#মাটি প্রথম পর্ব
মানসদা তুমি এস ভালো লাগবে। তোমার মতো লোকের ভালো লাগবে। মানে ? তুমি তো শুধু প্রোগ্র্যাম দেখেছো , এবার প্র্যাকটিস দেখো। প্রথম পর্ব (পরের পর্বের লিঙ্ক নিচে দেওয়া রইল)
ঠিক কি করছেন উনি?
হ্যাঁ হ্যাঁ উনি!
দাড়িওয়ালা, মিডিয়াম হাইট।
শুধু দেখছি একটা বিয়ারের বোতল নিয়ে উনি শুধু টয়লেটে ঢুকছেন, বেরোচ্ছেন।
বারবার
এসে চেয়ারে বসছেন,
বোতল থেকে মাথানিচু করে কিছু একটা করছেন।
দূর থেকে ভালো বোঝা যাচ্ছে না ছাই।
তারপর আবার টয়লেটে
প্রায় বার চারেক হয়ে গেলো।
অনুসন্ধিৎসু চোখ সবার
আ রে বাবা! খেলে পরে খেয়ে নিলেই হয়।
আজকাল হোটেলে বিয়ার খাওয়া আর এমন কি
তায় আবার মিউজিসিয়ান।
সারাদিনই নিশ্চয়ই এসব খায়।
আর কতক্ষন দেরি করাবে ! উফফ !
কিন্তু কাজ শুরু হতেই বোঝা গেলো।
আরো বোঝা গেলো, টিউনিং একদম নিখুঁত।
ওঁনার বাঁ পাশে বসা প্রবাদপ্রতিম স্যাক্সোফোনবাদক রাজ সোধার প্রবলবেগে সন্তুষ্টিজনক মাথা নাড়া দেখেই বোঝা গেলো।
হাততালির বন্যা বয়ে গেলো।
বিয়ারের বোতল থেকে বেরিয়ে আসছে মোহময়ী সুর -কি মায়া তার।
তবে মাত্র সাড়ে-দশ সেকেন্ডের জন্য
মনে হলো এই বোধয় হেলেন বেরিয়ে আসবেন।
কি সাধনা।
শুধু সাড়ে দশ সেকেন্ড কে নিখুঁত করে তোলার জন্য।
একটু খুলে বলি ?
স্বভূমিতে পরদিন বিশাল জলসা। কলকাতা, মুম্বাই , দিল্লির প্রথিতযশা শিল্পীরা মঞ্চে আসছেন। হাউসফুল। আগেরদিন তাঁরা 'প্র্যাকটিস' করবেন সনেটে। বন্ধুপ্রতিম অরভিন্দ প্রায় টেনে নিয়ে এসেছে সল্টলেকের হোটেল- সনেটে।
মানসদা তুমি এস ভালো লাগবে। তোমার মতো লোকের ভালো লাগবে।
মানে ?
— তুমি তো শুধু প্রোগ্র্যাম দেখেছো , এবার প্র্যাকটিস দেখো।
তারপর আর না করতে পারিনি।
সনেটে গিয়ে যাঁদের দেখলাম তাঁদের মঞ্চে দেখেছি , টিভি তে দেখেছি , সিনেমায় শুনেছি। তাঁরা প্র্যাকটিস করছেন। যাঁদের তর্জনী হেলনে শূন্য বাতাসে সুরের ঝংকার ওঠে -সারা ভারত নেচে ওঠে। ঝকমকে জামাকাপড় পরে যাঁদের দেখতে অভ্যস্ত আমরা তাঁরাই আজকে একটা টি শার্ট, জিন্স / বারমুডা, চপ্পল পরে প্র্যাকটিস করছেন। বাচ্চা ছেলের মতো।
সাড়ে-দশ সেকেন্ডের বাজনা।
কেউ খেয়ালও করেনা বললেই চলে
আসল গানটা সবাই জানে 'মেহবুবা ও মেহবুবা'
১৯৭৫-এর শোলে
সেই গানের শুরুটা। ঠিক যখন ধর্মেন্দ্র , সঞ্জীব কুমার আর অমিতাভ বচ্চন মুখ চাওয়াচায়ি করছেন।
সেখান থেকে হেলেনের মুখ দেখার আগেই এই সাড়ে দশ সেকেন্ড শেষ।
আমার মতো হাততালি দেওয়া 'পাবলিক' নয়। যাঁরা সংগীতকে সত্যি সত্যি বোঝেন , ভালোবাসেন তাঁরা জানেন ঠিক এইটুকু সময় আর ডি বর্মন তাঁর হাতের বোতলে শিস দিয়ে এক অদ্ভুত আওয়াজ সৃষ্টি করেছিলেন। এই প্রিলিউড মূল গান থেকে কিছু কম নয়।
শুধু সেই সাড়ে দশ সেকেন্ড কে নতুন প্রাণ দেবার জন্য দাড়িওয়ালা বারবার বিয়ারের বোতল নিয়ে টয়লেটে যাচ্ছিলেন।
বোতলে বিয়ার টিয়ার কিছু নেই। শুধু অর্ধেক ভর্তি জল। সেই জলের মাত্রা বাড়িয়ে-কমিয়ে বোতল থেকে বেরোনো শিসের তীক্ষ্ণতা কমিয়ে-বাড়িয়ে সেই আর ডি বর্মনের সুর কে আবার প্রাণপ্রতিষ্ঠা করতে দাড়িওয়ালা একনিষ্ঠ।
এই বোতলটিতে তিনি ওই জলটুকু ভরে রেখে দেবেন যাতে আগামীকালের মঞ্চে তিনি তুলতে পারেন ঝড়। জলসায় যারা জৌলুশ দেখতে আসবেন তাঁরা জানবেনও না কি পরিমান একাগ্রতা, পরিশ্রম, খুঁতখুতেমি আছে তার পেছনে।
আমিও গেছি সায়েন্স সিটি , কলামন্দিরে, রয়েল এলবার্ট হলে কিন্তু এত সাধনা বুঝতে পারিনি।
ফ্ল্যাশব্যাকের মতো মনে পরে যায় এক ঘটনা। যখন এক জুনিয়র-ডাক্তার-এসিস্ট্যান্ট তাঁর কনসালট্যান্ট সার্জনকে অধৈর্য্য হয়ে জিজ্ঞেস করছে - 'এক ঘন্টা ধরে আপনি শুধু 'এদিক ওদিক' করছেন অপারেশন টা শুরু করবেন কবে??'
