রিটায়ারমেন্টের ফাঁদ এড়িয়ে বাঁচুন
যেই বয়সটাতে আমরা সবাই ভাবি অনেক তো হলো এবার পায়ের উপর পা তুলে রিটায়ার করে একটু আরাম করি।
এখানে রইলো এই টপিকের বাংলা ভার্সন
For the English Version of this topic click here
👉🏾 শুধু আপনারই নয়, পৃথিবীর ১৭ বিলিয়ন মোবাইল ফোনের প্রাণ ভোমরা লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি।
👉🏾 মাত্র ৯৭ বছর বয়সে লিথিয়াম আয়ন ব্যাটারি আবিষ্কারের জন্য পেয়েছেন নোবেল প্রাইজ পেয়েছেন এর আবিষ্কর্তা জন গুডএনাফ। হ্যাঁ, নামটা খেয়াল করে দেখুন গুডএনাফ (Good - Enough) কেমিক্যাল এর মধ্যে লুকিয়ে থাকা এই ব্যাটারির ম্যাজিক যখন তিনি আবিষ্কার করেছিলেন তখন তার বয়স প্রায় ৬০ ছুঁই ছুঁই। যেই বয়সটাতে আমরা সবাই ভাবি অনেক তো হলো এবার পায়ের উপর পা তুলে রিটায়ার করে একটু আরাম করি।
👉🏾 তবে আমাদের গল্পের নায়ক ওনার ব্যাটারি নয়, এমনকি প্রফেসর গুডএনাফও নন। গুডএনাফের বলা একটি উক্তি আমাদের আজকের শিরোনাম।
👉🏾 নোবেল প্রাইজ পাওয়ার পর সাংবাদিকরা ওনাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন- -আচ্ছা আপনি তো দিব্যি রিটায়ার করে সুন্দর সুখে শান্তিতে থাকতে পারতেন কিন্তু তবুও আপনি অবসর পেরিয়ে যাওয়ার বয়স পেরোনোর পরে বারবার ফিরে গেছেন আপনার ইউনিভার্সিটিতে, বেতন পান কি না পান। ৯০ পেরনোর পরও আপনি নিয়মিত ইউনিভার্সিটিতে গিয়ে পড়াতেন এবং গবেষণার কাজ চালিয়ে গেছেন। কিন্তু কেন?
👉🏾 সেদিন সবাইকে চমকে দিয়ে তিনি এক অসামান্য উক্তি করেছিলেন
👉🏾 -কি করব? রিটায়ারমেন্টের পরে বসে বসে মৃত্যুর দিন গুনবো?
👉🏾 না রিটায়ারমেন্ট কেউ মৃত্যুর দিন গোনার আশায় করে না।
👉🏾 সবাই ভাবে রিটায়ারমেন্টের পরে আমার ওপর ছড়ি ঘোরানোর কেউ থাকবে না। সারা জীবনের কঠিন পরিশ্রমের পর একটু আয়েশ করে জীবন কাটাবো, যখন খুশি যেখানে সেখানে চলে যেতে পারবো। ভ্যাকেশনে যেতে পারবো। বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে যখন ইচ্ছা খোশ গল্পে বসে যেতে পারবো। সিনেমা, নাটক দেখে গল্পের বই পড়ে কাটাতে পারব।
👉🏾 হ্যাঁ রিটায়ার করার পরে এরকম মধুচন্দ্রিমা আসে বৈকি ! কিন্তু থাকে মাত্র এক থেকে দুই বছর। এর পরই মানুষ প্রবেশ করে গোলমেলে দ্বিতীয় ধাপে।
👉🏾 কীভাবে? আসলে অনন্ত মধুচন্দ্রিমা বলে কিছু হয় না কিনা ! তাই মানুষ আস্তে আস্তে হয়ে যেতে থাকে বোর। ঘরে বসে একলা বোধ করেন । ভুগতে শুরু করেন উদ্দেশ্যহীনতায়। প্রাণশক্তি তখনো ভরপুর। কিন্তু দেওয়ার জায়গা নেই।
👉🏾 নতুন কিছুর সৃষ্টি পথ বন্ধ। কারণ সেটা বন্ধ হয়ে গেছে রিটায়ারমেন্টে।
👉🏾 রিটায়ারমেন্টের চারটে স্টেপ কীভাবে আমরা জানলাম? Dr. Riley Moynes ( রাইলি ময়েন্স) ইউনিভার্সিটি অফ টরেন্টোতে পড়াতেন। জীবনে ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং কিভাবে করতে হবে সেই নিয়ে উনি প্রচুর বই পত্র লিখেছেন। কিন্তু যেদিন তিনি নিজের রিটায়ার করলেন সেদিন দেখলেন আরে গোড়ায় তো গলদ! ফাইন্যান্সিয়াল প্ল্যানিং করে হবেটা কি?
