হিস্টেরেক্টমি: কিছু দরকারি কথা
আর ধোঁয়াশা নয়! মহিলারা হিস্টেরেক্টমি নিয়ে যা প্রশ্ন করেন তার কিছু এখানে সঙ্কলিত রইল। অনেক প্রশ্নের উত্তর এখানেই পেয়ে যাবেন।
আমাদের অনেকের মনেই হিস্টেরেক্টমি সার্জারি সম্পর্কে কোনো সুস্পষ্ট ধারণা নেই। কেউ কেউ একে খুব সাধারণ সার্জারি বলে মনে করেন, আবার কেউ কেউ একে খুব ভয়ঙ্কর অপারেশন হিসেবে দেখেন । হিস্টেরেক্টমি নিয়ে অনেক ভ্রান্ত ধারণা আছে, যেগুলো দূর হওয়া প্রয়োজন।
সংক্ষেপে আলোচনা করা যাক, হিস্টেরেক্টমি কী এবং এই বিষয়ে পেশেন্টরা সাধারণত কী কী জানতে চান।
হিস্টেরেক্টমি কী?
সহজ কথায়, হিস্টেরেক্টমি হলো জরায়ু বা ইউটেরাস বাদ দেওয়ার সার্জারি । মহিলাদের ফাইব্রয়েড, অ্যাডেনোমায়োসিস, এন্ডোমেট্রিওসিস, কিংবা খুব ভারী ব্লিডিংএর মতো সমস্যার জন্য এই সার্জারি প্রয়োজন হয়। এছাড়াও কিছু গাইনোকোলজিক্যাল ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্যও হিস্টেরেক্টমি করার দরকার হতে পারে ।
সহজ কথায়, হিস্টেরেক্টমি হলো জরায়ু বা ইউটেরাস বাদ দেওয়ার সার্জারি । মহিলাদের ফাইব্রয়েড, অ্যাডেনোমায়োসিস, এন্ডোমেট্রিওসিস, কিংবা খুব ভারী ব্লিডিংএর মতো সমস্যার জন্য এই সার্জারি প্রয়োজন হয়। এছাড়াও কিছু গাইনোকোলজিক্যাল ক্যান্সারের চিকিৎসার জন্যও হিস্টেরেক্টমি করার দরকার হতে পারে ।
আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে হিস্টেরেক্টমি শুধুমাত্র একটি অপারেশন নয়, বরং দীর্ঘ রোগভোগের পর সুস্থ থাকার এক নতুন ঠিকানা। আপনার কী ধরনের হিস্টেরেক্টমি প্রয়োজন এবং এর সুবিধা-অসুবিধাগুলি কী, সে সম্পর্কে আপনার ডাক্তার অবশ্যই আপনার সঙ্গে আলোচনা করবেন। আমাদের ক্লিনিকে আমরা সবসময় চেষ্টা করি, অপারেশনের আগেই পেশেন্ট যেন তাঁর সার্জারি সম্পর্কে স্বচ্ছ ধারণা পান।
সার্জারির প্রস্তুতি
সার্জারির আগে আপনার কিছু ফিটনেস পরীক্ষা করা জরুরী। এই পরীক্ষাগুলির মাধ্যমে দেখে নেওয়া হয় আপনি অ্যানেস্থেশিয়া নেওয়ার জন্য উপযুক্ত কিনা। এছাড়াও আপনার রক্তের কিছু প্যারামিটার এবং আপনার হার্ট ও ফুসফুস সঠিকভাবে কাজ করছে কিনা, তাও পরীক্ষা করে দেখা হয়।
সার্জারির পর ব্যথা: অ্যানেস্থেশিয়ার ভূমিকা
