ভ্যাকসিন -অতীত ও ভবিষ্যৎ (চতুর্থ পর্ব )
আমেরিকার অর্থনীতি তখন ধুঁকছে। কিন্তু মানুষ অকৃতজ্ঞ ছিল না। তখন ৫ পয়সা, ১০ পয়সা করে জমা পড়েছে গবেষণার তহবিলে। চতুর্থ পর্ব (বাকি পর্বের লিংক নিচে দেওয়া রইল )
১৯২১ সালে আমেরিকার এক বিশেষ ব্যক্তি আক্রান্ত হলেন পোলিওতে। নাম: ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্ট। স্কাউট ক্যাম্প থেকে ফিরে আসার পর তাঁর কোমর থেকে নিচ পর্যন্ত পঙ্গু হয়ে যায়। পায়ের শক্তি তিনি আর কোনদিনই ফিরে পাননি। রুজেভেল্টের ভয় ছিল হুইল চেয়ারে বসা কোন অ-শক্ত জনপ্রতিনিধিকে আমেরিকা তাদের প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচন করবে না।
বহুদিন ধরে ব্যায়াম এবং নানা রকম পদ্ধতির মাধ্যমে নিজেকে খানিকটা চাঙ্গা করার চেষ্টা করেন। অসম্ভব মনের জোরে শেষ পর্যন্ত 1933 সালে রুজভেল্ট আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হিসেবে নির্বাচিত হন।
তখন টিভির প্রচলন ছিল না। আমেরিকা তার রাষ্ট্রনেতাকে হুইলচেয়ারে দেখেনি। বহুকষ্টে জনসাধারণের চোখ থেকে তিনি নিজের পঙ্গুত্বকে লুকিয়ে রেখেছিলেন। কিন্তু ভোলেননি তার কষ্ট। বুদ্ধিমান রুজভেল্ট বুঝতে পেরে গিয়েছিলেন আমেরিকা অনেক বেশি অর্থ খরচ করে ফেলছে তার প্রতিরক্ষা খাতে। উনি অনুধাবন করেছিলেন যে গবেষকদের অহেতুক চাপ দিয়ে কোন মহৎ কার্য সিদ্ধি হয়না। সঠিক গবেষণার জন্য চাই তহবিল ও পৃষ্ঠপোষকতা ।
১৯৩৭-এ উনি ন্যাশনাল ফাউন্ডেশন ফর ইনফ্যান্টাইল প্যারালাইসিস এর স্থাপনা করেন। পোলিওর গবেষণার জন্য সাধারণ মানুষকেও দান-ধ্যান করতে অনুরোধ করলেন। কিন্তু মানুষের কাছে তখন পয়সা কোথায়!
আমেরিকার অর্থনীতি তখন ধুঁকছে। কিন্তু মানুষ অকৃতজ্ঞ ছিল না। তখন ৫ পয়সা, ১০ পয়সা করে জমা পড়েছে গবেষণার তহবিলে। ইতিহাসের খাতায় এটা বিখ্যাত 'মার্চ অফ ডাইমস' নামে খ্যাত। ডাইম ছিল আমেরিকার ১0 সেন্ট পয়সার নাম। সেই খুচরো দিয়েই তহবিল গড়ে উঠলো 2 মিলিয়ন ডলারের। লক্ষ বাবা মায়ের কান্না দিয়ে তৈরি সেই তহবিল তছরুপ হয়নি।
রুজভেল্ট মারা গেলেন ১৯৪৫ এ। ক্ষুরধার গবেষণার কাজ চলতে থাকলো। ১৯৫০ সাল নাগাদ ইউনিভার্সিটি অফ পিটসবার্গের ডক্টর জোনাস সক নিষ্ক্রিয় পোলিও ভাইরাস থেকে তৈরি ভ্যাকসিনে সাফল্য পান। তাঁর আত্মবিশ্বাস এতটাই প্রবল ছিল যে তিনি শুধু নিজেই সেই ইঞ্জেকশন নেননি, তাঁর স্ত্রী এবং তাঁদের তিন বাচ্চাকেও ইনজেকশন দিয়েছিলেন তাঁর বাড়ির রান্নাঘরে বসে।
