#নুন (পর্ব ৩ )
গ্র্যান্ড গ্যাবেল ছিল ফ্রান্সের কুখ্যাত সল্ট-ট্যাক্স ল'! লবণ চোরাকারবারীদের দাপট হয়ে উঠেছিল অসম্ভব বেশি। মানুষ উঠেছিল হাঁপিয়ে। বাকি পর্বের লিঙ্ক নিচে রইল
কিন্তু না, ইস্ট ইন্ডিয়া থেকে আসা করের টাকার লোভ সামলাতে পারেনি কেউই।
ভাবছেন তো আহা, ছিছি কি খারাপ ছিল ইংল্যান্ড। তা ছিল, অত কর ভারতের ইতিহাসে কেউ নেয়নি।
কিন্তু গুপ্ত যুগেও লবণের ওপর ট্যাক্স ছিল। লবণাধক্ষ্য নামের অত্যাচারী অফিসার ছিল সারা গুপ্ত সাম্রাজ্য জুড়ে।
মুঘল আমলেও নুন কর নেওয়া হতো। এমন ভাবে নেওয়া হতো যে সেটা আজকের রাজনৈতিক বাতাবরণে একটা ডায়নামাইট হতে পারে, তাই আর আলোচনা না করাই ভালো।
তবে, সে ট্যাক্স ব্রিটিশদের নেওয়া ট্যাক্স থেকে নিতান্তই ছা-পোষা।
গান্ধী তো অনেক অবিচার নিয়েই আন্দোলন করতে পারতেন। করেওছিলেন। কিন্তু সবরমতি থেকে সেই লবণ সত্যাগ্রহের মতো সাড়া বোধহয় আর কিছুতে পরে নি। সেই হনহন করে হাঁটা।
স্বাধীনতা - পরাধীনতা এসব কাগুজে ভাষা। রক্ত গরম হয়, কিন্তু ঐটুকুই (মাপ করবেন)।
কিন্তু বিপ্লবের স্বতঃস্ফূর্ততা আসে সেটা নিয়ে আন্দোলন করলে, যেটা মানুষের পেটে প্রতিদিন লাথি মারছে।
তখন লবণ নিয়ে ঘরে ঘরে অশান্তি। অতএব লবণ নিয়ে হাঁটো।
অভূতপূর্ব সাফল্য এলো ইংরেজ বিরোধী আন্দোলনের। ইংল্যান্ডের শিক্ষিত অংশও সেদিন শ্রদ্ধাবনত হলো গান্ধীর অমোঘ দাবার চালে।
খাবার জিনিস আর বিপ্লব। ডেডলি কম্বিনেশন। ফ্রান্স কি দূরে থাকতে পারে?
এসমি আর তার বয়ফ্রেন্ড আমাদের ক্যান্টারবেরির বাসায় সর্ষেইলিশ আর বাসমতি চাখতে এসেছে। এসমি ফ্রেঞ্চ। আমার হসপিটালেরই মেডিসিনের রেজিস্ট্রার। এড্রিয়েন পেইন্টার। দুহাতে কাঁটায় ঝোলে মাখামাখি, কিন্তু তাতে কি। জমিয়ে গল্প চলছে।
এসমি বলে বলতো, ফ্রেঞ্চ রেভোলুশনের কারণ কি ?
— লিবরটি, ইকোয়ালিটি আর ফ্রাট্যার্নীটি - এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলি। এতো সবাই জানে।
— ধুর ধুর 'ম্যানাস' বোর করো না তো। সেসব তো স্লোগান।
এসব গালভরা কথা বললে লোকজন জানলার পর্দা ফাঁক করে ২ মিনিট কৌতূহলী হতে পারে কিন্তু দলে দলে রাস্তায় নামবে কি?
নামবে না !
এসমি বলে সাধারণ মানুষ লড়েছিল তাঁদের পেটের তাগিদে। গ্র্যান্ড গ্যাবেল, স্মাগলিং আর গিলোটিনের মাত্রাতিরিক্ত অত্যাচারে। গ্র্যান্ড গ্যাবেল ছিল ফ্রান্সের কুখ্যাত সল্ট-ট্যাক্স ল'!