সার্জারির পর ব্যথা নিয়ে আপনার মনে প্রশ্ন থাকাটাই স্বাভাবিক। আধুনিক চিকিৎসা বিজ্ঞানে অ্যানেস্থেশিয়া একটি অত্যন্ত উন্নত ব্যবস্থা, যা আপনাকে অপারেশনের সময় তো বটেই, অপারেশনের পরেও ব্যথামুক্ত রাখতে সাহায্য করে।
সেদিন এখন আর নেই যখন অ্যানেস্থেটিস্টের সঙ্গে আপনার দেখা হতো সরাসরি অপারেশন থিয়েটারে। আজকাল অ্যানেস্থেটিস্টরা অপারেশনের আগে, চলাকালীন এবং পরেও পেশেন্টকে সময় দেন। আপনার জন্য কোন ধরণের অ্যানেস্থেশিয়া উপযুক্ত এবং সার্জারির পর কীভাবে দ্রুত ব্যথা কমানো যাবে, সেই পরিকল্পনা তাঁরা খুব যত্ন নিয়েই করেন। এমনকি অপারেশনের আগে অ্যান্টিবায়োটিক দেওয়ার সময়ও তাঁরা আপনার সঙ্গে কথা বলে আশ্বস্ত করবেন।
অ্যানেস্থেশিয়ার প্রকারভেদ
হিস্টেরেক্টমিতে সাধারণত জেনারেল অ্যানেস্থেশিয়া ব্যবহার করা হয়। এক্ষেত্রে আপনার হাতের শিরায় একটি ইনজেকশন দেওয়া হয়, যার ফলে আপনি দ্রুত ঘুমিয়ে পড়েন এবং পুরো অপারেশনের সময় অচেতন থাকেন। সার্জারি শেষ হলে নিরাপদে আপনার জ্ঞান ফিরিয়ে আনা হয়।
আজকাল ব্যথামুক্ত সার্জারির জন্য মেরুদণ্ডে ইনজেকশন দেওয়ার বিকল্প ব্যবস্থাও রয়েছে। এর দুরকম ভ্যারাইটি। স্পাইনাল আর এপিডুরাল।
স্পাইনাল অ্যানেস্থেশিয়া
মেরুদণ্ডে ইনজেকশন দিয়ে শরীরের নিচের অংশ কিছু সময়ের জন্য অবশ করে দেওয়া হয়। এই সময় আপনি জেগে থাকলেও কোনো ব্যথা অনুভব করবেন না। অনেক পেশেন্ট এই সময় কানে হেডফোন লাগিয়ে গান শোনেন বা অ্যানেস্থেটিস্টের সঙ্গে গল্প করেন। স্বল্প সময়ের অপারেশনের জন্য এটি বেশ কার্যকরী।
এপিডুরাল অ্যানালজেসিয়া
এটি ব্যথা কমানোর এক আধুনিক প্রযুক্তি, যা লম্বা সময়ের অপারেশনের জন্য প্রয়োজন হতে পারে। এতে একটি ছোট পাম্পের মাধ্যমে মেরুদণ্ডের নির্দিষ্ট জায়গায় ওষুধ পৌঁছে দেওয়া হয়, যা ব্যথার স্নায়ুগুলোকে অবশ রাখে। এর সুবিধা হলো, আপনি সার্জারির পরেও হাঁটতে বা চলাফেরা করতে পারেন এবং এটি অপারেশনের পরবর্তী ২-৩ দিন পর্যন্ত ব্যথা নিয়ন্ত্রণে রাখে।
মেরুদণ্ডে ইনজেকশনের কথা শুনে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। ইনজেকশনের সুঁচ আপনার পিঠের ভেতরে থেকে যায় না, থাকে শুধুমাত্র একটি খুব সরু ও নরম টিউব।
হিস্টেরেক্টমির প্রকারভেদ (সার্জারির পদ্ধতি অনুযায়ী)
হিস্টেরেক্টমি মূলত তিন ভাবে করা যায়: ১) ভ্যাজাইনাল হিস্টেরেক্টমি, ২) অ্যাবডোমিনাল হিস্টেরেক্টমি, এবং ৩) ল্যাপারোস্কোপিক বা কী-হোল সার্জারি ।
