#মাটি তৃতীয় ও শেষ পর্ব
সন্দেহের আফিমে বুঁদ সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ। মিউজিসিয়ান মানেই মদ, প্রত্যেকটি অভিনেতা-অভিনেত্রীর জন্ম কাস্টিং কাউচে, পি ডব্লু ডি তে কাজ মানেই ঘুষ...তৃতীয় ও শেষ পর্ব (বাকি পর্বের লিঙ্ক নিচে দেওয়া রইল)
মুগ্ধ হয়ে শুনছি।
হঠাৎ গান থামিয়ে দিলেন মাধুরী দে।
কি হলো !
না, ওনার মতে কিছু একটা ভুল হয়েছে। আমি কিন্তু ভুল কিছু বুঝতে পারিনি।
লাইন দুটো আবার বার দুই তিন রিহার্সেল দিয়ে, আবার কেচে গণ্ডুষ। ৩০ জন আবার শুরু থেকে বাজালেন সাবলীল ভাবে। মুগ্ধ হলাম আমরা। নিশ্চয়ই সন্তুষ্ট হলেন তিনি নিজেও। হাসব্যান্ডেরও চোখে মুখে ভালো লাগার ছাপ।
সব্বাই মনে করেন একটু সুর কেটে গেলেই সব শেষ। সেদিনের জলসা তো বটেই, মনে হবে সারা জীবনের সাধনাই শেষ।
মনে মধ্যে একটা ভালো লাগা এলো - না, ভালো গান শুনে নয়।
কয়েক বছর ধরেই দেখছি তিন বা তার বেশি চিকিৎসক একসাথে হলেই প্রয়োজনীয় কথাবার্তার উপসংহারে অবসম্ভাবী ভাবে মিশে থাকে নৈরাশ্য। সবাই শংকিত। মাত্রাতিরিক্ত ব্যয়সংকোচের চাপে আধুনিক চিকিৎসার গতি স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে দেশে, রাজ্যে।
ধুঁকতে থাকা অর্থনীতিতে মুদ্রাস্ফীতি, ক্রমহ্রাসমান ক্রয়ক্ষমতা আর বীমা সংস্থার সাঁড়াশি চাপে শুধু সস্তার ওষুধ, নিম্নমানের সার্জারির যন্ত্র ছাড়া চিকিৎসা আদৌ করা যাবে কিনা সেই সন্দেহের বাতাস ভারী হয়ে আসছে। শুধু রুগী নয় , নিজেদের পরিবারের কিছু হলে কিভাবে আধুনিক চিকিৎসা জুটবে সেই নিয়ে ভীত আমরা।
না, এসব খবর জনপ্রিয় নয়। কথোপকথনে উপস্থিত বাকি দুজন আমার সিনিয়র হলে বলেন -কেন মরতে ফিরে এলি এদেশে ? শিগগির ইংল্যান্ডে ফেরার প্লেন ধর।
হঠাৎ মনে হলো পথে আমি একা নই। রাতের আঁধারে ঢাকা ছিল অন্তর্দৃষ্টি। সূর্যোদয় হতেই দেখলাম এপথে পথিক অনেক।
জলসার সুর কাটা কিন্তু শুধু সুর কাটা নয়। এ যেন একটা বিশ্বাস ভঙ্গ। যে বিশ্বাসে ভর করে প্রত্যাশা নিয়ে হলভর্তি শ্রোতা নিখুঁত এক সংগীতানুষ্ঠান দেখতে আসেন। যে প্রত্যয় নিয়ে এক নিটোল অনুষ্ঠান উপহার দেবার জন্য, নেপথ্যে আয়োজকদের অস্থির পদচারণা।
কিন্তু দর্শক যখন আসেন তখন অদৃশ্য এক মার্কশিট নিয়ে ঢোকেন প্রেক্ষাগৃহে।
১০ টা সুন্দর অনুষ্ঠান দেখে তাঁরা যতটা না আলোচনা করেন , একটা সুর কেটে যাওয়া নিয়ে আলোচনা হয় তার থেকে অনেক গুন।
চিকিৎসক অনেক হাজার রোগীনিকে ভালো করে তুললেও শুধু একটু সুর কেটে গেলেই ভঙ্গুর হয়ে ভেঙে পারে চিকিৎসকের প্রতি পরিবারের বিশ্বাস। সমাজের বিশ্বাস। সরব হয়ে ওঠে সংবাদমাধ্যম। আদালত সক্রিয় হয় খুঁত খুঁজতে।
