কনিষ্ক ?
আমরা ভাবি আমরা পুরোটা জানি। কিন্তু অনেকটাই আসলে জানি না। এ এক প্যারাডক্স। কার্ল সাগান বলেছিলেন, কোনো কোনো ভালো রাঁধুনীও কোন খাবার কিন্তু শুরু থেকে শেষ রান্না করতে পারেন না
Never let school interfere with your education ―Mark Twain
আপনার আর আমার একটা মিল আছে, সে আপনি যেই হ’ন না কেন।
ভিম নাগের সন্দেশ আমার ভালো লাগেনা, কিন্তু আপনার ভালো লাগতেই পারে।
ফুটপাথে বিপিনের দোকানের মাটির ভাঁড়ের চা আমার বেশ লাগে, আপনার তা নাও লাগতে পারে।
আমার আর আপনার ইন্টারেস্ট এর কোন মিলই হয়তো খুঁজে পাওয়া যাবে না।
একটা গল্প, থুড়ি ঘটনা না বললে চলছেই না !
একবার আমার বাবা প্লেন থেকে নামেন নি। তখন প্লেনে চড়াটা এরকম ক্লিশে হয়ে যায়নি। এমনকি এয়ারপোর্টে যাওয়াটাও তখন এক ধরনের এডভেঞ্চারের মত।
সেই প্রথম বারে চেনা কেউ প্রথম প্লেনে চড়বে।
বাবা কলকাতায় গেছেন অফিসের কাজে।
বলে গেছেন ফেরার সময় নাকি প্লেনের টিকিট দিয়েছে অফিস থেকে।
আমি আর মা বেশ সেজেগুজে বাগডোগরা এয়ারপোর্টে উপস্থিত বাবাকে আনতে।
সবাই প্লেন থেকে নেমে এক এক করে বেরিয়ে চলে গেল।
কিন্তু এলেন না বাবা। একরাশ আনন্দ তৎক্ষণাৎ গভীর উদ্বেগে পর্যবসিত।
চুপচাপ বাড়ি ফিরে এলাম।
তখন না ছিল মোবাইল, না ছিল ইন্টারনেট। জেলার একমাত্র ফোন হয়তো ডিস্ট্রিক্ট ম্যাজিস্ট্রেটের এর অফিসে। দিন তিনেক বাদে স্টিম ট্রেন জনতা এক্সপ্রেসের কয়লার ধুলো ঝাড়তে ঝাড়তে বাবা এসে পৌঁছলেন বাড়িতে। অনেক আনন্দ টানন্দ করে ফেলার পরে জানা গেল প্লেন ফেল করার কারণ।
কলকাতার রাস্তাঘাটে তখন অটোমেশন নিয়ে নানা রকম বিপ্লব চলছে। কম্পিউটার কেন খারাপ আর কম্পিউটার এলে কারোর আর কাজ থাকবে না, এই আশঙ্কায় ধারাবাহিক আন্দোলন চলছে। বাবা এরকম এক মিছিলে আটকে তার প্লেনটি মিস করেছেন।
তারপর কম্পিউটার আর অটোমেশনের কি হয়েছে সেটা আমার থেকে বেশি আপনিই ভালো জানেন। এখন বাড়িতে দৈনিক ল্যাপটপের স্ক্রিন না খুললে মনটা কেমন দুঃখ দুঃখ হয়ে যায়।
আর সেদিন যারা আন্দোলন করেছিলেন, তাদের নাতি নাতনিরা এখন হয়তো পটি করতে করতে ফেসবুক টুইটার করেন। যারা সেদিন রাজপথে নেমেছিলেন আমি তাদের সমালোচনা করছি না, কিন্তু যেটা বোঝার সেটা হলো যুগ খুব তাড়াতাড়ি পাল্টে যায়।
আজ থেকে কুড়ি বছর বাদে পৃথিবীর কি চেহারা হবে সেটা আজকে আন্দাজ করা সম্ভব নয়।
পৃথিবীর অনেক জীবিকা বিলুপ্ত হয়ে গেছে। যাচ্ছে।
এখন শিলনোড়া ধার দেওয়াকে কেউ নিজের জীবিকা বলে ভাবতে হয়তো নারাজ হবেন ।
