আধুনিক প্যাপ স্মিয়ার (Liquid Based Cytology)
সচেতনতার অভাবে মহিলারা এই পরীক্ষা করান না। এর ফলে যতদিন না ক্যান্সার বড় হয়ে উপসর্গ দিচ্ছে, তার আগে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এর নির্ণয় হয় না - সারভাইকাল ক্যান্সার প্রতিরোধের উপায় হলো এই প্যাপ স্মিয়ার
সার্ভিক্স স্মিয়ার বা প্যাপ স্মিয়ার (Liquid Based Cytology)
সার্ভিক্স কী?
সার্ভিক্স, জরায়ু বা ইউটেরাসের সবথেকে নীচের অংশ, যাকে বলা যেতে পারে জরায়ু-মুখ, যা কিনা যৌনাঙ্গ বা ভ্যাজাইনার উপরের দিকেই থাকে। ভ্যাজাইনার নিচ থেকে দুপাশের টিস্যু পাশে সরালেই, কোনও সার্জারি ছাড়াই সার্ভিক্স কে খালি চোখে দেখা যায়।
সারভাইকাল ক্যান্সার কী?
সারভাইকাল ক্যান্সার হল, এই সার্ভিক্সের ক্যান্সার। কখনও কিছু অস্বাভাবিক কোষ সার্ভিক্সের মধ্যে অতিরিক্তভাবে বৃদ্ধি পায় এবং ক্যান্সার-ঘটিত টিউমার তৈরী করে। পরবর্তীকালে টিউমারটি আকারে বৃদ্ধি পায় এবং দেহের অন্যান্য স্থানে ছড়িয়ে পড়ে বিপজ্জনক পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
ভাবতে অবাক লাগে, শুধুমাত্র এই ভারতবর্ষে প্রতি ঘন্টায় প্রায় ৮ জন মহিলা এই ক্যান্সারে প্রাণ হারাচ্ছেন। অথচ বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই এই ক্যান্সারকে প্রাক ক্যান্সার অবস্থায় প্রতিরোধ করে দেওয়া সম্ভব, সাধারণ স্বল্প ব্যয়ের কিছু পরীক্ষার মাধ্যমে। তবে সামাজিক সচেতনতার অভাবে মহিলারা এই পরীক্ষা করান না। ফলে, যতদিন না ক্যান্সার বড় হয়ে উপসর্গ দেখা না দিচ্ছে, তার আগে দুর্ভাগ্যজনকভাবে এই রোগ নির্ণয় হয় না।
সারভাইকাল স্ক্রীনিং বা স্মিয়ার পরীক্ষা কী?
স্মিয়ার পরীক্ষার সময় আপনার সার্ভিক্স থেকে অল্প কিছু কোষ তুলি দিয়ে উঠিয়ে নেওয়া হয়। তারপর সেই নমুনা একটি প্যাথলজি ল্যাবে পাঠিয়ে, অনুবীক্ষণ যন্ত্র বা মাইক্রোস্কোপের তলায় রেখে দেখা হয় কোনো অস্বাভাবিক কোষ আছে কিনা।
এই পরীক্ষা WHO বা ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন অনুমোদিত।
বর্তমানে একই সাথে নমুনাটি কোন ধরণের হিউম্যান প্যাপিলোমা ভাইরাস বা HPV আক্রান্ত কিনা, তা জানার পরীক্ষা করা যেতে পারে। এই ভাইরাস পরীক্ষা করলে শুধুমাত্র যে, স্মিয়ারের রিপোর্ট আরও ভালো ভাবে বোঝা যায় তাই নয়, ভাইরাস না থাকলে নিশ্চিন্ততার পরিমাপও বাড়ে।
স্ক্রীনিং টেস্টের এক কথায় অর্থ হল, চটজলদি পরীক্ষার মাধ্যমে উপসর্গ নজরে আসার আগেই কোনো ক্ষতিকর অসুখের সন্ধান পাওয়া। বিজ্ঞান এখনও সব ক্যান্সারের স্ক্রীনিং আবিস্কার করে উঠতে পারেনি। তবে, এই ক্যান্সারে জানতে পেরেছে।
অস্বাভাবিক কোষ থাকা মানেই কী, আমার সারভাইকাল ক্যান্সার হয়েছে?