১. ভ্যাজাইনাল হিস্টেরেক্টমি
কখনও কখনও পেটে কোনো কাটাছেঁড়া না করেই birth passage বা ভ্যাজাইনাল পথে ইউটেরাস বের করে আনা সম্ভব । এক্ষেত্রে ভ্যাজাইনার ভেতরে কিছু সেলাই থাকে যা বাইরে থেকে দেখা যায় না এবং আপনি অনুভবও করতে পারবেন না। তবে ইউটেরাস খুব বড় হলে বা পেটের ভেতর অন্য কোনো জটিলতা থাকলে এই পদ্ধতি উপযুক্ত নাও হতে পারে।
২. অ্যাবডোমিনাল হিস্টেরেক্টমি
প্রয়োজন অনুযায়ী পেটে কেটে অপারেশন করার পদ্ধতিকে অ্যাবডোমিনাল হিস্টেরেক্টমি বলে । এটি দুভাবে কাটা হতে পারে।
বিকিনি কাট
তলপেটে আড়াআড়িভাবে কাটা হয়। এই দাগ এতটাই নিচে থাকে যে তা অন্তর্বাসের নিচে ঢাকা পড়ে যায়। কসমেটিক কারণে এটি এখন বেশ জনপ্রিয়।
লঙ্গিটিউডিনাল কাট
পেটের মাঝ বরাবর লম্বালম্বি কাটা হয়। যদি টিউমার খুব বড় হয় বা জটিল অপারেশনের দরকার হয়, তখন সার্জনরা এই পদ্ধতি বেছে নেন কারণ এতে পেটের ভেতরটা ভালোভাবে দেখে অপারেশন করা সম্ভব হয়।
৩. ল্যাপারোস্কোপিক হিস্টেরেক্টমি
এটি ‘কী-হোল সার্জারি’ নামেও পরিচিত । এতে পেট না কেটে ছোট ছোট ছিদ্র করে পেটের ভেতর ক্যামেরা ও সরু যন্ত্র প্রবেশ করানো হয়। সার্জন পেটের বাইরে থেকে মনিটরে দেখে অপারেশন করেন। এটি একটি অত্যন্ত উন্নত প্রযুক্তি এবং এর ফলাফলও চমৎকার। ক্যান্সার সার্জারির মতো জটিল অপারেশনের পরেও পেশেন্টরা খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরতে পারেন।
একজন সার্জনের জন্য ল্যাপারোস্কোপি সার্জারি আয়ত্ত করতে কয়েক বছর সময় লেগে যায়। আমাদের ইউনিটে আমরা নিয়মিতভাবে ল্যাপারোস্কোপির মাধ্যমে ক্যান্সার সার্জারিও করে থাকি।
ল্যাপারোস্কোপি সার্জারির ফলাফল একেবারে আশ্চর্যজনক! ঘণ্টার পর ঘণ্টা, দীর্ঘ ক্যান্সার সার্জারির পরেও, পেশেন্ট কিন্তু কয়েকদিনের মধ্যেই সুস্থ হয়ে বাড়ি চলে যেতে পারেন । যখন তাঁরা পায়ে হেঁটে বাড়ি আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বাড়ি ফেরেন, তখন তাদের মুখের স্বস্তির হাসি আমাদের মুখেও প্রসন্নতার হাসি ফুটিয়ে তোলে।
হিস্টেরেক্টমি সার্জারির সময় কী বাদ দেওয়া হয়?
সহজ কথায়, হিস্টেরেক্টমিতে ইউটেরাস বাদ দেওয়া হয়। আপনার পিরিয়েডের জন্য ইউটেরাস দায়ী। সুতরাং, হিস্টেরেক্টমির পরে আপনার আর কোনো পিরিয়ড হবে না।
ইউটেরাসের মুখ বা সার্ভিক্সের কী হয়?