একসময় যারা এস টি ডি-আই এস ডি টেলিফোনের বুথ চালাতেন, তারা এখন কর্মহীন।
শুনেছি সেই টেলিফোন কোম্পানিটাই নাকি উঠে যাচ্ছে ।
তবে আজকে যে জীবিকা শীর্ষে, কয়েক দশক বাদে সেই জীবিকা হয়ে যাবে নিশ্চিহ্ন । অনেক ইঞ্জিনিয়ারের চাকরি থাকবে না, কারণ কম্পিউটার এঁকে দেবে তার ড্রইং। অনলাইন শিক্ষা ব্যবস্থা, গতানুগতিক শিক্ষকের কাজ অনেকটাই লাঘব করে দেবে। ব্যাংক কর্মচারীদের জীবিকাও অটোমেশনের প্রভাবে প্রশ্নচিহ্নের মুখে।
গড়পড়তা ডাক্তারের চাকরি ও থাকবে না, তার কারণ সেখানে চলে আসবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স। এই ভাবেই জীবিকা বদলে যাওয়ার ঢেউ আস্তে আস্তে গ্রাস করবে গ্রাজুয়েট ডাক্তার থেকে শুরু করে সুপার স্পেশালিটি ডাক্তারদেরও।
আজকে স্কুলে যা পড়ানো হয়, তা ভবিষ্যতে আমাদের জীবিকা তৈরি করে দিতে অপ্রতুল।
ছোটবেলার আমাদের স্কুলের ক্লাসের ১০০ জনের মধ্যে মেরে কেটে একজন বা দুজন অংকের টিচার হয়েছেন।
তা সত্ত্বেও কঠিন অংকের সম্পাদ্য-উপপাদ্য-ক্যালকুলাস পড়ানো হয়েছে নম্বর না পাওয়ার ভয় দেখিয়ে।
তক্ষশীলা শহরকে রক্ষা করার জন্য চারপাশের নিরাপত্তা দেয়ালের কটা স্তম্ভ আছে সেটাও পড়ানো হয়েছে সবাইকে। কৃত্তিবাস ওঝার জন্ম বৃত্তান্ত, ইংরেজি ব্যাকরণের ব্যতিক্রমী নিয়ম, আকাশের মেঘ কত রকম - পড়ানো হয়েছে সেসব, অত্যন্ত বিশদে।
কিন্তু সেই ক্লাস থেকে যতজন ইতিহাস, ভূগোলের শিক্ষক হয়েছেন, সেই সংখ্যা নগণ্য।
কিন্তু যেটা পড়ানো হয়নি সেটা হল মানুষের শরীর।
শুরু যে একদম হয়নি, সেটা বলা যায় না।
ক্লাস সেভেনে পড়ানো হল ব্যাঙের সেক্স।
ক্লাসে নানান রকম ফিসফিস গুজগুজ। তারপর ফুলের পুংকেশর এবং গর্ভকেশর। এটুকুই পড়িয়ে শেষ নিঃশ্বাস ফেলেছিল স্কুলের বায়োলজি। তারপর যদি আপনি সাইন্সের ঘরে পড়তেন তাহলে গরুর পাকস্থলী আর কৃমির ছবি।
আর যদি আপনার আগ্রহ থাকতো আর্টস এ, তাহলে ওই ক্লাস টেনের বায়োলজিতেই শেষ হয়ে গেছে মানুষের স্বাস্থ্য নিয়ে আপনার জ্ঞানপিপাসা।
ক্লাসের কজন ডাক্তার হবেন, অংকের টিচার হবেন, বা ইতিহাসের টিচার হবেন সেটা হাতে গুনে বলে দেওয়া যায়।
কিন্তু যে ছেলেটা ক্লাস টেন পাশ করে কাঠের দোকান দিয়েছে, আর যে মেয়েটি আরও কিছুদিন পড়াশোনা করে বিদেশে গিয়ে বহুজাতিক সংস্থায় লক্ষ লক্ষ টাকা রোজগার করে- প্রত্যেকের জীবনে একটি মিল অবশ্যম্ভাবী।
সবার একটি মনুষ্য-শরীর আছে। এবং সেই শরীর একদিন না একদিন বিগড়ে যাবে। যাবেই।
একদিন হাসপাতালে যেতে হবে। হয়তো কোন এমার্জেন্সিতে, অসুখের সঙ্গে লড়াই করতে হবে।