অস্বাভাবিক কোষ থাকা মানেই, আপনার ক্যান্সার হয়েছে বা হওয়ার সম্ভাবনা তৈরী হয়েছে এমন একেবারেই নয়। অনেক সময় সংক্রমণের কারণে বা হরমোন লেভেলের তারতম্যের কারণেও, অস্বাভাবিক কোষের উপস্থিতি থাকা সম্ভব।
তবে সত্যি যদি আপনার অস্বাভাবিক কোষগুলি প্রাক ক্যান্সার কোষ হয়ে থাকে, তবে চিকিৎসা না করালে তাদের থেকে ক্যান্সার হওয়ার প্রবল সম্ভাবনা থাকে।
HPV কী ?
HPV খুবই সাধারণ ধরণের ভাইরাস। বেশীরভাগ মানুষই জীবনের কোনো না কোনো সময়ে এই ভাইরাস দ্বারা আক্রান্ত হয়েছেন।
সাধারণত, এই ভাইরাসে আক্রান্ত হলে কোনো উপসর্গ প্রথমে নজরে আসে না। এর কোনো অ্যান্টিবায়োটিক বা অ্যান্টিভাইরাল ওষুধও নেই।
শুধু ক্যান্সার সৃষ্টি হলে তবেই উপসর্গ সামনে আসে। এখনও অবধি প্রায় ১৭০ প্রকারের HPV আবিষ্কার হয়েছে। যার মধ্যে প্রায় ৪০ প্রকার শুধুমাত্র যৌন কার্যকলাপের মাধ্যমে মহিলা এবং পুরুষদের মধ্যে সংক্রামিত হয়।
HPV দ্বারা কোন কোন ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা থাকে?
সার্ভিক্স, স্ত্রীযোনিদ্বার বা ভালভা, যোনি বা ভ্যাজাইনা, শিশ্ন বা পেনিস, মলদ্বার বা অ্যানাস, মুখের ভিতরের ক্যান্সার এবং গলার ক্যান্সার। এর মধ্যে সার্ভিক্সের ক্যান্সার সবচেয়ে বেশী সংখ্যায় হয়।
সারভাইকাল ক্যান্সার কীভাবে হয়?
যে ধরণের HPV সারভাইকাল ক্যান্সারের কারণ, তারা আপনার সার্ভিক্সে কোনো রোগ-লক্ষণ ছাড়াই সংক্রমণ সৃষ্টি করতে পারে। বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই আপনার শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা আপনার অজ্ঞাতেই আপনার সার্ভিক্সকে রোগ মুক্ত করে তোলে। কিন্তু, কিছু সময়ে এই HPV সংক্রমণ আপনার সার্ভিক্সের কিছু কোষকে অস্বাভাবিক করে তুলতে পারে।
সাধারণত, আপনার শরীর এই অস্বাভাবিক কোষগুলিকেও দূর করে দিতে পারে। পাশাপাশি আপনার সার্ভিক্স পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে যায।
কিন্তু কিছু সময়ে যখন শরীর এই অস্বাভাবিক কোষগুলিকে দূর করতে পারে না, তখন আস্তে আস্তে এই অস্বাভাবিক কোষগুলো ক্যান্সারে রূপান্তরিত হয়। এটা জানা সম্ভব নয়, কার শরীর কীভাবে বা কখন এই ভাইরাসকে পরাস্ত করতে পারবে বা পারবে না।
স্মিয়ার পরীক্ষার ফলাফলে অস্বাভাবিক কোষের উপস্থিতি ধরা পড়লে, তখন কী করা প্রয়োজন?
