ভ্যাকসিন -অতীত ও ভবিষ্যৎ (তৃতীয় পর্ব)
যেবছর জেনার মারা গেলেন সেবছর ফ্রান্সের ডোলে আক্ষরিক অর্থে হামাগুড়ি দিচ্ছেন বিজ্ঞানের আরেক বরপুত্র লুই পাস্তুর। তৃতীয় পর্ব (বাকি পর্বের লিংক নিচে দেওয়া রইল )
হেনরি আর গেডিস দুজনেই বুঝতে পারলেন মাইক্রোস্কোপের তলায় যা দেখছেন তা স্মলপক্সের জীবাণু ছাড়া আর কিছু নয়। আর সে স্মলপক্স যে হেনরি বেডসনের ল্যাব থেকে এসেছে তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
কারণ বেডসনের বার্মিংহামের ল্যাবে তখন স্মলপক্সের ওপর রাসায়নিক গবেষণা চলছে। যার ওপর তলাতেই ছিল জ্যানেটের ফটোগ্রাফির ডার্করুম।
শোনা যায়, বেডসনের ল্যাব থেকে এক্সহস্ট ফ্যানের হাওয়া বেরোতো তার পাশ দিয়েই। কিছুদিনের মধ্যেই জ্যানেট শেষ নিঃস্বাস ত্যাগ করলেন। স্মলপক্সের শেষ 'শিকার' । তার কদিন আগেই জ্যানেটকে ক্যাথেরিন-ডি -বার্ন্স এ দেখতে গিয়ে তার বৃদ্ধ বাবা হার্ট ফেল করে মারা গেলেন। শোকাহতা হিল্ডা স্বামী আর মেয়ে কারোরই শেষকৃত্যে যোগদান করতে পারলেন না।
মর্মাহত হেনরি- এত সাবধানতা সত্ত্বেও কি করে এমন হলো ! সংবাদমাধ্যম আর বার্মিংহামবাসীর ক্রোধ থেকে কোনোক্রমে বাঁচলেন হেনরি। পরের একমাস উৎকণ্ঠিত শহরকে স্বস্তি দিয়ে আর কারো স্মলপক্স হলো না। ক্যাথেরিন-ডি -বার্ন্স হাসপাতাল আর তার কর্মচারীদের যুদ্ধকালীন তৎপরতায় সংক্রমণ থেকে রক্ষা করা হলো। রক্ষা পেলো ইংল্যান্ড আরেকটা মহামারী থেকে।
৫ বছর নিষিদ্ধ থাকার পর নানা হাত বদল হয়ে ক্যাথেরিন-ডি -বার্ন্স এখন ক্যাথেরিন কোর্ট , সলিহালের বহুমূল্য বিলাসবহুল আবাসন। কিন্তু এই অঘটন থেকে শিক্ষা নেয় WHO।
সেসময় WHO এর বিশাল বাহিনী বেডসনের ল্যাব পরিদর্শনে যান। বুঝতে পারেন ল্যাব যতই সাবধানী হোক জীবাণুকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে হলে চাই আরো আধুনিক বিধি নিষেধ।
ঠিক হয়, মারণ জীবাণু আর কখনোই ল্যাবে রাখা চলবে না। BSL বা বায়ো সেফটি লেভেল চূড়ান্ত বা 4 না থাকলে মারণ জীবাণুর শিশি রাখা চলবে না। আর স্মলপক্সের মতো জীবাণু রাখার অধিকার পেল আমেরিকা আর রাশিয়ার BSL-4 এর দুটি ল্যাব। BSL-4 থেকে একফোঁটা জল তো দূরের কথা একটু হাওয়াও একাধিক স্তরে ফিল্টার না হয়ে বাইরে বেরোবার জো নেই। মহাকাশ থেকে আনা পাথরের টুকরোও প্রথমে রাখা হয় এই ধরণের ল্যাবে।