১৭৭৩ এ ফ্রান্সের কিছু প্রান্তে লবণ ছিল নিঃশুল্ক, আর কাছেই আরেক অঞ্চলে দাম ছিল কুড়ি গুণ বেশি। স্বভাবতই কমদামি জায়গা থেকে দামি জায়গায় লবণ স্মাগলিং হতো। লবণ চোরাকারবারীদের দাপট হয়ে উঠেছিল অসম্ভব বেশি। মানুষ উঠেছিল হাঁপিয়ে।
এছাড়াও যাকে তাকে দোষ দিয়ে গিলোটিনে চাপিয়ে মাথা কেটে দেওয়া হতো।
দমবন্ধ প্রেসার কুকারের মত একদিন তা ফেটে যায় যার নাম- ফ্রেঞ্চ রেভোলুশন ।
কিন্তু ভাগ্যের পরিহাস এমনই যে কিছুদিনের মধ্যেই আবার নেপোলিয়ন লবণ কর পুনর্বহাল করেন। নানারূপে, নানা গন্ধে, নানা বর্ণে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরেও সে সল্ট ট্যাক্স চলেছে -যদিও কম মাত্রায়।
রাশিয়াতেও প্রায় সেই একই গল্প!
১৬৪৮ সালের মস্কো উত্থানের পেছনে ছিল এই লবণ কর। রাজকোষের ঘাটতি পূরণ করার জন্য লবণ কর হয়ে উঠেছিল মাত্রাতিরিক্ত।
লবণ করের উপরে আপামর জনসাধারনের বিক্ষোভ থেকে জন্ম নেয় রাশিয়ার বিখ্যাত 'অ্যাসেম্বলি অফ ল্যান্ড'। যে আইনশাস্ত্রে সমাজের সব স্তরের মানুষ অংশগ্রহণ করার সুযোগ পেয়েছিলেন।
সাধারণ মানুষের রাষ্ট্রব্যবস্থায় অংশগ্রহণের মতো হিতকারি বার্তা ছড়িয়ে দিতে মস্কোতে সেই প্রথম বসল এক বড়োসড়ো ছাপাখানা। শুরু হলো রাষ্ট্র ও জনগণের মধ্যে যোগাযোগের নতুন মাধ্যম।
ছাপা লিফলেট ।
লবণের হাত ধরে শুরু হলো এক নতুন ইতিহাস।
স্পেনেও আমরা দেখতে পাই বিখ্যাত সল্ট ট্যাক্স রিভল্ট। ১৬৩১ থেকে ১৬৩৪ সাল পর্যন্ত।
লবণ এসে বারংবার পরিবর্তন করে দিয়ে গেছে রাষ্ট্র, রাজনীতি এবং প্রজাতন্ত্রের ভাগ্য রেখা ।
ঐতিহাসিকরা বলেন আপাত নিরীহ এই পণ্য মানব সভ্যতার ইতিহাস এবং তার রাজনীতিতে বোধহয় প্রভাব বিস্তার করেছে সোনা এবং পেট্রো পণ্যের থেকেও অনেক বেশি।
পয়সা রোজগারের জন্য রাষ্ট্রকে চিরকালই হাত দিতে হয়েছে সাধারণ মানুষের পকেটে। কিছু বছর আগেই ট্যাক্স সংগ্রহের অছিলা হিসাবে পেট্রোল-ডিজেল ছিল না।
তাহলে কর আসবে কিভাবে?
কর বসানো উচিত এমন একটা কমোডিটির উপরে যেটা আপামর জনসাধারণের ব্যবহার্য। যার বাজার বেশি। যাতে তার উপরে সামান্য কর বসালেও সেটা রাষ্ট্র ভান্ডারে যোগান দেয় অঢেল অর্থের।
হলফ করে বলতে পারি, সাধারণ জ্ঞানের প্রশ্ন হিসেবে চীনের প্রাচীর কাদের নির্দেশে তৈরী হয়েছিল, তার উত্তর আপনার কাছে থাকলেও থাকতে পারে, কিন্তু চীনের প্রাচীরের অর্থ কে জুগিয়েছিল, তার উত্তর হয়ত আপনার অজানা।
এতক্ষণে অনুমান করে থাকলে, আপনি একদম সঠিক।
চীনের প্রাচীরের অর্থের বেশীরভাগ যোগানই এসেছিল লবণের উপর ধার্য করা কর থেকে!