👉🏾 মানুষের যে গড় আয়ু ধরে ফাইনান্সিয়াল প্ল্যানিং করা হয় সেই হিসেবেই গন্ডগোল!! তার কারণ মানুষের গড় আয়ু এখন বেড়ে গেছে অনেক। এইবার তিনি শুরু করলেন নতুন যুগের নতুন রিসার্চ, রিটায়ার্ড মানুষদের উপরে। কয়েকশো মানুষকে ইন্টারভিউ করে তাদের কর্মক্ষমতা, তাদের চিন্তা-ধারা তাদের দৈনন্দিন কাজকর্ম, এনালাইসিস করে তিনি যা দেখতে পেলেন তাতে আমাদের চোখ কপালে ওঠার জোগাড়। উনি একটা বই-ও লিখে ফেললেন
👉🏾 THE FOUR PHASES OF RETIREMENT: What To Expect When You're Retiring আপনার বয়স যদি ২৫ পেরিয়ে থাকে আর আপনি এই বই না পড়ে থাকেন তাহলে অতি অবশ্যই পড়ে নেবেন। ওনার এই বইয়ে তিনি কি আবিষ্কার করলেন? রিটায়ারমেন্টের পরে মানুষের জীবনে চারটি সুনির্দিষ্ট ধাপ আসে এর মধ্যে গোলমেলে দ্বিতীয় ধাপে পড়ে আপনাকে তৃতীয় ধাপে উঠতেই হবে।
👉🏾 আর তৃতীয় ধাপে যদি আপনি না উঠতে পারেন তাহলে সেখান থেকেই জীবন আস্তে আস্তে নিচের দিকে গড়িয়ে যাবে। শরীর এবং মন আরো খারাপ থেকে আরও খারাপের দিকে যাবে। কিন্তু ঘুরে দাঁড়ানো সম্ভব। আর সেটা জানতে হলে তৃতীয় আর চতুর্থ ধাপটাও জানা জরুরী।
👉🏾 প্রথম ধাপের কথা তো আগেই বললাম !
PHASE - 1
🧳 Phase 1 - Vacation Mode
রিটায়ারমেন্টের পরে এক-দেড় বছর মানুষের থাকে vacation mode -এ এতদিন কাজকর্মের চাপে যা করা সম্ভব হয়নি সেটা তারা করতে শুরু করেন। সকালে হাঁটা, ভালো রেস্টুরেন্টে গিয়ে খাওয়া। ভালো জায়গায় সিনেমা নাটক দেখা এদিক-ওদিক ঘুরে বেড়ানো। টেনেটুনে এই ছুটির মজা চলে দেড় থেকে দু বছর চলার পর দ্বিতীয় ধাপে আসে,
👉🏾 কিন্তু দ্বিতীয় ফেজই বা কেন এত গোলমেলে ?
PHASE - 2
👵🏽 Phase 2 - Phases of Loss
This stage is unexpected and complex.
👉🏾 এসময়ে আমরা ৫ টা জিনিস জীবন থেকে হারিয়ে যেতে বসি।
A- Loss of routine - মানে সকালবেলা উঠে দাঁত মেজে জামা কাপড় পড়ে জুতো পড়ে কাজে বেরনো বন্ধ হয়ে যায়।
B- Loss of sense of identity - হারিয়ে ফেলি আমরা কি ছিলাম, সেই ব্যক্তিত্ব। কেউ হয়তো আগে ব্যাংকের ম্যানেজার ছিল। একসময় হাঁক-ডাক কত নাম। রিটায়ার করার চার বছর বাদে ব্যাংকে গিয়ে অনেকে চিনতেই পারেন না।
👉🏾 বা হয়তো বড় ডাক্তার বা আইএস অফিসার। সবাই সুট বুট পড়ে সেলাম ঠুকতো, ৫ বছর বাদে রইল না সেই অফিস রইল না সেই পদমর্যাদা।
C- Loss of professional relationship: হারিয়ে ফেলি প্রফেশনাল আত্মীয়তা।
অফিসের চেনা পরিচিত কলিগরা দূরে ছিটকে চলে যেতে থাকেন। যাদের সঙ্গে প্রতিদিন দশবার করে কথা হতো। এখন দশ মাসে একবার হয় না।👉🏾 D - Loss of purpose of life: হারিয়ে ফেলি আমাদের জীবনের উদ্দেশ্য। ডাক্তারের কাজ ছিল পেশেন্টকে ভালো করা, টিচারের কাজ ছিল স্কুলের ছেলে মেয়েকে পড়ানো,
কিন্তু এখন রিটায়ার করার পরে খুঁজে বেড়াতে হয় কিভাবে সমাজকে দেব?
