হিস্টেরেক্টমি - অতীত এবং বর্তমান!
ইতিহাসে প্রথম সফল নথিভুক্ত ভ্যাজাইনাল হিস্টেরেক্টমি করেন পেশেন্ট নিজেই। এক মহিলা নিজেই নিজের অপারেশন করেছিলেন। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৭ শতকের গোড়ার দিকে।
সাধারণ দৃষ্টিতে দেখতে গেলে, ‘হিস্টেরেক্টমি’ যেন এক সাধারণ অপারেশন। এই যুগে দাঁড়িয়ে এটি প্রায় একটি গৃহস্থালী নাম, যা, মহিলা এবং পুরুষদের মধ্যে ব্যাপকভাবে পরিচিত৷
কারও কারও কাছে এটি স্বস্তির কারণ। কেউ কেউ আবার হিস্টেরেক্টমির নাম শুনলে ভয়ঙ্কর উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন।
এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই যে, হিস্টেরেক্টমি কেবল আধুনিক চিকিৎসাশাস্ত্র প্রসূত। হিস্টেরেক্টমির ধারণা ৫০ খ্রিস্টপূর্বাব্দেও প্রচলিত ছিল বলে মনে করা হয়। শোনা যায়, এথেন্সে থেমিসন নামে একজন প্রথম এই ধরনের অপারেশন করেছিলেন। তবে এরপর রোগীর কী অবস্থা ছিল, তা অবশ্য জানা যায়নি।
হিস্টেরেক্টমি সাধারণত দু’ভাবে করা যায়। যেখানে অপারেশন পেট দিয়ে হয়, তার নাম অ্যাবডোমিনাল হিস্টেরেক্টমি- যা ওপেন সার্জারি। আর যেটাতে সার্জেন অপারেশন করেন, দু’পায়ের মাঝখানে ভ্যাজাইনার ভেতর দিয়ে, তার নাম ভ্যাজাইনাল হিস্টেরেক্টমি। অ্যাবডোমিনাল হিস্টেরেক্টমি ইদানিং পেট না কেটেও হয়- তার নাম ল্যাপারোস্কোপিক হিস্টেরেক্টমি। রোবোটিক সার্জারিও ল্যাপারোস্কোপি সার্জারির এক অংশ।
মজার বিষয় হল! যতদূর জানা যায়, ইতিহাসে প্রথম সফল নথিভুক্ত ভ্যাজাইনাল হিস্টেরেক্টমি করেন পেশেন্ট নিজেই।
এক মহিলা নিজেই নিজের অপারেশন করেছিলেন। ঘটনাটি ঘটেছিল ১৭ শতকের গোড়ার দিকে।
ফেইথ হাওয়ার্থ, নামে একজন মহিলা কৃষক তার প্রল্যাপসড ইউটেরাস নিয়ে খুবই সমস্যায় ভুগছিলেন।
তার ইউটেরাস প্রল্যাপস হয়ে গিয়েছিল এবং তার পায়ের মাঝখান থেকে ইউটেরাস তার শরীরের বাইরে ঝুলছিল। এই অবস্থায় তাকে ভারী চাষের কাজ করতে হত। প্রচণ্ড বিরক্ত হয়ে, একদিন সেই ফেইথ হাওয়ার্থ তার ইউটেরাস যতটা সম্ভব টেনে বের করে, ধারালো ছুরি দিয়ে কেটে ফেলেছিলেন।
হিস্টেরেক্টমি বহু শতাব্দী ধরে, একটি অত্যন্ত প্রয়োজনীয় অস্ত্রোপচার হিসাবে বিবেচিত হয়ে আসছে। কিন্তু, ইনফেকশনের জন্য হিস্টেরেক্টমি বা এই ধরনের সার্জারির ফলাফল আশাব্যঞ্জক ছিল না। কারণ, তখনও অ্যান্টিবায়োটিক আসেনি।
আলেকজান্ডার ফ্লেমিং, প্রথম অ্যান্টিবায়োটিক পেনিসিলিন আবিষ্কার করার ১৪ বছর পর, প্রায় ১৯৪২ সালের দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধের সময় থেকে পৃথিবীতে অ্যান্টিবায়োটিক ব্যবহার শুরু হয়।
অ্যান্টিবায়োটিকের আবির্ভাবের পর, হিস্টেরেক্টমি সহ অনেক অস্ত্রোপচারে সুফল আসতে শুরু করে। তারপর থেকে হিস্টেরেক্টমি সার্জারির ক্ষেত্রে অনেক আধুনিক হাওয়া বয়ে গেছে। কয়েক দশকের চিকিৎসা-গবেষণার মাধ্যমে উন্নতি হয়েছে আকাশ ছোঁয়া।