ইউটেরাসের নিচের অংশকে সার্ভিক্স বলে। ভারত ও ইংল্যান্ডে সাধারণত ইউটেরাসের সঙ্গে সার্ভিক্সও বাদ দেওয়া হয়, একে বলে টোটাল হিস্টেরেক্টমি । তবে স্ক্যান্ডিনেভিয়ান দেশগুলিতে, (যেমন সুইডেন বা ডেনমার্ক) ডাক্তাররা ইউটেরাস বাদ দিলেও, কিছু পেশেন্ট সার্ভিক্স রেখে দেওয়ার পক্ষপাতী, যদি সেখানে কোনো সমস্যা না থাকে । একে বলা হয় সাবটোটাল হিস্টেরেক্টমি।
অনেক পেশেন্ট মনে করেন সার্ভিক্স রেখে দিলে সেক্স ড্রাইভ ভালো থাকে, যদিও গবেষণায় এর কোনো নিশ্চিত প্রমাণ মেলেনি ।
সাবটোটাল হিস্টেরেক্টমিতে আরও দ্রুত পেশেন্ট সুস্থ হয়ে ওঠেন এবং টোটাল হিস্টেরেক্টমির তুলনায় সাবটোটাল হিস্টেরেক্টমিতে অস্ত্রোপচারের সময়ও লাগে কম এবং জটিলতার হারও তুলনামূলক কম। অন্যদিকে, সার্ভিক্স রেখে দিলে ভবিষ্যতে সেখানে সমস্যা হওয়ার ঝুঁকি থেকে যায়, তাই ৬৫ বছর বয়স পর্যন্ত নিয়মিত প্যাপ স্মিয়ার টেস্ট করা জরুরি।
ওভারি কি বাদ দেওয়া হবে?
হিস্টেরেক্টমির সময় ওভারি বাদ দেওয়া হবে কি না, তা একটি গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত। ওভারি বাদ দেওয়াকে উফরেকটমি এবং ফ্যালোপিয়ান টিউব বাদ দেওয়াকে স্যাল্পিংগেকটমি বলা হয় । মেনোপজের বয়স হয়ে গেলে অনেক সময় ক্যান্সার প্রতিরোধের জন্য ইউটেরাসের সঙ্গে এগুলোও বাদ দেওয়া হয়। তবে কম বয়সে অপারেশন হলে হরমোনের ভারসাম্য বজায় রাখতে সাধারণত ওভারি রেখে দেওয়া হয়।
তবে, ফ্যালোপিয়ান টিউব বাদ দেওয়া প্রয়োজন। বেশীরভাগ ওভারির সমস্যার অঘটন ঘটানোর নাটের গুরু আসলে এই টিউব।
ক্যান্সারের জন্য হিস্টেরেক্টমি
ক্যান্সারের ক্ষেত্রে রেডিক্যাল হিস্টেরেক্টমি নামের বিশেষ সার্জারির প্রয়োজন হতে পারে । এতে জরায়ুর সঙ্গে আশেপাশের টিস্যু এবং লিম্ফ নোডও বাদ দেওয়া হয় যাতে ক্যান্সার ছড়িয়ে না পড়ে।
।শেষ কথা: ডাক্তারবাবুর সঙ্গে খোলাখুলি কথা বলুন
যেকোনো সার্জারিতেই কিছু না কিছু ঝুঁকি থাকে। যেমন রাস্তায় সাবধানে গাড়ি চালালেও ছোটখাটো দুর্ঘটনার ঝুঁকি পুরোপুরি এড়ানো যায় না, সার্জারির ক্ষেত্রেও তাই। আমাদের দেশে অনেক সময় ডাক্তাররা পেশেন্টকে ভয় না দেখানোর জন্য ঝুঁকির কথাগুলো এড়িয়ে যান। কিন্তু বিদেশে, যেমন ইংল্যান্ডে, ডাক্তার ও পেশেন্টের মধ্যে এ বিষয়ে খুব খোলামেলা আলোচনা হয়।
আপনার সুস্থতার জন্য ডাক্তার এবং আপনি একই টিমে রয়েছেন। তাই আপনার কী ধরণের সার্জারি হচ্ছে, তার সুবিধা বা ঝুঁকি কী, সে বিষয়ে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে নির্ভয়ে আলোচনা করুন। নিজেকে মানসিকভাবে প্রস্তুত রাখলে সুস্থ হয়ে ওঠার পথ অনেক সহজ হয়।
সার্জারির পর বাড়ি ফিরে কী হবে? পড়তে ক্লিক করুন এই লিঙ্কে
(এই টপিকের বাংলা লিঙ্ক উপরের পেজ)
(The English version of the page can be found by clicking here)
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: Hysterectomy Surgery Vaginal Discharge Urine Irritation Daycare Surgery laparoscopy keyhole Surgery Abdomen Surgery









