ভ্যাকসিন -অতীত ও ভবিষ্যৎ (দ্বিতীয় পর্ব)
খুব সাধারণ মানের জীবনযাপনে সমসাময়িক সতীর্থদের তাচ্ছিল্যের চোখ অবহেলা করে স্বাভিমানী জেনার কাজ করে গেছেন নীরবে। দ্বিতীয় পর্ব (বাকি পর্বের লিংক নিচে দেওয়া রইল )
সাল তখন ১৭২১ । ত্বকের তলায় স্মলপক্সের পুঁজ অল্প পরিমানে ঢুকিয়ে ব্রিটেনের কারাবন্দি আর পথশিশুদের স্মলপক্স বিজয়ী করে তুললেন প্রিন্সেস ক্যারোলিনা আর লেডি মন্টেগু মিলে। পশ্চিম ইউরোপে ভ্যারিওলেশনের মাধ্যমে স্মলপক্সের মড়কের চিকিৎসা শুরু হলো। এই পুঁজেরই খানিকটা ডাঃ জন হোয়াইট নিয়ে গিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়াতে।
যখন ফার্স্ট ফ্লিট কারাবন্দীদের নিয়ে অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি দিচ্ছে, সেসময় নবীন ডাক্তার এডওয়ার্ড জেনার বার্কেলে (গ্লস্টারশায়ার ) শহরে প্র্যাকটিস শুরু করেছেন। নাম ডাক একটু হয়েছে। গ্লস্টারশায়ারের দুধ আর চীজের শিল্প বেশ রমরম করে চলছে।
গোয়ালা পাড়া থেকে তাঁর বাড়িতেও দুধ আসে। গোয়ালার মেয়ে সারা নিয়ে আসতো দুধ। এই সময়ে এলো স্মলপক্সের মড়ক। ভ্যারিওলেশনের জন্য তিনি শহরে গ্রামে ঘুরছেন। অনেককে ভ্যারিওলেশন করালেও গ্লস্টারশায়ার-এর গোয়ালা পাড়ার লোকজন ভ্যারিওলেশন করাতে রাজি হলো না। তার ফলে অনেকেরই স্মলপক্স হলো। সারার -ও হলো।
কিন্তু সারা নেমস মরে নি। সারা বললে আমরা স্মল পক্সে মরি না এড। শুধু একটুস শরীর খারাপ হয়। জেনারের মাথায় বিদ্যুৎ খেলে যায়।
সারার হাতের কাউ পক্সের ফোস্কা থেকে রস নিয়ে ইনজেকশন দিয়ে দিলেন বাচ্চা ছেলে জেমস ফিপস কে। ৮-৯ দিন ধরে জেমস এর বেজায় শরীর খারাপ। শেষে উৎকণ্ঠিত জেনারকে স্বস্তি দিয়ে জেমস সেরে উঠলো। এরপর আরম্ভ হলো আসল পরীক্ষা। দেড় মাসের মাথায় জুলাই ১৭৯৬ এ জেমস এর শরীরে স্মলপক্সের জীবাণু ঢুকিয়ে দিলেন জেনার। কিচ্ছুটি শরীর খারাপ হলো না জেমস এর। আপ্লুত জেনার। আবিষ্কার হলো স্মলপক্সের টিকার।
কিন্তু না, জেনার কে কেউ বিশ্বাস করলো না। অভিজাত রয়্যাল সোসাইটিতে তাচ্ছিল্যের সাথে প্রত্যাখ্যান হয়ে গেলো জেনারের গবেষণাপত্র। জেনার এবার নিজেই ছোট একটা ছোট বই লিখে ফেললেন - ৩ খন্ডে। ল্যাটিনে Cow এর নাম Vacca. Cowpox (Vaccinia) এর জীবাণু নিয়ে Smallpox এর টিকা দেবার নাম হলো vaccination. বার্কেলে থেকে ছুটে এলেন বিজ্ঞান - সংস্কৃতির পীঠস্থান লন্ডনে। মিললো শুধু অবজ্ঞা আর অপমান। আত্মঅহঙ্কারে মত্ত তৎকালীন বিজ্ঞানীকূল গবেষণার দরজা বন্ধ করে দিলেন জেনারের মুখের ওপর। গবেষণার জন্য একজনও স্বেচ্ছাসেবী জোগাড় করতে না পেরে মাথা হেঁট করে জেনারকে ফিরে আসতে হলো বার্কলেতে।
কিন্তু জেনারের উপর আস্থা রাখেন তাঁর কিছু ডাক্তার বন্ধু। নিজেদের সামান্য গন্ডির মধ্যে গুটিকয় উৎসাহী রোগী কে তাঁরা এই টিকা দেন। ফল হয় আশাতীত । স্মলপক্সের ইনফেকশন ফ্যাটালিটি রেট ৩০% । ভ্যারিওলেশনের ইনফেকশন ফ্যাটালিটি রেট ৩%। অনেক কম , তবুও ১০০ জনকে টিকা দিলে ৩ জন টিকায় মারা যাবেন তা আধুনিক বিজ্ঞানের কাছে আপত্তিজনক। আর প্রমাণিত হল জেনারের কাউপক্স থেকে তৈরি স্মলপক্সের টিকা অনেক বেশি নিরাপদ। রচনা হলো চিকিৎসা বিজ্ঞানের নতুন অধ্যায়ের।