কিভাবে সাফল্য পাবো? আপনি যদি রিটায়ারমেন্টের মুখোমুখি হন তাহলে মনে করছেন হয়তো সাফল্য কেন দরকার, সত্যি কি তাই দরকার? কিন্তু মানুষের যদি সাফল্য না আসে তাহলে উদ্দেশ্যহীনতায় ভুগতে ভুগতে আমরা একদিন মানসিক রোগীর পর্যায়ে পৌঁছে যাব।
👉🏾 আর অনেকেরই সে সময়ে ছেলে মেয়েরা বাড়ির বাইরে। ফলে বাড়িতেও এম্পটি নেস্ট সিন্ড্রমে হাঁফিয়ে ওঠার দশা ।
E - Loss of power: আজকে আমি ৫৯ বছর বয়সের আইএএস অফিসার। আমার কলমের খোঁচায় মানুষের চাকরি হয়। একটা ডিপার্টমেন্ট ওঠে বসে, কিন্তু আজ রিটায়ারমেন্টের এই দ্বিতীয় ধাপে এসে বুঝতে পারছি আমি থাকা না থাকাতে আমার সেই পুরনো ডিপার্টমেন্টের কিছুই যায় আসে না।
👉🏾 এই ছিল সঙ্কটের দ্বিতীয় ফেজের সমস্যা। রিটায়ার করার পরে আমি ঘুরতে যাব, আরামে থাকব, সেটা অনেকেই মনে করেন। কিন্তু এই যে ক্ষমতাগুলো হারিয়ে যায়, নিজের সক্রিয়তা, নিজের স্বাধীনতা নিজের জীবনের মূল্যবোধ হারিয়ে যেতে থাকে- মনটা আঁকু পাঁকু করে পৃথিবীকে নতুন কিছু দেওয়ার জন্য। কারণ আপনার গড় আয়ু বেড়েছে।
👉🏾 আজকে এই বয়সেও আপনি বহু বছর ধরে মানসিকভাবে এবং শারীরিকভাবে সুস্থ। রিটায়ার করার পরেও হয়তো আপনি 30 বছর ধরে বেঁচে রয়েছেন। জীবনের বুদ্ধি বিবেচনা ক্ষমতার শীর্ষে। কিন্তু আপনার কথা শোনার কেউ নেই। এই সময়ে অনেকেরই আসে ডিপ্রেশন। কারো জীবন সঙ্গী বা সঙ্গিনী হারিয়ে যান।
👉🏾 আমাদের শারীরিক কর্ম ক্ষমতা তখন আস্তে আস্তে কমতে শুরু করেছে। কিন্তু এতটাও কমেনি যে আমরা কিছুই করতে পারছি না। মন চাইছে কিছু করতে কিন্তু করার সুযোগ নেই। সবমিলিয়ে একটা অভূতপূর্ব সংকট। যে সংকটের জন্য আমি আপনি কেউই তৈরি ছিলাম না।
👉🏾 কিন্তু এই সময় আপনাকে হবে ঘুরে দাঁড়াতে। নইলে তৃতীয় এবং চতুর্থ ধাপে আপনি পৌঁছতে পারবেন না। তৃতীয় আর চতুর্থ ধাপে রয়েছে আপনার উত্তরণের রাস্তা। কিন্তু তৃতীয় আর চতুর্থ ধাপে পৌঁছতে গেলে আপনাকে এই দ্বিতীয় ধাপের ডিপ্রেশন, অ্যাংজাইটি মন খারাপ এইসব সমস্তর মধ্যে দিয়েই যেতে হবে। যদি আপনি আগে থেকে তৈরি না থাকেন।
👉🏾 এই সময় বেশিরভাগ মানুষই শুনতে পারেন তাদের অন্তরের ডাক। বুঝতে পারেন এইভাবে জীবন চলে না। আমাকে ঘুরে দাঁড়াতেই হবে।
👉🏾 তারপর শুনি কি বললেন ডক্টর রাইলি, তৃতীয় ধাপ
PHASE - 3
💃🏾 Phase 3: Trial and Error
👉🏾 চেষ্টা চরিত্র করে দেখতে হবে যে এবার আমি নতুন কি করতে পারি? আগে আমি যা করতে পারতাম তার অনেক কিছুই এখন আর আমি করতে পারবো না। যে কলমের খোঁচায় ডিপার্টমেন্ট উঠতো বসত আজ সেই ডিপার্টমেন্ট আমার তোয়াক্কা করে না। তাহলে কি কলমের খোঁচাটা চলে যাবে? না নিশ্চয়ই নয়।