সন্দেহের আফিমে বুঁদ সংখ্যাগরিষ্ঠ সমাজ।
মিউজিসিয়ান মানেই মদ, প্রত্যেকটি অভিনেতা-অভিনেত্রী র জন্ম কাস্টিং কাউচে, পি ডব্লু ডি তে কাজ মানেই ঘুষ।
শুধু সংগীত জগৎ, চিকিৎসা জগৎ নয়, ভেবে দেখুন মধ্যবিত্ত্বের ড্রয়িং রুমেও তার প্রভাব। কিছু সময় সমস্যা শুধরে দেওয়া যায়। আর কখনো জীবন সে সুযোগ দেয় না।
বৌমা ৩৬৪ দিন সুস্বাদু রান্না করলেও একদিনের লবন কম হয়ে যাওয়া মুরগির ঝোল নিয়ে ঝংকার ওঠে অনেক বেশি।
লবন-চিনি প্রতি হপ্তায় নিয়ে এলেও, ঠিক যেদিনটি ভুলবেন, ময়নার-মা রান্নাঘর থেকে আওয়াজ দেবে দাদাবাবু 'আবারও' ভুলে গেছে।
কলকাতা পুলিশ মাসে হাজার চোরকে ধরলেও, খবর হয় তখনি, যখন তাঁরা চোর ধরতে পারেননি।
খবরের চ্যানেল এক লক্ষ বানান সঠিক লিখলেও একটি মাত্র ভুল বানান ফেসবুকে মীম হয়ে ঘুরে বেড়ায় পরের ২ বছর।
১০ টি ম্যাচ জিতিয়ে দেওয়া আমাদের প্রিয় 'দাদা' , শূন্য রানে আউট হলেই শুরু হয় সমালোচনা।
মন্ত্রী সারাবছর ঝড়ের জল থেকে আমাদের সুরক্ষিত রাখলেও , একদিন জল জমলে ক্ষমা চাইতে হয় তাঁকেই। সে জল যদি আমাদেরই ছুঁড়ে ফেলা প্লাস্টিকে নর্দমার মুখ আটকে হয়, তবেও।
যেটা পরিষ্কার তা হলো:
বিশ্বাস তৈরী হতে অনেক সময় লাগে আর ভাঙতে এক মুহুর্ত।
আর আলোচনার থেকে সমালোচনার ধার অনেক বেশি।
সংগীত আমি বুঝি বা না বুঝি, ক্রিকেট আমি জানি বা না জানি, পুলিশ আর মন্ত্রীদের চিরন্তন মানসিক চাপ, টিভি চ্যানেলের মধ্যেকার নৃশংস প্রতিযোগিতার পীড়ন, অসুখের সামনে ডাক্তার-নার্সের অসহায়তা আমি কিছু বুঝি বা না বুঝি, আমার হাতে আছে অদৃশ্য মার্কশিট।
যে মার্কশিটে প্রশংসা লেখার জায়গা নেই শুধু আছে লাল কালির ঢ্যাঁড়া দেবার বিস্তর সুযোগ।
আমরা জলসায় বসি সেই মার্কশিট নিয়ে।
সন্ধ্যায় চায়ের পেয়ালা নিয়ে টিভির সামনে বসি সেই মার্কশিট নিয়ে।
অফিস গিয়ে জুনিয়রকে সেই মার্কশিটে দেখি।
দুইবন্ধুর সম্পর্কের প্রতিদিন, স্বামীস্ত্রীর দায়িত্ববোধের প্রতি ঘন্টা, শাশুড়ি-বৌমার প্রতি কথোপকথন, বাবা আর বিয়ে-হওয়া-ছেলের বাক্যালাপের প্রতিটি শব্দচয়ন এমনকি রাতে ডিনারের প্রতি পদে, দিনের প্রতিটা চায়ের কাপের স্বাদে উঁকি দেয় মার্কশিট।
যেখানে গোলাপ নিঃশব্দ। শুধু কাঁটা দেয় খোঁটা।
অরভিন্দের বলা একটা গল্প মনে পরে যায়। অপদেবতা ‘মার’-এর আপ্রাণ চেষ্টা আর কাম-কৌশলের ছলাকলা তখন বুদ্ধের কাছে পরাস্ত। জীবনে এই প্রথম পরাজিত হলো মার। বুদ্ধকে প্রশ্ন করে সে 'আমার এই হারের কোনো স্বাক্ষী নেই - কেউ যদি না-ই জানে তুমি আমায় হারিয়েছো তাহলে কার কাছে গিয়ে বলবে, তুমি নির্বাণ পেয়েছো ?'