১৯৯৮ থেকে শুরু করে ভারতেও তিন তিনটে BSL-4 ল্যাব আছে ভোপাল, হায়দ্রাবাদ আর পুনেতে । যা নিয়ে এখন শোরগোল সেই উহানের ল্যাব একদম নবীন - ২০১৫য় তার BSL-4 তকমা জোটে। সত্যি সত্যি যদি কোনো ল্যাব থেকে কোরোনাভাইরাস বেরিয়ে থাকে তবে এটা নিশ্চিত যে সেখানে BSL-4 নিরাপত্তা লংঘিত হয়েছিল। তবে যতই শোরগোল হোক, আমাদের জীবদ্দশায় সত্যিটা জানার আশা খুবই ক্ষীণ।
যাইহোক, ১৯৮০ তে WHO ঘোষণা করে পৃথিবী থেকে স্মলপক্স বিদায় নিয়েছে। তারপর বহুবার ল্যাবে রাখা শেষ স্মলপক্সের নমুনাকে WHO ধ্বংস করতে চেয়েছে - আমেরিকা আর রাশিয়া কেউই তাতে রাজি হয়নি।
আর হ্যাঁ, যেবছর জেনার মারা গেলেন সেবছর ফ্রান্সের ডোলে আক্ষরিক অর্থে হামাগুড়ি দিচ্ছেন বিজ্ঞানের আরেক বরপুত্র লুই পাস্তুর । কে জানতো এই কেমিস্ট্রি প্রফেসর পাস্তুরের হাতেই আসবে পৃথিবীর দ্বিতীয় টিকা -কলেরার। জলাতঙ্ক আর এনথ্রাক্সের টিকাও আবিষ্কার করেন তিনি।
আরেকটা কারণের জন্য পাস্তুরকে কোনোদিনও ভোলা যাবে না। জীবাণু থেকেই যে সংক্রামক রোগের সৃষ্টি তা আবিষ্কার করার কৃতিত্ব ওনারই। জার্ম থিওরি অফ ডিজিজেস। তবে বলে রাখা ভালো জীবাণু যে অনেক ধরণের -ব্যাকটেরিয়া , ভাইরাস, ছত্রাক, প্যারাসাইট সে পুরোপুরি বুঝতে গেছে আরো অনেক বছর। আর পেনিসিলিন মানে প্রথম এন্টিবায়োটিক - যা ব্যাকটেরিয়াকে মারে, তা অনুধাবন করতে আরো ২০০ বছর লেগেছে।
তবে যা বলছিলাম, এর মধ্যে গুটি গুটি পায়ে চলে এসেছে কলেরা , জলাতঙ্ক টিটেনাস টাইফয়েড প্লেগের মতো মারণ রোগের টিকা। মহামারীর পর মহামারী গ্রাম শহর কে শ্মশানে পরিণত করার গতিবেগে রাশ টেনে ধরল বিজ্ঞান।
প্রতিটি টিকার পিছনে আছে দশকের পর দশক অক্লান্ত গবেষণা। স্প্যানিশ ফ্লু হওয়ার বছর ১৭ পর এসেছিলো ইনফ্লুয়েঞ্জার প্রথম টিকা। মেইন স্ট্রিম মিডিয়ার রিপোর্ট সত্যি বলে মেনে নিলে পৃথিবীতে প্রথম করোনাভাইরাস সমস্যা আসার ১ বছরেরও কম সময়ে তার টিকা চলে এসেছে। বিজ্ঞানের উন্নতি হয়েছে বৈকি। আবার এদিকে HIV এর টিকা আবিষ্কারের জন্য দশকের পর দশক গবেষণা চললেও তার টিকা এখনো দুরস্ত।
ভ্যাকসিনের এর সঙ্গে রাজনীতির সম্পর্ক অবিচ্ছেদ্য। যতদিন না রাজনীতিবিদরা নড়েচড়ে বসেছেন ততদিন পর্যন্ত মানুষের রোগভোগের প্রতিকারের গবেষণায় কোন অর্থসাহায্য আসেনা। অতীতে এবং হয়তো বর্তমানেও অগুনতি মানুষকে মরতে হচ্ছে রাজনীতিবিদদের তুঘলকি আচরণে। রোগের সঙ্গে লড়াই করতে হলে যে পরিমাণ তহবিল দরকার তার থেকেও অনেক বেশি অর্থ রাষ্ট্রের থাকে। কিন্তু জনগণের কর থেকে সংগ্রহ সেই অর্থ জনগণের স্বাস্থ্যের জন্য যথেষ্ট খরচ করতে রাজি হন না জননির্বাচিত প্রতিনিধিরাই। এ এক দুর্ভাগ্যজনক উলটপুরান। সৌভাগ্যবশত বেশিরভাগ পাশ্চাত্যের দেশগুলো এখন তাদের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়েছে। এর সবচেয়ে চমৎকার উদাহরণ পাওয়া যায় পোলিও টিকার গবেষণায়।