👉🏾 সেই কলমের খোঁচায় হয়ে উঠতে পারেন কোন বিশ্ববিদ্যালয়ের উপদেষ্টা। শহরের বিশিষ্ট ব্যক্তিত্ব যাঁর কাছে আমরা সবাই গিয়ে মতামত নেব, জীবন কোন পথে চলা দরকার। প্রচুর পড়াশোনা করে হয়তো নিজেকেও তার জন্য আপ টু ডেট রাখতে হবে। সেই কলমের খোঁচায় আজকে আপনি তৈরি করতে পারেন একটা কবিতা। নতুন একটা আঁকা। যে হলিডেতে যাচ্ছেন সেখানে নিশ্চুপভাবে বাসে বসে না থেকে লিখতে শুরু করুন সেই যাত্রাপথের জন্য দারুণ টিপস।
👉🏾 আপনার জীবনের ছোট ছোট অভিজ্ঞতাগুলো নিয়ে লিখে ফেলতে পারেন একটা বই। যেটা পড়বো আমরা সবাই। না পয়সার রোজগারের জন্য আপনি এ সমস্ত করছেন না। করছেন আপনার নিজের জন্য, সমাজকে এক চিলতে কিছু হলেও নতুন কিছু দেওয়ার জন্য। হ্যাঁ আপনার বই হয়তো লক্ষ কোটি মানুষ পড়বেন না। কিন্তু কেউ না কেউ পড়বেন। সুতরাং নিস্তরঙ্গ জীবনের মধ্যে খুঁজুন সমাজকে দেওয়ার জন্য কিছু মণি মাণিক্য। ঠিক যেমন ভগবান বুদ্ধ বলেছিলেন,
👉🏾 Give, even if you have only a little, আর এই কাজ করতে করতেই আপনি পৌঁছে যাবেন
PHASE - 4
🥳 Phase 4: Reinvent
মেতে উঠুন। নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের খেলায়। সেদিন হয়তো আপনি আর টিচার নন, সেদিন আপনি শিল্পী। সেদিন আপনি হার্ট সার্জেন্ নন সেদিন আপনি সেলিব্রিটি কুক। এর মধ্যে কোন অসম্মান বা দুঃখ নেই।
রয়েছে জীবনকে নতুন করে খুঁজে পাওয়ার এক হাতছানি। প্রচুর হাঁটুন।
👉🏾 টার্গেট করুন প্রতি বছর একটা করে নতুন স্কিল শিখতে। তবেই ব্রেনে নতুন নার্ভের কানেকশন তৈরি হবে। রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বাড়বে। প্রফেসর গুডেনাফের মতো নিজের দিকেও তাকিয়ে মনে হবে I am good enough.
👉🏾 শুধু আত্মীয়-স্বজনের মুখের দিকে তাকিয়ে সুখ খুঁজে পাবার চেষ্টা করবেন না। চলে যান ফটোগ্রাফি ক্লাসে। ক্রিয়েটিভ রাইটিং এর ক্লাসে। ছাত্র হয়ে বা শিক্ষক হয়ে।
👉🏾 কাজ করার সুযোগ থাকলে বিছানায় পড়ার আগে পর্যন্ত কাজ করে যান। যা পারবেন তাই। কাজের ধরনের শেষ নেই।
👉🏾 ষাট সত্তর বছরের আপনার অপরিমিত অভিজ্ঞতা ফেলে দেওয়ার নয়। চেষ্টা চালিয়ে যান জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত যাতে আপনি সমাজকে সমৃদ্ধ করতে পারেন। আর সাথে পেতে পারেন নিজের শরীর এবং মন ভালো রাখার রসদ।
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Reference:
https://www.thefourphases.com/about-the-author/
Search help: Retirement Phases of Retirement