সেই সার্জন তখন সদ্য সদ্য ইংল্যান্ড থেকে কলকাতা এসেছেন। শিখে আসা হাসপাতালের মতো ব্যবস্থাপনা তখনও স্থানীয় হাসপাতালে করে উঠতে পারেননি।
'এদিক ওদিক করছেন' মানে ৬-৭ ঘন্টা অপারেশনের আগে রোগিণীর যা যা প্রস্তুতি লাগে। অপারেশনে রোগিনী যেখানে শুয়ে থাকবেন সেই টেবিলের কোনো ধাতব অংশের সাথে রোগিণীর যোগাযোগ থাকতে পারবে না। থাকলে অপারেশনের ইলেক্ট্রোসার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি থেকে ফোস্কা বা পুড়ে পর্যন্ত যেতে পারে।
অপারেশনের সময় যাতে শরীরের তাপমাত্রা কমে গিয়ে অবাঞ্ছিতভাবে রক্ত জমাট বেঁধে না যায় বা ইনফেকশনের সম্ভাবনা বেড়ে না যায়, তারজন্য গরম হাওয়া কম্বল জোগাড় করে নিয়ে আসা হয়েছে। পায়ে দেওয়া হয়েছে একধরণের পাম্প যাতে রোগিনী শুয়ে থাকলেও তাঁর পা ভাবে তিনি হাঁটছেন এবং তাতে তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে ওঠার সম্ভাবনা বাড়ে ।
এন্টিবায়োটিক দিলেই সাথে সাথে তা শরীরে ছড়িয়ে পরে না। সময় নেয় বেশ কয়েক মিনিট। নির্ধারিত সময়ের আগে অপারেশন শুরু করলেই সংক্রমণের সম্ভাবনা বাড়ে। তার জন্য ওটির একজন স্টাফ কে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে ঘড়ি ধরে সময় দেখার - তাঁর পোশাকি নাম এন্টিবায়োটিক স্টুয়ার্ড।
নানা ধরণের ইলেক্ট্রোসার্জিক্যাল যন্ত্রপাতি। আর তার মেশিন থেকে বেরোনো অসংখ্য কেবল যাতে জট না পাকিয়ে অপারেশনের জায়গায় আসে, এটা দেখাও একটা কাজ।
ওটি তে নানা যন্ত্রের নানা তারে পা ঠেকে যাতে ওটি নার্স বা স্টাফেরা হোঁচট খেয়ে হাড়গোড় না ভেঙে ফেলেন সেই জন্য তারের ওপর বিছিয়ে দেওয়া হচ্ছে এক ধরণের এডহেসিভ টেপ। যার আঠাটাও বহু গবেষণার ফলশ্রুতি।
রোগিণীর ঘুমন্ত চোখের পাতায় সম্পূর্ণ আরেক ধরণের এডহেসিভ টেপ। যাতে অপারেশন চলতে চলতে চোখ খুলে গিয়ে কঞ্জাঙ্কটিভা শুকিয়ে না যায়।
আধুনিক ইলেক্ট্রোসার্জিক্যাল যন্ত্র, রক্তবাহকে সামলে রেখে অনেক জটিল অপারেশনেও, বেশি রক্তক্ষরণ থেকে বাঁচাতে পারে। সেগুলোও ব্যবস্থা করতে হচ্ছে।
তার পরে তো শুরু হয় 'আসল' অপারেশন।
সংখ্যাগরিষ্ঠ এই ধরণের প্রযুক্তি উন্নয়নশীল দেশে সহজলভ্য নয়। প্রাণদায়ী এসব প্রযুক্তির ব্যবহার এতটাই কম যে রাষ্ট্র, সরকারি বা বেসরকারি বীমা এসব ব্যবহার হলেও তার স্বীকৃতি দিতে অনিচ্ছুক।
স্বভাবতই সেই জুনিয়র-ডাক্তার-এসিস্ট্যান্টয়ের কাছে এগুলো সব 'এদিক ওদিক করা' - তার কাছে অপারেশন শুরুই হয় পেট কাটার থেকে।
অপারেশন বলতে বোঝায় পেট কেটে, টিউমার সরিয়ে আবার পেট সেলাই। অথচ তার জন্য যে কি কর্মযজ্ঞ - কি ভাবেই বা বোঝাই !
অরভিন্দের ডাকে সম্বিৎ ফেরে।
হেলেনের মেহেবুবা তখন শেষ।
সংগীত শিল্পীদের তখন চা বিরতি।
অরভিন্দ বলে, চলো কিশোরদার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।
ক্রমশঃ
অন্য পর্বের লিঙ্ক
#মাটি ( প্রথম পর্ব - এই পেজেই )
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tools: Mati, Buddha









