#মাটি দ্বিতীয় পর্ব
স্বরলিপির দিকে তর্জনী তুলে বলি চল্লিশ বছর ধরে আপনি এই গান বাজাচ্ছেন - এখনো সংশোধন চলছে ?দ্বিতীয় পর্ব (পরের পর্বের লিঙ্ক নিচে দেওয়া রইল)
সংগীত শিল্পীদের তখন চা বিরতি।
অরভিন্দ বলে চলো কিশোরদার সাথে পরিচয় করিয়ে দিই।
কিশোরদা মানে কিশোর সোধা - ভারতের ট্রাম্পেট জাদুকর। আর ডি থেকে শুরু করে এ আর রহমান যাঁর ভক্ত। কিশোর কুমার থেকে শুরু করে আজকের ইউটিউব-বালক, কিশোর সোধার ট্রাম্পেট শোনেনি -এমন পাওয়া দুস্কর।
আন্তরিক ভাবে পরিচয় হলো। আমার পেশা শুনে, করোনা ভ্যাক্সিন নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করলেন।
আমার মুখে ওনার প্রশংসা শুনেই ভাবলেশহীন ভাবে অন্যদিকে তাকিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন। বুঝতেই পারলাম এই ঠুনকো প্রশংসার কোনো দাম নেই শিল্পীর কাছে।
পাশেই স্যাক্সোফোনে রাজ সোধা - আরেক বিস্ময় প্রতিভা। ওঁনার সামনে খোলা খাতা। স্বরলিপি লেখা। আর তাতে ছোট ছোট করে কত শত কাটাকুটি , সংশোধন।
চা বিরতিতে চা খাওয়ার কোনো ইচ্ছে এঁদের আছে বলে মনে হলো না। দেখে যাচ্ছেন স্বরলিপি। যন্ত্রে কিছু অ্যাডজাস্টমেন্ট। আশেপাশের সব বাদ্যযন্ত্র থেকে আওয়াজ নিয়ে সহস্র কেবল এক পেল্লায় মিক্সার যন্ত্রে ঢুকেছে। সোধা ভাইরা সেই মিক্সারের টেকনিশিয়ান কে ডেকে নানা জটিল কথা বলছেন। আলোচনায় বুঁদ কলকাতার সংগীতশিল্পী মাধুরী দে। বুঝলাম পরের গান ওঁনার সাথেই।
গানের কোথায় কোন বাদ্যযন্ত্র প্রাধান্য পাবে। আর কোন কোন জায়গায় মাধুরী দেবীর গলা শেষ হওয়ার ঠিক আগের উচ্চারণ থেকে মিক্সার কিভাবে ধাপে ধাপে কোন বাদ্যযন্ত্রের পর কোন বাদ্যযন্ত্রের সংগীতের মূর্ছনা আমাদের কানে পৌঁছে দেবেন তার পরিকল্পনা চলছে।
সোধা ভাইরা, মাধুরী দে কত শত জলসাই না করেছেন। কতশত না হাততালি পেয়েছেন। কিন্তু তাঁদের চোখে, বডিল্যাংগুয়েজে পরীক্ষার আগের দিনের উদ্বেগ, উৎকণ্ঠা। ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর ডিটেইল এর জন্য কি আকুলতা।
আলোচনার তীব্রতা একটু কমতেই আমি রাজ সোধাকে জিজ্ঞেস না করে পারলাম না।
— আপনি তো এই সব গানের জন্মলগ্ন থেকে আছেন তবুও এত সাধনা করতে হচ্ছে ?
উনি স্বরলিপিতে কিছু লিখছিলেন
— ব্রাদার ! আমরা তো সব এই ডিটেইলিং এর ওপরেই দাঁড়িয়ে আছি !
স্বরলিপির দিকে তর্জনী তুলে বলি চল্লিশ বছর ধরে আপনি এই গান বাজাচ্ছেন - এখনো সংশোধন চলছে ?
— একটু সুর কেটে গেলেই যে স্টেজ শেষ !
শেষ কথাটা বললেন কিশোর সোধা। মাখনের মতো অস্ফুট মোলায়েম গলায়। ঠান্ডা হয়ে যাওয়া চায়ের কাপে অনাসক্ত নিয়ম মাফিক প্রথম চুমুক দিয়ে উজ্জ্বল চোখ নিয়ে বোঝালেন, প্রশংসা নয় - আমার এই ‘ব্যর্থতার’ প্রশ্নে কৌতূহলী তিনি।
তাঁর বাজানো 'বদতমিজ দিলের' তীক্ষ্ণ, তীব্র, গর্বিত প্রিলুড মিউজিক সারা বিশ্বকে চেয়ার থেকে তুলে ডান্স-ফ্লোরে দাঁড় করিয়ে দেয়। কিন্তু তাঁর নিজের গলায় এ কি কোমলতা!
রাজ সোধা বললেন - সারাজীবনই শিখছি ভায়া, নাহলে কি করে এই সংগীত সাধনা করবো !
সারাজীবন ধরেই শেখা। মনে পরে যায় দমদমের পাঁজা-দা থেকে স্টকপোর্টের ল্যাপারোস্কপি সার্জারির জাদুকর পিকার্সগিল। ম্যানচেস্টারের আত্মবিশ্বাসী অঞ্জলি আলুওয়ালিয়া থেকে লেক ডিস্ট্রিক্টের সদাহাস্য প্রভাস মিশ্র।
সলফোর্ডের তরুণ ব্রেট উইন্টাররোচ থেকে আমার বন্ধু-পথপ্রদর্শক-শিক্ষক, ইংল্যান্ড মহিলা ক্যান্সার সোসাইটির সদ্য-প্রাক্তন প্রেসিডেন্ট প্রবাদপ্রতিম এন্ডি নরডিন। মায়, স্কুল বায়োলজির সুনীলবাবু থেকে ভূগোলের বারীন লস্কর। সব শিক্ষকের কাছেই শিখেছি ছাত্র থাকো। শেখা শেষ হলেই খাদের শুরু।
স্কুল জীবনে নানা 'বর্ণময় সমাস'-এর গল্প কে না জানে। বেশিরভাগটাই ফাজলামি হলেও যেটা কালোত্তীর্ণ তা হলো: বিষেশ ভাবে অজ্ঞ = বিশেষজ্ঞ।
বিশেষজ্ঞ যদি সব জেনেই ফেলে তাহলে সংগীতেরই বা কি হবে আর বিজ্ঞানেরই বা কি হবে। আর তো এগোবো না আমরা।
অনেক্ষন ধরেই শিল্পী মাধুরী দে খোঁজ করছেন তাঁর হাসব্যান্ড এসেছেন কিনা। হয়তো কিছু সামগ্রীর জন্য অপেক্ষা করছিলেন। তিনি এসেছেন। গান শুরু করেছেন মাধুরী। সাথে অন্তত ২৫জনের কনসার্ট চলছে। আরো জনা আটেক ব্যাকগ্রাউন্ড সিঙ্গার।
মুগ্ধ হয়ে শুনছি। হঠাৎ গান থামিয়ে দিলেন মাধুরী। কি হলো !
(আগামী পর্বে সমাপ্য)
অন্য পর্বের লিঙ্ক
#মাটি ( দ্বিতীয় পর্ব - এই পেজেই )
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tools: Mati, Buddha