যে সময় রোমান সাম্রাজ্য চলছে ইউরোপে তখন চিনে ৪০০ বছরের হান ডাইনাস্টির রাজত্ব। হান এবং ট্যাং ডাইনাস্টি (৬১৮-৯০৭ সাল) লবণের উপর এতটাই তীব্র বিধিনিষেধ রেখেছিলো, যে সেটা সরকারি রাজকোষের অর্থের প্রায় অর্ধেক যোগান দিত। লবণ উৎপাদন আর বিক্রির ওপর মনোপলি নীতি চাপানো হয়- যাতে নির্দিষ্ট কিছু সরকারি সংস্থাই শুধু চড়া দামে নুন বিক্রি করতে পারে। যাতে কোনো মতেই নুনের দাম না কমে যায়।
উয়ান ডাইনাস্টির সময় শুধু নুন থেকেই আসত রাজকোষের ৮০% পর্যন্ত আয়।
লবণের উৎপাদন এবং বিক্রির উপর একচেটিয়া অধিকার ছিল সরকারের। ১৯৪৯ এ পিপল রিপাবলিক অফ চায়না প্রতিষ্ঠার সময়ে চায়না ন্যাশনাল সল্ট ইন্ডাস্ট্রি কোম্পানি প্রতিষ্ঠিত হয়। যারা সরকারের লবণের উপরে মনোপলি রক্ষার দায়িত্ব পায়।
আর আপনি বাজার আগুন দেখে সরকারকে নিত্য গাল দিতে পিছপা হন না! ইতিহাস পড়ে শুধু আমরাই শিখি না, আমাদের শোষক, থুড়ি, শাসক শ্রেণীও শেখে ওই ইতিহাস পড়েই!
নুন নিয়ে বলছি বলে অনেকেরই আজ অবাক লাগবে। কিন্তু একটা ছোট বেয়াদপ উদাহরণ দিই?
মনে করুন, আজকের পেট্রোলের দামে আপনি দিশাহারা। আপনি পড়াশোনা করে দেখেছেন আসলে পেট্রল প্রায় জলের দরেই মেলে। আপনার মনে বিদ্রোহ। কয়েক বন্ধু মিলে মনে করলেন জাহাজে করে ইরান থেকে পেট্রল নিয়ে এসে বিক্রি করবেন স্থানীয় কৃষকদের।
যাতে তাঁরা সস্তায় গাড়ি চালিয়ে, জলের পাম্প চালিয়ে আরো সস্তায় ফল-শাক - সবজি বিক্রি করতে পারে। কিন্তু আপনি ইরান কেন, ভারতবর্ষ ছাড়ারই পারমিট জোগাড় করে উঠতে পারবেন না। আপনারই দেশ জানতে চাইবে আপনার পেট্রল আনার লাইসেন্স আছে কিনা। আপনি ইন্ডিয়ান অয়েল কর্পোরেশন বা রিলায়েন্সের লোক কিনা।
আমেরিকা জানতে চাইবে সমুদ্রে তেলের জাহাজ ভাসানোর লাইসেন্স আছে কিনা। প্রত্যেকটা লাইসেন্স আর ট্যাক্সে বিপুল টাকা দিতে হবে আপনাকে। আপনি তখন মিনমিন করে বলবেন 'আমি তো কৃষকদের' সাহায্য করতে চাইছিলাম শুধু'!
ওনারা চোয়াল শক্ত করে বলবেন - হ্যাঁ বাবা নিশ্চয়ই করো, শুধু আমাদের পথে এসে।
আপনি তখন কনফিউজড-ডট-কম। বুঝতেই পারছেন না কে কার উপকার করতে চাইছে। বা সত্যিই কেউ কারো উপকার করতে চাইছেন কি না ?
ঘরে এসে বুকে ব্যথা নিয়ে ঘর্মাক্ত কলেবরে সোফায় অচৈতন্য হবার আগে আপনি স্বপ্নে দেখবেন- ট্যাক্সের কাঁটার মুকুটটা লবণ থেকে নাচতে নাচতে পেট্রোলে এসেছে, আবার ভাসতে ভাসতে কিছুদিন বাদেই চলে যাবে ইলেকট্রিসিটির মাথায়।
যে যুগে যেখান থেকে পয়সা টানা যায় আর কি!
এলিমেন্টারি, ওয়াটসন -খুব সিম্পল!
(ক্রমশ...)
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search keywords Salt