এর পরে ইংল্যান্ড আর জেনারকে অবজ্ঞা করতে পারেনি। একশ্রেণীর বিজ্ঞানীর চরম সমালোচনার মধ্যেও ইউরোপ জুড়ে ভ্যাকসিনেশন এর পদ্ধতি ছড়িয়ে পড়লো। কদিন বাদেই আমেরিকাও জনসাধারণের মধ্যে ছড়িয়ে দিলো এই টিকাকরণ। প্রাণ রক্ষা হলো কোটি কোটি মানুষের।
টিকা মানব সভ্যতার অস্তিত্বকে কিভাবে রক্ষা করে জেনার তা দেখে যেতে পারেননি। খুব সাধারণ মানের জীবনযাপনে সমসাময়িক সতীর্থদের তাচ্ছিল্যের চোখ অবহেলা করে স্বাভিমানী জেনার কাজ করে গেছেন নীরবে। পরিবারের প্রায় সবাইকে যক্ষা বা টিউবারকুলোসিসে হারিয়েছিলেন তিনি। তখন তো আর যক্ষার টিকা ছিল না ! তারপর নিজেই চলে যান না-ফেরার দেশে। তাঁরই পথ ধরে ১৮৯০ এ রবার্ট কক টিবির টিকার রূপরেখা আমাদের সামনে আনেন।
১৯৭৫ এ বাংলাদেশের বছর তিনেকের রহিমা বানু স্মলপক্স মেজর আর ১৯৭৭ এ সোমালিয়ার বাসিন্দা আলী মাও মলিন স্মলপক্স মাইনর এর শেষ ‘রোগী’। জেনারের টিকা আবিষ্কারের পর মানুষের প্রায় ১৮০ বছর লেগে গেল স্মলপক্সকে নিকেশ করতে।
ঠিক যখন WHO ঘোষণা করতে চলেছে যে স্মলপক্স আর নেই, ১৯৭৮ এ ইংল্যান্ডের বার্মিংহাম শহর সাক্ষী থাকলো এক অবিশ্বাস্য ঘটনার। সারা হপ্তা কাজ করে এসে উইকেন্ডে একটু আরাম করবেন বলে এর জ্যানেট পার্কারের বাড়ি ঢুকতেই মনে হলো শরীর টা একটু খারাপ লাগছে। বছর ৪০ এর জ্যানেট তখন বার্মিংহাম মেডিকেল স্কুলের (মেডিকেল কলেজ কে ইংল্যান্ডে স্কুল বলা হয় ) এনাটমি ডিপার্টমেন্টের ফটোগ্রাফার।
হবু ডাক্তারদের এনাটমি পড়াবার জন্য আঁকা আর তোলা ছবি খুব কাজে আসে। সোমবার আর কাজে যেতে ইচ্ছে করলো না। ফ্লু-টু হলো নাকি ! জ্যানেট এর মা হিল্ডার মনে অস্বস্তি। ঠিক ফ্লু এর মতো মনে হচ্ছে না তাঁর।
মেয়ের শরীরে কয়েকটা ছোট ফুসকুড়ি দেখছেন তিনি। মহল্লার ডাক্তারের কাছে বলতে উনি উড়িয়েই দিলেন। ৯ দিন বাদেও ভালোর দিকে যাচ্ছে না দেখে খানিকটা জোর করেই ডাক্তার কে বললেন হাসপাতালে রেফার করতে। হাসপাতালের ডাক্তার জ্যানেট কে দেখেই সোজা এম্বুলেন্সে পাঠিয়ে দিলেন শহরের বাইরে সলিহালের ক্যাথেরিন-ডি -বার্ন্স এর আইসোলেশন হাসপাতালে। জ্যানেটের তখন দাঁড়াবারও শক্তি নেই।
প্রফেসর গেডিস ডেকে নিয়ে এলেন পৃথিবী বিখ্যাত ভাইরোলজিস্ট প্রফেসর হেনরি বেডসন কে। বেডসন তখন বার্মিংহাম মেডিকেল কলেজেই বিশাল ভাইরাস ল্যাবরেটরির গবেষক। অণুবীক্ষণ যন্ত্রের নিচে জ্যানেটের নমুনা পরীক্ষা করতেই বেডসনের মুখে আর কথা নেই -পুরো স্থবির।
গেডিস আকুল হয়ে জিজ্ঞেস করলেন 'ক্যান ইউ সি এনিথিং হেনরি?' হেনরির মাথাটা অণুবীক্ষণ যন্ত্রের থেকে সরিয়ে গেডিস নিজে দেখতেই বুঝতে পারলেন। হেনরির চোখে তখন আতঙ্ক। মুখ ফ্যাকাসে।
( ক্রমশঃ )
টিকা -অতীত ও ভবিষ্যৎ
◉ প্রথম পর্ব https://drmanas.substack.com/p/346
◉ দ্বিতীয় পর্ব https://drmanas.substack.com/p/366
◉ তৃতীয় পর্ব https://drmanas.substack.com/p/1aa
◉ চতুর্থ পর্ব https://drmanas.substack.com/p/aa9
◉ পঞ্চম ও শেষ পর্ব https://drmanas.substack.com/p/261
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tool: vaccine tika