কপাল ভালো থাকলে ভালো হয়ে বাড়িতে এসে চলবে কয়েকটা ওষুধের লম্বা কোর্স, তার সাথে সুখী হয়ে সোফায় বসে বই পড়া বা সিনেমা দেখা।
মানুষের শরীরের সঙ্গে আপনার প্রথম পরিচয় তখন হয়তো ঘটবে এমার্জেন্সির দরজার বাইরে।
বিভ্রান্ত অবস্থায় সেদিন হয়তো আপনার মানসিক অবস্থা এমনই, যে দুপায়ে দু রঙের হাওয়াই চটি পড়ে আপনি হাসপাতালে চলে এসেছেন।
আর সেই দিন সর্বপ্রথমবার ডাক্তার বাবুর চেম্বারে আপনার শুনতে হচ্ছে কোনটা লিভার, কোনটা স্প্লিন, কোনটা ওভারি, কোন স্ট্রোকে রক্ত শুকিয়ে যায় আর কোন স্ট্রোকে রক্তে ভেসে যায় ব্রেন।
দুর্ভাগ্য সেই ডাক্তারের। দুর্ভাগ্য আপনারও। ভাবুন তো কোন এক চরম বিভ্রাটের মুহূর্তে আমার মাথায় যদি কেউ বন্দুক ধরিয়ে বলে আমাকে আজকেই চাঁদে রকেট কীভাবে পাঠাতে হবে, সেই অঙ্ক বুঝতে হবে । নইলে হতে পারে আমার জীবন সংশয়।
সৌভাগ্যবশত চাঁদে রকেট পাঠানো গেল কিনা, তার ওপর কারো আয়ু নির্ভর করে না।
কিন্তু আমি আমার শরীরের ব্যাপারে কতখানি জানি তার ওপর ভিত্তি করে থাকে শুধু আমার স্বাস্থ্য নয়, আমার পরিবারের স্বাস্থ্য ও ভবিষ্যৎ।
আমরা সবাই স্কুল থেকে বেরিয়েছি প্রায় কনিষ্ক হয়ে। মাথা সম্পূর্ণ কাটা না হলেও স্কুলের বিদ্যায় বাকি থেকে গেছে শরীর এবং মনকে যত্ন করার চাবিকাঠি ।
আমাদের ভবিষ্যৎ জীবনের সম্বলের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঝুলিটাই শূন্য করে।
কেউ বলেনি এই যে শরীর নিয়ে আমাদের জন্ম, তার দায়টা সম্পূর্ণ আমার নিজের। আজকে আমার অশীতিপর বাবাকে প্রোস্টেট কোথায় সেটা জিজ্ঞেস করলে বাবা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকবে।
গলব্লাডারের কোথায় পাথর আটকে গেলে জন্ডিস হতে পারে সেটা জিজ্ঞাসা করতে গেলে আমার মাও হয়ে থাকবে নিরুত্তর। অথচ, সেই সময়কার গড়পরতা ভারতীয় নাগরিকের থেকে প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা তাদের কিছু কম ছিল না।
কিন্তু পড়ানো হয়নি মানুষের শরীরের বেসিক সমস্যা এবং তার সমাধান। ক্লাস টেনের পড়াশোনার মধ্যে মানুষের শরীরের সবটুকু অংশ পড়িয়ে দেওয়া যায় না। কিন্তু সবটুকু তো শুরু থেকে করার দরকার নেই। সুচারু রূপে শুধু হেডলাইন গুলো পড়লেও খানিকটা অন্তত কাজ হত। আমরা অন্তত সারা জীবনের এইটুকু পাথেয় পেতাম, যে কিভাবে আমাদের শরীর আর মন ভালো থাকবে। আর কিভাবে মানুষের শরীর কাজ করে।
অনেকেই নাক সিটকাবেন - অল্প শিক্ষা ভয়ঙ্করী।
হয়তো! বা, হয়তো নয়!