তারপরে আমেরিকাতে প্রায় কুড়ি লক্ষ বাচ্চাকে গবেষণার অংশ হিসেবে পোলিও ভ্যাকসিনের ডোজ দেওয়া হয়। স্বাস্থ্য-গবেষণায় অ্যামেরিকান সরকারের আগ্রহ দেখে এলাই লিলি, ওয়েথ আর পার্ক ডেভিসের মত বিখ্যাত ড্রাগ কোম্পানিরাও তাদের গবেষণা তহবিল দান করে।
১৯৫৫ সালে এই গবেষণার ফলাফল প্রচারিত হয় এক বিশেষ রেডিও সম্প্রচারে। শোনা যায় সেদিন প্রায় ৫৪,০০০ ডাক্তার আর কোটি কোটি আমেরিকান রেডিও খুলে বসে ছিলেন ফলাফল জানতে। সক যেহেতু এই গবেষণার এক বিজ্ঞানী ছিলেন তাই ফলপ্রকাশের আগে তথ্যবিশ্লেষণের বিন্দুবিসর্গও জানতে দেওয়া হয়নি তাঁকে । দেখুন, বিজ্ঞান তার নিরপেক্ষতা বজায় রাখতে কিরকম সাবালক হয়ে উঠলো।
গবেষণার ফল জেনে আপ্লুত পাদ্রীরা চার্চ খুলে পাগলের মত ঘন্টা বাজানো শুরু করলেন। রাস্তাঘাটে নামলো মানুষের ঢল। পঙ্গু বাচ্চার বাবা মায়েরা উদ্বেলিত হয়ে কাঁদতে কাঁদতে রাস্তায় বেরিয়ে সককে সম্মানিত করলেন জাতীয় বীরের আসনে।
আর সেই বছর সদ্য স্বাধীন ভারত, জাতপাত ভুলে হিন্দুরা কিভাবে বিয়ে করবে তার তর্কে ব্যস্ত- হিন্দু ম্যারেজ এক্ট নিয়ে একনিষ্ঠ দেশের সংসদ। কি নিষ্ঠুর সমাপতন। ভেবে দেখুন জাতপাতের এই বর্বর রাজনীতি কতটা অকারণ শক্তিক্ষয় করেছে ভারতবাসীর!
আবিষ্কারক সককে যখন জিজ্ঞাসা করা হল যে কত টাকা পেটেণ্ট পেলে এই টিকা আপনি সবাইকে দেবেন ? সক সেদিন সবাইকে অবাক করে দিয়ে বলেছিলেন আকাশের সূর্যকে পেটেন্ট করা যায় না, এই টিকার কোন পেটেন্ট নেবো না।
ফোর্বস একসময় হিসেব করেছিলেন যে, সেই সময়ের মূল্য অনুযায়ী এই দিন প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলার উপার্জন করতে পারতেন সক। সক কিন্তু সঠিক ভাবে বুঝতে পেরেছিলেন, যে গবেষণার সিংহভাগ তহবিল এসেছে আমেরিকান সরকার আর জনগণের কষ্টার্জিত অর্থ থেকে তার পেটেণ্ট নেওয়া নৈতিক ভাবে ঠিক নয় । যদিও নিন্দুকদের মুখ বন্ধ তিনি করতে পারেন নি । এমনকি বিভিন্ন ড্রাগ কোম্পানির সাথে তথাকথিত যোগাযোগ থাকার সন্দেহে তাঁর নোবেল প্রাইজও জোট নি।
তবে সকের সবচেয়ে বড় নিন্দুক ছিলেন তার থেকে খানিকটা বয়সে বড় অ্যালবার্ট সেবিন । সকের কিছুদিনের মধ্যেই তিনিও আবিষ্কার করে ফেললেন আরেক পোলিও ভ্যাকসিন যেটার জন্য ইনজেকশন দেওয়ার দরকার হতো না। চিনির মিষ্টি কিউবে পুরে এই ভ্যাকসিন দিলে বাচ্চারা নিজেই চেটে পুটে খেয়ে ফেলত। এই টিকা কিন্তু সকের টিকার মত পোলিও প্রতিরোধে অতখানি পারদর্শী নয়। কিন্তু বাচ্চাকে ইনজেকশন দিতে কোন বাবা-মাই বা চাইবেন !