আজকাল তো পেশেন্টের পেট না কেটেও, হিস্টেরেক্টমি করা যায়। একে ডাক্তারি পরিভাষায় ল্যাপারোস্কোপি বা কী-হোল সার্জারি বলা হয়। এসেছে রোবোটিক সার্জারিও । তবে তা, খরচ সাপেক্ষ। একমাত্র ছেলেদের প্রস্টেট ক্যান্সারের জন্য এক বিশেষ সার্জারিতে রোবোটিক সার্জারির বিজ্ঞানভিত্তি বেশ প্রবল। এই বিশেষ প্রস্টেট সার্জারি ছাড়া অন্যান্য ক্ষেত্রে রোবোটিক সার্জারি পেশেন্টকে কোনও বাড়তি আয়ু বা দীর্ঘমেয়াদি সুবিধে দিতে পারে না। তবে সার্জেন চেয়ারে বসে সার্জারি করতে পারেন। রোবোটিক সার্জারির আবিষ্কার হয়েছিল, যুদ্ধক্ষেত্রে আহত সেনাদের যাতে পৃথিবীর অন্য এক প্রান্ত থেকে ইন্টারনেটের সাহায্যে সার্জারি করান যায়। যেমন ধরুন, ইরাকে কোনো সেনা আহত হলে, নিউইয়র্কে বসে সার্জেন যাতে ইরাকে সার্জারি করতে পারেন।
তাই আজকাল রোবোটিক গাইনকলজিকাল সার্জারি নিয়েও কাগজ টেলিভিশনে বেশ শোরগোল দেখা যাচ্ছে।
যদিও নিরপেক্ষ বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে হিস্টেরেক্টমি সার্জারিতে, রোবোটিক সার্জারির প্রয়োজন বাধ্যতামূলক নয়। পারদর্শী সার্জন চিরাচরিত ল্যাপারোস্কোপিতেই ক্যান্সারের ট্রিটমেন্টও করে দিতে পারেন। এতে কষ্ট, ব্লিডিং আর খরচ সবই আয়ত্তের মধ্যে। তবে নন-রোবোটিক ল্যাপারোস্কোপির জন্য হাত সেট করার টেনিং নিতে সার্জেনের জীবনে অনেক সময় কেটে যায়।
সার্জারির যেমন উন্নতি হয়েছে, তেমন উন্নতি হয়েছে অ্যান্টিবায়োটিকসহ নানা প্রয়োজনীয় প্রযুক্তির। তবে সতর্কতাও প্রয়োজন। একজন সার্জেন হিসেবে আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে, মহিলাদের অপারেশন শুরুর ঠিক কত মিনিট আগে, অ্যান্টিবায়োটিক দিলে তার সুফল পাওয়া যাবে। শুধু তাই নয়, ব্লাড লস প্রতিরোধের জন্য অপারেশনের যন্ত্রপাতি ও ব্যবহৃত রাসায়নিক বর্তমানে প্রভূত উন্নতি করেছে।
বর্তমানে যে সমস্ত মহিলারা চিকিৎসার জন্য আমাদের কাছে আসেন, তারা জানেন আমরা তাদের এক শান্ত, স্ট্রেস-বিহীন পরিবেশে তাঁদের চিকিৎসা দিতে সক্ষম। আর এই পরিবেশে সার্জারি, তাঁদের মনে ভীতির পরিবর্তে আত্মবিশ্বাস ফুটিয়ে তোলে। বেশীরভাগ পেশেন্টই অপারেশনের ভীতি কাটিয়ে সন্তোষজনক অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফেরেন।
এটা ঠিকই যে গতদশকে হিস্টেরেক্টমির প্রয়োজন কমে এসেছে অনেক। নানা অত্যাধুনিক ওষুধ এবং ছোট অপারেশন, যেমন হিস্টেরোস্কোপির মাধ্যমে, হিস্টেরেক্টমির সংখ্যা কমে এসেছে অনেক। তবুও কিছু ক্ষেত্রে, যখন আর কিছুই কাজ করে না, তখন এই অপারেশন করা আধুনিককালেও জীবনদায়ী। ক্যান্সার হয়ে থাকলে বা ক্যান্সারের ঝুঁকি থাকলে, এধরনের সার্জারি পেশেন্টকে নতুন জীবনের খোঁজ দেয়।
এখন প্রচুর টাইপের হিস্টেরেক্টমি সার্জারির প্রচলন হয়ে গেছে। শারীরিক অবস্থা ও প্রয়োজন বুঝে কোন পেশেন্টের কোন ধরনের হিস্টেরেক্টমি দরকার, তা ডাক্তারবাবুর সঙ্গে বিশদে আলোচনা করে নিন। আপনি যদি এই সার্জারি সম্পর্কে আরও বিশদে জানতে চান, তবে আপনি হিস্টেরেক্টমি সম্পর্কে আমাদের আরেকটি আর্টিকল পড়তে পারেন, এখানে ক্লিক করে।
(এই টপিকের বাংলা লিঙ্ক উপরের পেজ)
(The English version of the page can be found by clicking here)
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: History Hysterectomy Uterus laparoscopy keyhole Surgery Abdomen Surgery