শুরু থেকে কেউ কিছু শিখতে পারেনা। আমরা যা শিখি সেটা সবটুকুই প্রয়োজনীয় ‘মাঝখানটুকু’।
তামাম পৃথিবীকে যদি বলা হয়, ডিটারজেন্ট কীভাবে নোংরা জামা থেকে ময়লা বের করছে, তার কেমিস্ট্রি জানলে, তবেই জামাকাপড় কাচা যাবে, তাহলে সে পৃথিবী পরিষ্কার জামা দেখবে না।
প্যান্টের চেইনের ফিজিক্স না জেনে যদি প্যান্ট না পড়া যায়, তবে ধুতি লুঙ্গি পরেই জীবন কাটাতে হবে। তবু আমরা প্যান্ট পড়ি। মনেও করি কীভাবে জিপ আটকায় তা আমরা যেন বেশ জানি। সম্পূর্ণ না জেনেও কাজ চলে যায়।
আমরা ভাবি আমরা পুরোটা জানি। কিন্তু অনেকটাই আসলে জানি না।
এ এক দুর্বোধ্য প্রহেলিকা। যাকে বলে প্যারাডক্স।
জ্যোতিষ বিজ্ঞানী কার্ল সাগান অদ্ভুত একটা উক্তি করেছিলেন। তার বাংলা করলে এরকম দাঁড়ায় যে, কোনো ভালো রাঁধুনীও কোন খাবার কিন্তু শুরু থেকে রান্না করতে পারেন না।
সেভাবে দেখতে হলে ভালো বিরিয়ানি যদি শুরু থেকে রান্না করতে হয় তাহলে প্রথমে সৃষ্টি করতে হবে এই মহা বিশ্বব্রহ্মাণ্ড। তারপর হবে বিজ্ঞান, তারপরে আসবে পৃথিবী, তারপর আসবে ধানক্ষেত সেখান থেকে হবে বাসমতি চাল, তারপর তাকে তৈরি করতে হবে পৃথিবীর সর্বপ্রথম গরু যেখান থেকে আসবে ঘি, সর্বপ্রথম পাঁঠা যেখান থেকে আসবে মাংস, আর জায়ফলের ক্ষেত। যেখান থেকে আসবে পৃথিবীর সর্বপ্রথম জায়ফল। তারপর তৈরি হবে বিরিয়ানি। কিন্তু এভাবে ‘প্রথম থেকে শেষপর্যন্ত’ বিরিয়ানি তৈরি করাটা শুধুমাত্র অবৈজ্ঞানিক নয় অত্যন্ত হাস্যকর।
যেকোন স্কিল, যেকোন বিদ্যা, যে কোন জীবিকা দাঁড়িয়ে আছে অসম্পূর্ণ জ্ঞানের ওপর।
একজন ব্যাংক কর্মচারী কোনোভাবেই সারা পৃথিবীর অর্থনীতি জানতে পারেন না। একজন ডাক্তার কোনোভাবেই সারা শরীরে কি হচ্ছে সেটা জানতে পারেন না।
একজন ইতিহাসের শিক্ষক পুরো ইতিহাস জানেন না, একজন ভূগোলের প্রফেসর-ও পুরো ভূগোল জানেন না।
কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা সফল তার কারণ তারা কাজ চালানোর মতো প্রয়োজনীয় ‘মাঝখানটুকু’ জানেন।
মানুষের শরীর কোন ম্যানুয়াল নিয়ে আসেনি। আর, মানুষের শরীরের এখনো সিংহভাগটাই অজানা।
তবুও প্রতিটি মানুষের এই মনুষ্য-শরীরের ওপর সম্মান জানিয়ে মানুষের শরীরের হেডলাইন গুলো সম্বন্ধে জানতেই হবে। আর তবেই কমবে হাসপাতালের বিল।
বাড়বে সঠিক সময়ে, সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়ার ক্ষমতা।
বিশ্বাস-অবিশ্বাসের বাতাবরণ ছেড়ে টেবিলের ওপারে থাকবে শুধুই অসুখ।
কনিষ্কের মাথা পাওয়া যায়নি। পাওয়া হয়তো যাবেও না!
কিন্তু এখনো আমার-আপনার সামনে সুযোগ রয়েছে শারীরিক স্বাস্থ্য, মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে পড়াশোনা করার ।
মানুষ কিভাবে সিদ্ধান্ত নেয় সেই সম্বন্ধে একটু পড়াশোনা করা। অন্তত ফাঁদগুলো জানা। হোক না তা অসম্পূর্ণ।
স্কুলের সিলেবাস পাল্টাবে কিনা জানিনা, তবে আজ থেকে চেষ্টা করলে অন্তত আমাদের পরের প্রজন্ম পাবে আপনার এই জ্ঞানের সুফল।
আমাদের জীবনের তিনটি মৌলিক প্রয়োজন হল খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান । তার অব্যবহিত পরেই নাম আসার কথা আমাদের শারীরিক এবং মানসিক স্বাস্থ্যর।
ছোটবেলা থেকেই তো শুনে আসছেন স্বাস্থ্যই সম্পদ। শুনে যখন আসছেন, সম্পদ রক্ষায় আর দোষ কোথায় ! কোমর বেঁধে লেগে পড়ুন তাহলে শিগগির !
Liked it?
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Diary Inspiration Awareness