এই প্রশ্নের আড়ালে ছিল 'অহং' এর সাথে শেষ লড়াই। বুদ্ধ শান্ত ভাবে মাটির দিকে অঙ্গুলিনির্দেশ করে বলেন
— 'এই মাটি আমার সাক্ষী'
নির্বাণ পেলেন তিনি।
মার্কশিট নয়, অন্য মানুষ নয়, যেকোনো প্রকৃত সাধনা আর প্রচেষ্টার সাক্ষী মাটি। যেখানে আমরা মিশে যাবো সবাই একদিন।
ফোন চলে এসেছে। মুর্শিদাবাদ থেকে ম্রিয়মান এক বৃদ্ধাকে তার ছেলেরা নিয়ে এসেছে ইমার্জেন্সি তে। অনেকবছর ধরে ওঁনার চিকিৎসা চলছে। করোনার জন্য অনেদিন চিকিৎসার জন্য আসতে পারেননি কিন্তু এবার মনে হচ্ছে ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজ। এখুনি যেতে হবে।
বেরিয়ে এলাম 'সনেট' থেকে। রাস্তার আওয়াজে মিলিয়ে আসছে মাধুরী দে, সুজয় ভৌমিকের বলিষ্ঠ ডুয়েটের প্র্যাকটিস, সোধা ভাইদের ট্রাম্পেট- স্যাক্সফোনের আওয়াজ। গান আর বিজ্ঞানের স্রোত মিশে যাচ্ছে বাস্তবের মোহনায়।
জগতের সত্যিকারের ভালো দিকগুলোর কোনো আর্থিক বা মানসিক বিনিময়মূল্য হয় না। আমি জানি ওঁনারা জলসার মার্কশিটের জন্য গাইছেন না , গাইছেন নিজেদের ভালো লাগার জন্য।
সাক্ষী শুধু মাটি।
রান্নাঘর, ড্রয়িং-রুম, অফিস , স্কুল কলেজে, শহরের রাস্তায়, স্টুডিওতে ক্যামেরার সামনে আপনিও নিশ্চয়ই তাই করছেন। তাই তো ?
চলুন, একবুক শ্বাস নিয়ে ফের শুরু করি লড়াই।
(শেষ)
অন্য পর্বের লিঙ্ক
#মাটি ( তৃতীয় ও শেষ পর্ব- এই পেজেই )
— ----
পুনশ্চ :
প্রথম পর্বে লেখা দাড়িওয়ালা সংগীতকারের নাম জানা হয়নি। আপনার সাধনাকে কুর্নিশ। জানবার ইচ্ছে রইলো।
সেলিব্রিটিদের আসল নাম লিখলাম। 'অরভিন্দ কে?' -তা বলছি না। গানের বন্ধু অরভিন্দ এর মুখের আড়ালে, একটা না-চেনা-অরভিন্দ আছে তাই পরিচয় গোপনেই থাক। কেউ জানলেও লিখবেন না।
মুর্শিদাবাদী দিদিমাকে বাঁচাতে পারিনি। তবে আমরা ধরে ফেলেছিলাম ওনার ক্যান্সারটা জেনেটিক। মৃত্যুর আগে অনুরোধ করে যান ওঁনার মেয়ে আর ছেলের ঘরের নাতনির যেন সেই রোগ আর কোনোদিনও না হয়। ক্যান্সার-জেনেটিক্সের জটিল অ্যালগরিদমে আশাকরছি ওঁনাদের অন্তত বাঁচিয়ে দেওয়া যাবে।
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tools: Mati, Buddha