অস্বাভাবিক প্রাক ক্যান্সার কোষ থাকলে, পরবর্তী ধাপে আপনাকে কল্পোস্কোপি বলে আরেকটি পরীক্ষা করার কথা বলা হতে পারে। এই পরীক্ষার মাধ্যমে আপনার সার্ভিক্সকে আরও পরিষ্কারভাবে দেখা সম্ভব। যদি কল্পোস্কোপি করার সময় সার্ভিক্সে অস্বাভাবিক কোষের উপস্থিতি ধরা পড়ে তাহলে, কিছু মেডিকাল প্রক্রিয়ায় সেই অস্বাভাবিক কোষগুলিকে সার্ভিক্স থেকে অপসারণ করা হয়। এইভাবে স্মিয়ার পরীক্ষা সার্ভিক্সকে ক্যান্সার মুক্ত রাখতে পারে।
অস্বাভাবিক কোষ না পাওয়া গেলেও বা কোনো উপসর্গ না থাকলেও, প্রতি তিন বছর অন্তর মহিলাদের এই স্মিয়ার টেস্ট করানো উচিৎ ৫০ বছর বয়স পর্যন্ত। তারপর ৫ বছর অন্তর ৬৫ পর্যন্ত। স্মিয়ার টেস্টের সাথে ভাইরাস পরীক্ষা করা হয়ে থাকলে, কম বয়েসী মহিলাদেরও প্রতি ৫ বছর অন্তর এই টেস্ট করলেই চলে।
সমস্ত মহিলারই কী এই স্মিয়ার টেস্ট করানো উচিৎ?
২৫-৬৪ বছর বয়সী সব মহিলারই স্মিয়ার পরীক্ষা করানো উচিত।
আপনার যদি ১) হিস্টেরেক্টমি বা অপারেশনের সাহায্যে ইউটেরাস বা জরায়ুর পুরোটাই বাদ দেওয়া হয়ে থাকে, ২) আপনার বয়স যদি ৬৫ বছরের বেশি হয়, ৩) আপনি যদি প্রেগনান্ট হন, তবে স্মিয়ার পরীক্ষার আগে ডাক্তারের পরামর্শ নিন।
আমি কখনই কারুর সঙ্গে যৌন সংসর্গ করিনি। আমার কি স্মিয়ার টেস্ট করা প্রয়োজন?
যেসব মহিলার জীবনে কখনই যৌন সংসর্গ হয়নি (মহিলা বা পুরুষ কারুর সঙ্গেই নয়), তাদের সার্ভাইক্যাল ক্যান্সার হওয়ার ঝুঁকি ভীষণই কম। যদিও একদম ঝুঁকি নেই আর কম ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে বিস্তর ফারাক।
আমাকে বলা হয়েছে যে আমার যদি কেবল একজনই যৌন সঙ্গী থাকে, তবে আমার স্মিয়ার পরীক্ষা করার দরকার নেই– এটা কি সত্যি?
এটা সম্পূর্ণ ভ্রান্ত এবং অত্যন্ত বিপজ্জনক ধারণা। ২৫-৬৪ বছর বয়সী সব মহিলারই স্মিয়ার পরীক্ষা করানো উচিৎ।
আমাকে বলা হয়েছে, আমি যেহেতু শুধুমাত্র মহিলাদের সঙ্গে যৌন সংসর্গ করেছি, আমার সারভাইকাল ক্যান্সার হওয়ার সম্ভাবনা নেই। কথাটি কতদূর সত্যি?
না কথাটি সত্যি নয়। রিসার্চ থেকে জানা যায়, নারী-পুরুষ যৌন সংসর্গের মাধ্যমে খুব সহজেই HPV সংক্রমণ হয়। কিন্তু নারী-নারী বা লেসবিয়ান (lesbian) যৌন সংসর্গের মাধ্যমেও HPV সংক্রমণ হতে পারে। কারণ, অন্যান্য যৌন সংক্রমণের মতই HPV ও দেহ-নিঃসৃত রসের মাধ্যমে নীরবে সংক্রমণ ঘটায়।আমি HPV ভ্যাকসিন বা টিকা নিয়েছি, আমার কি আর স্মিয়ার করার দরকার আছে?
