপ্তায় চার দিন করে দেখা হয় ওনার সাথে, বলি ...…
- সিস্টার! নতুন ফোন?
- না না স্যার, এটাই তো আছে একবছর থেকে, লাস্ট ইয়ার আলপনা চৌধুরীর টিউমারের ছবি তো এটা দিয়েই তুলেছিলেন।
- ওহ হ্যাঁ তাই তো ! তাহলে নতুন কেস ?
- নাহ, ডে-ওয়ান থেকে এটাই আছে ! উনি কেমন আছেন স্যার?
- ভালো! এই তো মানালি ঘুরতে গিয়ে ছবি পাঠিয়েছে। টা-টা সিস্টার।
বেরিয়ে আসি ওটি থেকে। একরকম পালিয়েই বলা চলে।
বুক ঢিপঢিপ করছে! নিজের অব্জারভেশনের ওপর একটা ভরসা ছিল। সিস্টারের সবুজ কভার নজরেই পরেনি !!
অনেক মাস ধরে ইন্সিউরেন্স কোম্পানি আলপনা দেবীর পাওনা ফিস দিচ্ছি দেবো করেও দিচ্ছে না।
তাই হসপিটালের ফাইনান্সে ঘোষের সাথে কথা বলতে গেছি! প্রতি মাসেই ইমেইল করাই।
- পেমেন্ট এসেছে ? জিজ্ঞেস করি ঘোষ কে।
- না না, মাথা নাড়ে ঘোষ, আজকে আবার ইমেইল করে দিচ্ছি।
ঘোষের টেবিলে সবুজ কভারের সামসাং !
- নতুন ফোন কভার ? আমার গলা দিয়ে বেরিয়ে যায়।
অবাক হয়ে তাকায় ঘোষ!
আমি ততক্ষণ উলটোদিকে হাঁটা লাগিয়েছি, উত্তর কি আসবে জানি। কোনা গুলো ফেটে গেছে। গতমাসেই ঘোষ কে বলেছি এবার অন্তত কেস পাল্টে নিও।
পেছনে ভেসে আসে ঘোষ…
- বহুদিন পুরনো, ছিঁড়ে গেছে, এবার পালটাব ভাবছি! আপনিই তো বললেন সেদিন!
কাস্টমার সার্ভিসের মালবিকার ওয়ান প্লাস, আউটডোরের তনুশ্রী সিস্টারের মটোরোলা মোবাইল…
গায়ে সবুজ কভার।
বেশ বুঝতে পারছি মাথাটা ঝিম ঝিম করছে!
গভীর শ্বাস নিয়ে আউটডোরে ঢুকে যাই,
কয়েকজন পেশেন্ট।
নাহ কারও হাতে সবুজ ফোন নেই।
যাক ! আশ্বস্ত হই!
- স্যার আসব ?
- আয়, বোস।
আউটডোর শেষ ! ইন্টার্ভিউ দিতে এসেছে পায়েল।
কথা হল।
- কিন্তু স্যার, শিবরাত্রির দিন বিকেলটা একটু ছুটি পেলে ভালো হতো, পায়েল আমতা আমতা করে। নতুন চাকরি বলে কথা।
- কবে সেটা? বলি আমি।
- এক মিনিট, ফোন দেখে বলছি, পায়েল বলে তড়িঘড়ি।
ব্যাগ থেকে বেরোল ভিভো ফোন, সবুজ কেস।
ব্যাস!
চেয়ার থেকে উঠে পড়ি সটান!
কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমছে আমার।
বাঁ কাঁধে ব্যাগ ঝোলাতে ঝোলাতে উলটো পকেট হাত ঢুকে গেছে আমার রুমালের খোঁজে।
- থাক, তোর আর ডেট দেখতে হবে না , ওদিন তোর ছুটি!
তাড়াতাড়ি বেরিয়ে আসি হাসপাতাল থেকে।
গেটে সিকিউরিটি গার্ড অমল!
- মিসেসের নতুন স্ক্যানের রিপোর্ট টা দেখে দেবেন একটু?
- দেখি!
অমলের হাত থেকে ওর মোবাইলটা নিয়ে রিপোর্ট দেখি। এক হপ্তা আগেই পুরনো রিপোর্টটা দেখেছিলাম ওর মোবাইল থেকেই। যেটা খেয়াল করিনি সেটা হল…
কেসের রং সবুজ।
বেশ বুঝলাম এবার হাতটা কাঁপছে আমার!
- সময় নিয়ে দেখতে হবে অমল , কালকে দেখাও ঢোঁক গিলে বলি আমি!
এক দৌড়ে গাড়ির দিকে চলে আসি!
সিটে বসে, স্টার্ট দিয়ে কড়া এসি চালিয়ে দি।
একেই বোধহয় বলে…
Your **Eyes Cannot See, if the Mind Does Not Know**
এক দিনে ছ’ ছটা সবুজ মোবাইলের কেস! তাও পাঁচ জনকে আমি প্রায়শই দেখি!
কোন দিন খেয়ালই করিনি !
তাজ্জব আমি!
চোখ যে দেখে না সেটা আমি আপনি সবাই জানি!
দেখে আমাদের ব্রেন!