বিংশ শতাব্দীর প্রথমদশকগুলোর জীবনযাত্রার মান মোটেই ভাল ছিলনা। নানা রোগ বালাই অসুখ-বিসুখ লেগেই থাকত। নানা ধরনের মহামারী ছিল জীবনের এক চরম সত্যি। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আসে স্প্যানিশ ফ্লু। অতিমারীর ধাক্কা খানিকটা সামলে উঠলেও শীতকালে ফ্লু আর গরমকালে পোলিও ছিল মানুষের সাথের সাথী। বিংশ শতাব্দীতে বাচ্চাদের যদি সত্যি সত্যি কিছু পঙ্গু করে দিয়ে থাকে তাহলে, তা হলো পোলিও বা পোলিওমাইলাইটিস। নার্ভের বৈকল্যের কারণে মাংসপেশি নাড়ার ক্ষমতা চলে যেত - যার নাম প্যারালাইসিস।
সে সময়ে গরমকালের নামই হয়ে গিয়েছিল 'পোলিও সিজন'। বাচ্চারা সাধারণত গরমকালে একটু বাইরে গিয়ে খেলাধুলো করে কিন্তু তাতে বাধ সাধল পোলিও। দূষিত জল ও খাবার-দাবার থেকে পোলিও খুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়তো একজনের থেকে আরেকজনের শরীরে। সিনেমা-থিয়েটার, সুইমিং পুল সব বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। মায় গরমের মধ্যেও বাড়ির জানলা পর্যন্ত খুলতে পারতেন না বাবা-মায়েরা। আরো খারাপ যেটা তা ছিল কোনো হাসপাতাল পোলিও বাচ্চাদের ভর্তি নিতে রাজি হতো না। হাতে-পায়ে ধরে মহল্লার ডাক্তার দেখানো ছাড়া বাবা মায়ের আর কিছু করার থাকতো না। চোখের সামনে হাজার লক্ষ বাচ্চা পঙ্গু হয়ে যায়। তারা আর কোনদিনও হাঁটতে পারে নি। আর কারো কারো বুকের নিশ্বাস নেওয়ার মাংসপেশিগুলো পর্যন্ত পঙ্গু হয়ে যেত। দম বন্ধ হয়ে মারা যেতেন তাঁরা। এমনকি বলা হয় পোলিওর আতঙ্কের থেকে একটিই মাত্র বড়ো আতঙ্ক ছিল - তা নিউক্লিয়ার বোমা বিস্ফোরণের আতঙ্ক।
এইসময় 1921 সালে আমেরিকার এক বিশেষ ব্যক্তি আক্রান্ত হলেন পোলিওতে। সাহিত্যিকরা হয়তো বলবেন পোলিও তার শিকারে একটা ভুল করে ফেললো। এঁর পোলিও নাহলে হয়তো আজও পোলিও টিকা আসতো না। শুরু হলো মানবসভ্যতার ইতিহাসে রাজনীতিবিদদের আরো সভ্য হয়ে ওঠার আশ্চর্য্য কাহিনী (ক্রমশঃ)
— ------
টিকা -অতীত ও ভবিষ্যৎ
◉ প্রথম পর্ব https://drmanas.substack.com/p/346
◉ দ্বিতীয় পর্ব https://drmanas.substack.com/p/366
◉ তৃতীয় পর্ব https://drmanas.substack.com/p/1aa
◉ চতুর্থ পর্ব https://drmanas.substack.com/p/aa9
◉ পঞ্চম ও শেষ পর্ব https://drmanas.substack.com/p/261
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: vaccine tika