বয়:কনিষ্ঠ সক তাঁরও আগে পোলিও টিকা আবিষ্কার করে ফেলবেন এটা সেবিনের সহ্য হয়নি। নানা রকম ভাবে তিনি সক-কে হেনস্থা করতে শুরু করলেন। রান্নাঘরে বসে টিকা দেওয়ায় সক-কে ব্যঙ্গ করে তিনি বলতেন 'কিচেন কেমিস্ট'! এমনকি এটাও বললেন যে সকের টিকা নিরাপদ নয় কারণ তার মধ্যে জীবিত পোলিও ভাইরাস লুকিয়ে থাকার সম্ভাবনা রয়েছে। সেবিনের আশঙ্কাকে সত্যি প্রমাণ করে সকের ভ্যাকসিনের একটি নির্দিষ্ট ব্যাচ থেকে বেশকিছু বাচ্চা পোলিওতে আক্রান্ত হল।
জানা গেল ওষুধ তৈরি সংস্থাগুলো ‘কাটার’ বলে এক ঠিকাদার সংস্থাকে এই ভ্যাকসিন তৈরীর বরাত দিয়েছিল। তদন্তে জানা গেলো, এই কাটার ল্যাবরেটরীজ (Cutter Laboratories) তাদের খরচা বাঁচাতে গিয়ে সকের তৈরি করা কঠিন রাসায়নিক প্রক্রিয়া অতিসংক্ষেপে সেরে ফেলছিল। ফল হিসেবে তাদের তৈরী করা ব্যাচের সক-পোলিও ভাইরাসের গুণগতমান বিপদজনক পর্য্যায়ে পৌঁছে যায়।
আজও যখন হাসপাতাল বা গবেষণাগারের উপরে ব্যয় সংকোচনের জন্য অনায্য কর্পোরেট বা সরকারি চাপ আসতে থাকে তখন ডাক্তাররা কৌতুক করে বলে 'উই ডোন্ট লাইক এনিমোর কাটার ইভেন্ট'।
সেবিন তুলোধুনো করলেন সক -কে। কিন্তু আমেরিকাতে আর সুবিধা করতে না পেরে সেবিন তাঁর প্রযুক্তি দিলেন রাশিয়াকে। সেইখানে সেবিন টিকার গবেষণা চলতে থাকল। সেই সময় যেসব দেশগুলো রাজনৈতিকভাবে রাশিয়ার ঘনিষ্ঠ ছিল সেসব দেশে সেবিন টিকার প্রচলন হলো। যেমন ভারত। তারপর অবশ্য পোলিও নির্মূলের জন্য উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সেবিন টিকাই দেওয়া হল। এখনো অমিতাভ বচ্চন টিভি রেডিওতে এই সেবিন পোলিও ড্রপ খাওয়ার জন্য জনসচেতনা-মূলক বার্তা দিয়ে থাকেন ! যদিও উন্নতদেশগুলোতে এখনো অধিকতর প্রতিরোধ ক্ষমতার জন্য সক-ইনজেকশন দেওয়া হয়।
যাই হোক ফিরে আসি টিকার অন্দরমহলে।
এখন নবজাতক পৃথিবীর আলো দেখলেই নানা টিকা দেওয়া শুরু হয়ে যায়, শিশুটি বাড়ি আসার আগেই। ধীরে ধীরে হারিয়ে দিচ্ছি ডিফথেরিয়া, হুপিং কফ পোলিওর মতো ক্ষতিকর অসুখকে।
কিন্তু মহামারী তো শুধু সংক্রামক রোগেরই হয় না। নিঃশব্দ মহামারী হয় ক্যান্সার, ডায়াবিটিসের মতো অসুখেরও। দেখতে দেখতে আবিষ্কার হলো অন্যতম এক বড় মারণ ক্যান্সার- সারভাইক্যাল ক্যান্সারের টিকা। মহিলাদের জরায়ুর মুখ বা সার্ভিক্সের ক্যান্সার। সংখ্যাগরিষ্ঠ সারভাইক্যাল ক্যান্সার HPV নামে এক ভাইরাস এর সংক্রমণে হয়। এই আবিষ্কার এত মহিলার প্রাণ বাঁচানোর ক্ষমতা রাখে যে জার্মান বিজ্ঞানী হ্যারল্ড হাউসেনকে নোবেল প্রাইজও দেওয়া হয়েছে। আবিষ্কার হয়েছে টিকা।