৫০ বছর আগে বিজ্ঞানীরা ভাবতেন ব্রেনের একটা জায়গাই শুধু আমাদের দেখতে সাহায্য করে, যার নাম ভিস্যুয়াল কর্টেক্স।
গোল বাধল তখনই যখন ক্রমশ আমাদের মস্তিষ্কে ৩০ টার ও বেশি নার্ভ সেন্টার আবিষ্কার হল, যারা আমাদের 'চোখে' দেখা নিয়ন্ত্রণ করে! যেগুলোর অঙ্গুলিহেলনে আমরা দেখি।
মায়, কোনটা দেখব আর দেখে কি বুঝব, কতখানি বুঝবো, সেটারও চিত্রনাট্য আগে থেকেই লেখা আছে আমাদের মস্তিষ্কে।
তাই খবরের কাগজে খুন, ঘুষ , রাজনৈতিক ঝগড়া, রংচঙে বিজ্ঞাপন চোখে পড়ে আমাদের। ইউটিউব খুললেই বেড়াল জলে পিছলে চমকে যাবার ভিডিও। রাস্তায় যাতায়াতের পথে কোথায় কোথায় মিষ্টির দোকান। বড়ো বড়ো বিলবোর্ডে ঝলমলে কোল্ড ড্রিঙ্কস এর বিজ্ঞাপন।
ঠিক এই কারণেই, আমাদের কান বিশ্বাস করবে ঠাণ্ডা লাগলে সর্দি হয়, বা রান্নার নুন এ দোষ নেই। মন বলবে আজকে বর্ষার দিন না হাঁটলেও ক্ষতি নেই।
কিন্তু হ্যাঁ আমাদের মস্তিষ্ককেও প্রশিক্ষণ দেওয়া সম্ভব। বলাই বাহুল্য এই স্কিল আমাদের স্কুল-কলেজে আউট অফ সিলেবাস। পড়ানো হয় নি।
কিন্তু যদি করতে পারি, তবেই সেই একই খবরের কাগজ থেকে খুন- ঘুষ পেরিয়ে চোখে পড়বে বিজ্ঞানীদের আবিষ্কার।
দৈনিক সান্ধ্য ঝগড়া পেরিয়ে, আমরা আফ্রিকান লো-ফাই মিউজিক শুনবো। বাড়বে মনোযোগের ক্ষমতা।
ইউটিউবে বেড়াল মুছে যাবে। 'চোখে' পড়বে Pick Up Limes , বা Bong -Eats এর মত আকর্ষণীয় স্বাস্থ্যকর রান্নার চ্যানেল।
বিরিয়ানি থেকে নজর ঘুরে যাবে চোখ যাবে ইরানি তাহিনি বা বাংলার সুক্তোয়।
এতদিন যারা আপনার মনোযোগ চুরি করে বেসাতি করত সেই এক-ই বিনোদন এর মাধ্যম হয়ে উঠবে সুস্বাস্থ্যের জানালা।
সেদিনই কোল্ড ড্রিঙ্কস এর বিলবোর্ডের নিচে বসে থাকা অচেনা লোকটার থেকে বেছে বেছে পোকা-কাটা ফুটো আর বাঁকা সব্জি কিনব আমি - আপনি !
সেদিনই, সকালে হাঁটার পুরনো টীমের, নবীন সদস্য হব আমি, পা মেলাব।
আজকে ঠাণ্ডা আর পরশু বর্ষা না ভেবে, সোয়েটার আর বর্ষাতি-ছাতা নিয়ে বেরবো হাঁটতে।
মানবো সর্দি লাগে ভাইরাস থেকে, আকাশের জল থেকে নয়।
এরকম আরও কত কি!
হরেক রকম গোলমালের ভীড়ে খুঁজে নিতে হবে সঠিক তথ্য!
শুধু আমাদের জিন নয়, আমাদের পরিবেশ ঠিক করে আমাদের স্বাস্থ্য।
থুড়ি ! আমাদের মন কিভাবে আমাদের চোখে দেখা, কানে শোনা পরিবেশকে অনুবাদ করে তার ওপরেই নির্ভর করে আমাদের ভবিষ্যৎ, সুস্থতার চাবিকাঠি।
কিভাবে? সেটা আউট অফ সিলেবাস।
অলরেডি আমি, আপনি সবই দেখি, শুনি, জানি ! কিন্তু খেয়াল করি না। ভালো থাকার চাবিকাঠি কাছেই আছে, কিন্তু মনের অসতর্ক ছাকনিতে বাধা পড়ে যায়।
সঠিক দৃষ্টি, শ্রবণ এবং মন তৈরী করা অনুশীলন সাপেক্ষ বিষয়। ভয় নেই, পড়ার বইয়ের বাইরের কত জিনিসই তো আমরা আয়ত্ত করে ফেলেছি অনায়াসে। আর এটুকু পারবো না?
আয়াসেই শিখে নেওয়া যায়। আর তবেই আশেপাশের Clutter সরিয়ে আঁতিপাঁতি করে খুঁজে নেওয়া বিন্দু বিন্দু অমৃত ঢুকবে আমাদের শরীরে
আরও পড়তে ইচ্ছে হলে দেখে নিন
The Emerging Mind: The Reith Lectures. Vilayanur S. Ramachandran,
The Visual Brain in Action. Second edition. Melvyn A. Goodale and A. David Milner,
I See, But I Dont Know" in SA Mind 19, 6, 20-22 (December 2008)
To See but Not to See: A Case Study of Visual Agnosia. M. Jane Riddoch
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Brain Visual Cortex Cognition Daniel Kahneman Thinking