আমি HPV ভ্যাক্সিন বা টিকা নিয়েছি, আমার কি আর স্মিয়ার করার দরকার আছে ?
বর্তমান আন্তর্জাতিক সুপারিশ অনুযায়ী, HPV ভ্যাকসিন গ্রহীতাদেরও স্মিয়ার করার প্রয়োজন। যদিও HPV টিকা খুব কার্যকরী, কিন্তু, ক্যান্সারের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে যেখানে সম্ভব HPV টিকার সাথে সাথে স্মিয়ারের মাধ্যমেও যৌথ আক্রমণ চালিয়ে যাওয়া প্রয়োজন। এই আলোচনায় আমরা HPV টিকা নিয়ে বিশদে কিছু বলছি না। আশা রাখছি, পরবর্তীকালে এই নিয়ে আলোচনা হবে।
স্মিয়ার পরীক্ষার সময়ে ঠিক কী হয়?
জরায়ুর মুখ বা সার্ভিক্স কোনো অপারেশন ছাড়াই দৃশ্যমান করে তোলার জন্য ডাক্তার স্পেকিউলাম নামের একটা ছোট যন্ত্র, যা আপনার যৌনাঙ্গের মধ্যে খুব সাবধানে আস্তে আস্তে প্রবেশ করাবেন। স্পেকিউলাম একটি অত্যন্ত ছোট মসৃণ জিনিস, যার কোনো ধারালো অংশ নেই। তারপর একটি ছোট তুলি দিয়ে সার্ভিক্সের উপরিভাগ থেকে কিছু কোষ সংগ্রহ করবেন। এই সংগৃহীত কোষগুলিকে একটি তরল পদার্থ ভর্তি বোতলে সরিয়ে রাখবেন, যা মাইক্রোস্কোপের তলায় পরীক্ষার জন্য পাঠানো হবে।
এই পুরো প্রক্রিয়া কয়েক মিনিটেই হয়ে যায়। পরীক্ষার পরেই আপনি স্বাভাবিকভাবে আপনার কাজে ফিরতে পারবেন।
স্মিয়ার পরীক্ষার আগে কি কোনো প্রস্তুতি দরকার?
খাওয়া-দাওয়া বা চলাফেরায় কোনো বিধিনিষেধ নেই। কেবল সার্ভিক্সের পলকা ভাসমান কোষগুলো যাতে ভালোভাবে নমুনায় আসে, তার জন্য, ৩ দিন আগে থেকে কিছু সাধারণ সাবধানতা অবলম্বন করতে হয়, যা আপনাকে বলে দেওয়া হবে। পিরিয়ডস চলাকালীন সাধারণত এই পরীক্ষা করা হয় না।
স্মিয়ার টেস্ট করালে ব্যথা হয় কি ?
পরীক্ষার সময়ে আপনি অল্প কিছু সময়ের জন্য সামান্য অস্বস্তি বোধ করতে পারেন। যদি খুব অসুবিধে হয় তাহলে, তখনই আপনার ডাক্তারকে জানান।
আমি কতদিনের মধ্যে আমার স্মিয়ার পরীক্ষার ফলাফল আশা করতে পারি?
সাধারণত স্মিয়ার পরীক্ষার দুই সপ্তাহের মধ্যে আপনি ফল জানতে পারবেন।
আরও জানতে নিচে কমেন্ট করুন ।
আমাদের HPV ভ্যাকসিনের ওপর ইউটিউব ভিডিও দেখতে এখানে ক্লিক করুন
Vaccine for cancer | Cervical Cancer | Dr Manas Chakrabarti
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Cervix Pap smear Cervical Cancer Cervical Screening HPV Hysterectomy Colposcopy