ভারতীয় উপমহাদেশের তুলনায় পাশ্চাত্যে সারভাইক্যাল ক্যান্সারে মৃত্যুহার নিতান্তই নগন্য। তবুও ইংল্যান্ড , আমেরিকা , নিউজিল্যান্ডে আপনাদের বন্ধু থেকে থাকলে জানবেন সেখানে স্কুলে স্কুলে বাচ্চা মেয়েদের HPV টিকা দেওয়া চলছে অনেকবছর হলো। অথচ স্বর্গাদপী গরিয়সী ভারতভূমিতে বহুজাতিক ড্রাগ কোম্পানি আর রাজনীতিবিদদের টানাপোড়েনে আজ পর্যন্ত সব মেয়েদের ঘরে পৌঁছায়নি এই টিকা। হ্যাঁ , এদেশে যাদের ট্যাঁকের জোর আছে তারাই নিতে পারবেন এই টিকা।
গত ১০ বছরের গড় অনুযায়ী ৬ থেকে ৭ লক্ষ মহিলা মারা গেছেন সারভাইক্যাল ক্যান্সারে । শুধু ভারতে। তুল্যমূল্য হিসেবে করার জন্য তর্কের খাতিরে যদি ধরে নেওয়া হয় ছেলেদেরও সার্ভিক্স আছে তবে সম্ভাব্য ১৩-১৪ লক্ষ মানুষ মারা যেতেন এই ঘাতক অসুখে।
অনেক মানুষ (থুড়ি, শুধু মহিলা) ভারতবর্ষে মারা গেছেন এবং যাচ্ছেন প্রতিদিন। না ! আমাদের তেমন হেলদোল কোথায়?। লালমোহনবাবু হয়তো বলতেন 'হাইলি সাসপিশাস'।
এমনটা নয় যে আমাদের দেশে টিকাকরণের কাঠামো নেই। ভারতে অনেক অসুখের টিকা দেওয়া হলেও হয়নি কিন্তু এই ক্যান্সারের টিকা দেওয়া। এমনও শোনা যায়, ‘প্রতিরোধের’ প্রমাণিত উপায় হাতে থাকা সত্ত্বেও, মেডিকেল গবেষণা-নীতিশাস্ত্রের লাল ফিতের বাঁধনে বিজ্ঞানকেই আটকে রেখে পর্দার আড়ালে চলছে রোগাক্রান্ত মহিলাদের মাল্টিবিলিয়ন ডলার সারভাইক্যাল ক্যান্সার ‘চিকিৎসার ইন্ডাস্ট্রি'। অসহায় রোগিনী, অসহায় ডাক্তার- বিজ্ঞানী, অসহায় বিজ্ঞান।
(আগামী পর্বে সমাপ্য)
তথ্যসূত্র শেষপর্বের লেখায় থাকবে
টিকা -অতীত ও ভবিষ্যৎ
◉ প্রথম পর্ব https://drmanas.substack.com/p/346
◉ দ্বিতীয় পর্ব https://drmanas.substack.com/p/366
◉ তৃতীয় পর্ব https://drmanas.substack.com/p/1aa
◉ চতুর্থ পর্ব https://drmanas.substack.com/p/aa9
◉ পঞ্চম ও শেষ পর্ব https://drmanas.substack.com/p/261
This is an impartial , unsponsored health information. For public awareness and not a replacement of Medical Advice.
Search tools: Vaccine tika








